1. [email protected] : Md Hozrot Ali : Md Hozrot Ali
  2. [email protected] : Sokaler Bani : Iqbal Sumon
  3. [email protected] : Md Hozrot Ali : Md Hozrot Ali
পানিবন্দী ও ভাঙনের দ্বিমুখী দুর্যোগে নাকাল তিস্তাপাড়ের মানুষ | দৈনিক সকালের বাণী
বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ১২:৫৬ পূর্বাহ্ন

পানিবন্দী ও ভাঙনের দ্বিমুখী দুর্যোগে নাকাল তিস্তাপাড়ের মানুষ

গঙ্গাচড়া (রংপুর) প্রতিনিধি
  • আপলোডের সময় : বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬
  • ১৯ জন দেখেছেন

রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার নয়টি ইউনিয়নের সাতটি তিস্তা বিধৌত। বর্ষাকাল এলেই চড়ম দূর্ভোগ পোহাতে হয় চরাঞ্চলের মানুষকে। চলমান বর্ষা আর বৃষ্টিতে একদিকে বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে গ্রামীণ সড়ক। বই-খাতা হাতে এক হাঁটু পানি মাড়িয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। অন্যদিকে পানি কিছুটা কমতেই শুরু হয়েছে তিস্তার ভয়াল ভাঙন। চোখের সামনে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে মানুষের আজীবনের সঞ্চয়ে গড়ে তোলা বসতভিটা, হারিয়ে যাচ্ছে শত শত বিঘা ফসলি জমি। বন্যা ও নদীভাঙনের এই দ্বিমুখী দুর্যোগে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার নোহালী ইউনিয়নসহ তিস্তাপাড়ের মানুষের জনজীবন এখন চরম বিপর্যস্ত।

ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও কয়েক দিনের টানা বর্ষণে তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে গঙ্গাচড়া উপজেলার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। বর্তমানে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও নিম্নাঞ্চলের অনেক এলাকা এখনও পানি বন্দী হয়ে পড়েছে । ফলে প্রতিদিনই বন্যার পানি মাড়িয়ে চলাচল করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। বিদ্যালয়ে যেতে তাদের হাঁটুপানি ভেঙে চলাচল করতে হচ্ছে। অনেক অভিভাবক সন্তানদের হাত ধরে বিদ্যালয়ে পৌঁছে দিচ্ছেন।

 

এতে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। সরেজমিনে নোহালী ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, গ্রামের কাঁচা ও আধাপাকা সড়ক এখনও পানিতে তলিয়ে রয়েছে। কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও তারও বেশি। শিক্ষার্থীরা জুতা হাতে নিয়ে খালি পায়ে পানি পার হয়ে বিদ্যালয়ে যাচ্ছে। কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ, ব্যবসায়ী ও রোগীদেরও প্রতিদিন চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। অনেক কৃষিজমি এখনও পানির নিচে থাকায় আমন ধানের বীজতলা ও বিভিন্ন ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। এদিকে পানি কিছুটা কমলেও নতুন করে দেখা দিয়েছে নদীভাঙনের ভয়াবহতা।

নোহালী ইউনিয়নের চর নোহালী কাচারিপাড়া এলাকায় তিস্তার তীব্র স্রোতে ইতোমধ্যে অন্তত আটটি বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। পাশাপাশি শত শত বিঘা আবাদি জমি নদীতে হারিয়ে গেছে। প্রতিদিনই ভাঙনের বিস্তার বাড়ছে। শেষ সম্বল রক্ষায় কেউ ঘরের টিন খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন, কেউ ইট, কাঠ ও গৃহস্থালির মালামাল নিয়ে আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছেন। ভাঙনের আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটছে নদীতীরবর্তী পরিবারগুলোর।

পানি কিছুটা কমলেও নদীর তীব্র স্রোতে রংপুরের গঙ্গাচড়া-মহিপুর দ্বিতীয় তিস্তা সেতুর সেতু রক্ষা বাঁধের অন্তত ২০০ মিটার অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙন অব্যাহত থাকায় মূল সড়ক, দ্বিতীয় তিস্তা সেতু এবং রংপুর ও লালমনিরহাট জেলার মধ্যকার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ হুমকির মুখে পড়েছে। এতে নদীপাড়ের অন্তত ৫০ হাজার মানুষ চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত ভাঙনরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে সেতু রক্ষা বাঁধের আরও অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।

নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো মোত্তালেব হোসেনের স্ত্রী মর্জিনা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আল্লাহ ছাড়া এখন আমাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই। আজ রাতে কী খাব, সেটাও জানি না। নদী আমার সোনার বাড়িঘর সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। এখন আমার ছোট ছোট সন্তানগুলো কী খেয়ে বাঁচবে? আমাদের সুন্দর সাজানো সংসার মুহূর্তেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেল। এখন আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ভরসা নেই। তিনি আরও বলেন, বাড়ি নদীতে বিলীন হওয়ার চার-পাঁচ দিন হয়ে গেছে। ঘরে কোনো খাবার নেই। ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে হচ্ছে। মানুষের বাড়িতে কাজ করে, কাশ কেটে কষ্ট করে সংসারটা গুছিয়েছিলাম। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই সেই গুছানো সংসার শেষ হয়ে গেল। এখন আমরা অসহায় হয়ে দিন কাটাচ্ছি।”

নোহালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফ আলী বলেন, ভাঙনের পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ইতোমধ্যে একাধিক বসতবাড়ি ও বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানানো হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা না নিলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।
গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেসমিন আক্তার বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে ভাঙনরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা হবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, ভাঙনের খবর পাওয়ার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী ভাঙনরোধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত জিও ব্যাগ ফেলে নদীভাঙন রোধ, সেতু রক্ষা বাঁধ সংরক্ষণ, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এবং তিস্তা নদীর স্থায়ী নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হোক। তাদের অভিযোগ, প্রতিবছর বন্যা ও নদীভাঙনের পুনরাবৃত্তি হলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের অভাবে তিস্তাপাড়ের মানুষের জীবন-জীবিকা ও ভবিষ্যৎ বারবার হুমকির মুখে পড়ছে।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক সকালের বাণী
Theme Designed BY Kh Raad ( Frilix Group )