
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুরের পীরগাছা উপজেলায় আনসার ও ভিডিপি সদস্য নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। টাকার বিনিময়ে নিয়োগ, দালালচক্রের সক্রিয়তা এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের বাদ দিয়ে অপ্রশিক্ষিতদের অন্তর্ভুক্তির অভিযোগে এলাকায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। নির্বাচনের আগে নিরাপত্তা ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, আনসার ও ভিডিপি সদস্য হিসেবে নিয়োগ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে একটি সক্রিয় চক্র প্রার্থীদের কাছ থেকে অর্থ দাবি করেছে। অভিযোগ রয়েছে, অর্থ ও তদবিরের ভিত্তিতে তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এতে দীর্ঘদিন ধরে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও যোগ্য অনেক বেকার যুবক-যুবতী বাদ পড়েছেন বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। ছাওলা ইউনিয়নের পশ্চিম ব্রাহ্মণীকুন্ডা এলাকার আনসার ও ভিডিপি সদস্য নাছিমা বেগম জানান, তিনি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সদস্য হওয়া সত্ত্বেও ভোটের দায়িত্ব পাননি। তার অভিযোগ, পারুল ইউনিয়নের আনসার ভিডিপি কমান্ডার বেলাল নামের এক ব্যক্তিকে তিনি নিজেরসহ এলাকার আরও তিনজনের জন্য মোট ৪ হাজার টাকা দেন। কিন্তু টাকা নেওয়ার পর থেকে বেলাল আর ফোন রিসিভ করছেন না এবং প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাদের ভোটের ডিউটিও নিশ্চিত করেননি।
আবেগঘন কণ্ঠে নাছিমা বেগম বলেন, ‘আমার জামাই মারা গেছে, মেয়ে আমার ঘাড়ে এসে পড়েছে। একটি নাতনিকে আমি লালন-পালন করছি। আমার কোনো ছেলে নেই। খুব কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি। ডিউটি পেলে কিছু টাকা পেতাম, সংসারে একটু সহায়তা হতো। কিন্তু টাকা নেওয়ার পরও আমাদের ডিউটি দেওয়া হয়নি।’ তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
একই ধরনের অভিযোগ তুলেছেন উপজেলার পারুল ইউনিয়নের সুন্দর এলাকার আনসার ও ভিডিপি সদস্য বাবলু মিয়া। তিনি বলেন, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সদস্য হওয়া সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষ তার নাম অনলাইনে অন্তর্ভুক্ত করেনি এবং প্রয়োজনীয় ভেরিফিকেশনও সম্পন্ন করা হয়নি।
বাবলু মিয়ার দাবি, নিয়মিত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং বৈধ সনদধারী অনেক সদস্যকে ডিউটিতে না নিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে। অপরদিকে, যাদের প্রশিক্ষণ নেই বা বৈধ সনদপত্র নেই—এমন ব্যক্তিদের অর্থের বিনিময়ে ডিউটিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমি কোনো ধরনের টাকা দিতে পারিনি বলেই আমার ডিউটি হয়নি।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরও কয়েকজন প্রার্থী অভিযোগ করেন, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো স্বচ্ছতা ছিল না। তাদের দাবি, তালিকা আগেই নির্ধারিত ছিল। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, নির্বাচনী নিরাপত্তায় নিয়োজিত বাহিনীর নিয়োগে এমন অভিযোগ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তাদের বক্তব্য, অভিযোগের দ্রুত তদন্ত না হলে নির্বাচনের আগেই আস্থার সংকট আরও গভীর হতে পারে।
অভিযুক্ত বেলালের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা সুজন বলেন, ‘আনসার সদস্য নিয়োগ সম্পূর্ণ বিধিমালা অনুযায়ী হয়েছে। এখানে কোনো অর্থ লেনদেন বা পক্ষপাতিত্ব হয়নি। দালালচক্রের বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে পীরগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেবাশীষ বসাক বলেন, ‘আনসার নিয়োগে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতির সুযোগ নেই। কেউ নির্দিষ্ট প্রমাণসহ লিখিত অভিযোগ দিলে তা তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
প্রসঙ্গত, পীরগাছা উপজেলায় মোট ৯০টি ভোট কেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্রে দায়িত্ব পালনের জন্য নিয়োজিত করা হয়েছে ৯০ জন সেকশন কমান্ডার, ৯০ জন সহকারী সেকশন কমান্ডার, প্রিজাইডিং অফিসারের নিরাপত্তায় ৯০ জন আনসার সদস্য, ৫৪০ জন পুরুষ ভিডিপি, ৩৬০ জন নারী ভিডিপি এবং আনসার ব্যাটালিয়নের স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দুইটি টিমে মোট ১৬ জন সদস্য। এক হাজারের বেশি সদস্য নিয়ে গঠিত এই বিশাল নিয়োগ কাঠামো নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার দাবি উঠেছে।
অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের নজরদারি ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
Related