1. [email protected] : Md Hozrot Ali : Md Hozrot Ali
  2. [email protected] : Sokaler Bani : Iqbal Sumon
  3. [email protected] : Md Hozrot Ali : Md Hozrot Ali
সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি: শান্তিপূর্ণ সমাজের বড় শত্রু | দৈনিক সকালের বাণী
বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৪৫ অপরাহ্ন

সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি: শান্তিপূর্ণ সমাজের বড় শত্রু

সকালের বাণী ডেস্ক
  • আপলোডের সময় : বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৭ জন দেখেছেন
সমাজে মানুষের নিরাপত্তা শুধু তার জীবনের নিরাপত্তার নাম নয়; তার উপার্জন, সম্পদ, সম্মান এবং স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার অধিকারও এর অন্তর্ভুক্ত। যখন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ভয় দেখিয়ে মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে, হুমকি দিয়ে সম্পদ কেড়ে নেয় কিংবা সহিংসতার মাধ্যমে জনজীবনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে, তখন তা শুধু একজন ব্যক্তির ওপর অন্যায় নয়—সমাজের শান্তি, শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতার ওপরও সরাসরি আঘাত। এ কারণেই ইসলাম সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, জুলুম ও মানুষের অধিকার হরণের মতো কর্মকাণ্ডকে অত্যন্ত কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।
সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির পদ্ধতি ভিন্ন হলেও উভয়ের ভিত্তি একই—ভয় সৃষ্টি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অন্যের অধিকার কেড়ে নেওয়া। সন্ত্রাস মানুষের জীবন ও নিরাপত্তাকে বিপন্ন করে, আর চাঁদাবাজি মানুষের সম্পদ ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ওপর আঘাত হানে। ইসলাম এমন কোনো সমাজব্যবস্থাকে সমর্থন করে না, যেখানে শক্তিশালী বা প্রভাবশালী কেউ দুর্বল মানুষের ওপর অন্যায়ভাবে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
পৃথিবীতে ফ্যাসাদ সৃষ্টি নিষিদ্ধ
মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার প্রতি ইসলাম অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। সমাজে এমন কোনো কর্মকাণ্ডের সুযোগ নেই, যার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়, স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয় কিংবা শান্তি ও শৃঙ্খলা নষ্ট হয়। সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি এ ধরনের অপরাধের অন্যতম উদাহরণ। এগুলোর মাধ্যমে ব্যক্তি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি সামগ্রিকভাবে সমাজেও ভয়, অস্থিরতা ও অবিশ্বাস ছড়িয়ে পড়ে।
কোরআনে পৃথিবীতে ফ্যাসাদ বা বিপর্যয় সৃষ্টি করতে নিষেধ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি পৃথিবীতে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করতে চেয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারীদের ভালোবাসেন না।’
(সুরা : কাসাস, আয়াত : ৭৭)
সুতরাং সমাজে আতঙ্ক, বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করে এমন কর্মকাণ্ড ইসলামের শান্তি ও ন্যায়ভিত্তিক আদর্শের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ গ্রহণ নিষিদ্ধ
ইসলাম মানুষের সম্পদের অধিকারকে অত্যন্ত মর্যাদা দিয়েছে। বৈধ ব্যবসা, শ্রমের বিনিময় কিংবা পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে সম্পদ অর্জন করা বৈধ। কিন্তু ভয়ভীতি, হুমকি, প্রভাব, বলপ্রয়োগ কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার করে কারো কাছ থেকে অর্থ বা সম্পদ নেওয়া সম্পূর্ণ অন্যায়।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ কোরো না।’
(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৮৮)
চাঁদাবাজি এই নিষেধাজ্ঞার একটি সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কারণ চাঁদাবাজির মাধ্যমে একজনের সম্পদ তার স্বেচ্ছাসম্মতি ছাড়া ভয় বা চাপ প্রয়োগ করে আদায় করা হয়। ফলে এটি শুধু একটি সামাজিক অপরাধ নয়; ইসলামের দৃষ্টিতেও এটি অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ ভোগ করার শামিল।
মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের মর্যাদা
ইসলামে মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানকে পবিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। একজন মানুষ অন্যায়ভাবে অন্যের জীবন, সম্পদ কিংবা মর্যাদার ওপর হস্তক্ষেপ করতে পারে না। চাঁদাবাজি মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত করার পাশাপাশি অনেক সময় তার সম্মান, সামাজিক অবস্থান ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।
বিদায় হজের ভাষণে রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষের জীবন ও সম্পদের মর্যাদা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন—‘তোমাদের রক্ত ও তোমাদের সম্পদ তোমাদের জন্য হারাম (মর্যাদাপূর্ণ), যেমন তা হারাম (মর্যাদাপূর্ণ) তোমাদের এই দিনে, তোমাদের এই মাসে এবং তোমাদের এই শহরে।’
(মুসলিম, হাদিস : ১২১৮)
এই হাদিস থেকে স্পষ্ট হয়, একজন মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনার অন্তর্ভুক্ত।
জুলুমের পরিণতি ভয়াবহ
সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির মূলে রয়েছে জুলুম। একজন সন্ত্রাসী যখন ভয় দেখিয়ে মানুষের নিরাপত্তা নষ্ট করে কিংবা তার জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে, তখন সে জুলুম করে। একইভাবে চাঁদাবাজ যখন হুমকি বা প্রভাব খাটিয়ে মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে, তখন সেও জুলুমের পথ অবলম্বন করে।
ইসলাম জুলুমের ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা দিয়েছে। জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা জুলুম থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয়ই জুলুম কিয়ামতের দিন অন্ধকারসমূহে পরিণত হবে।’
(মুসলিম, হাদিস : ৬৭৪১)
দুনিয়ায় ক্ষমতা, প্রভাব কিংবা ভয় দেখিয়ে অন্যায়ভাবে সুবিধা নেওয়া সাময়িকভাবে সম্ভব হলেও এর পরিণতি আখিরাতে অত্যন্ত কঠিন।
অন্যায়ভাবে অর্থ আদায়কারীদের ব্যাপারে সতর্কতা
মানুষের কাছ থেকে অন্যায়ভাবে অর্থ আদায়কে ইসলাম অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করেছে। হাদিসে অন্যায়ভাবে মানুষের কাছ থেকে অর্থ বা শুল্ক আদায়কারী ব্যক্তিকে ‘সাহিবু মাক্স’ বলা হয়েছে। এ ধরনের ব্যক্তির ব্যাপারেও রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোর সতর্কতা প্রদান করেছেন।
একজন তাওবাকারী নারী সাহাবির ঘটনা প্রসঙ্গে আবদুল্লাহ ইবনু বুরাইদাহ (রহ.) তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, নবী (সা.) বলেছেন, ‘সে এমন তাওবা করেছে যে একজন মাক্স গ্রহণকারীও যদি এমন তাওবা করত, তাহলে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হতো।’
(মুসলিম, হাদিস : ৪৩২৪)
হাদিসে ‘সাহিবু মাক্স’ বলতে অন্যায়ভাবে মানুষের কাছ থেকে অর্থ বা শুল্ক আদায়কারী ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে। এতে বোঝা যায়, মানুষের ওপর অন্যায় আর্থিক বোঝা চাপানো ইসলামে কতটা গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত।
মানুষের অধিকার নষ্ট করলে শুধু তাওবা যথেষ্ট নয়
চাঁদাবাজির ক্ষেত্রে শুধু আল্লাহর হক নয়, বান্দার হকও জড়িত। কেউ যদি অন্যায়ভাবে কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ বা সম্পদ গ্রহণ করে, তাহলে শুধু মুখে তাওবা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। সম্ভব হলে অন্যায়ভাবে নেওয়া অর্থ বা সম্পদ প্রকৃত মালিককে ফিরিয়ে দিতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির অধিকার আদায় করতে হবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যদি কোনো ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের প্রতি তার সম্মান বা অন্য কিছুতে কোনো জুলুম ও অন্যায় করে থাকে, তাহলে সেদিন আসার আগেই সে যেন আজই তার নিকট হতে (ক্ষমা চাওয়া অথবা প্রতিশোধ দেওয়ার মাধ্যমে) নিজেকে মুক্ত করে নেয়।’
(বুখারি, হাদিস : ২৪৪৯, ৬৫৩৪; তিরমিজি, হাদিস : ২৪১৯)
এই নির্দেশনা থেকে বোঝা যায়, মানুষের অধিকার নষ্ট করার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই অন্যায়ভাবে অর্জিত অর্থ বা সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির কাছে ক্ষমা চাওয়া তাওবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি প্রতিরোধ জরুরি
সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি কোনো সুস্থ সমাজের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। সন্ত্রাস মানুষের জীবন ও নিরাপত্তাকে বিপন্ন করে, আর চাঁদাবাজি মানুষের সম্পদ ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা কেড়ে নেয়। এর ফলে সমাজে ভয়, অবিশ্বাস, অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়তে থাকে। একসময় এসব অপরাধ সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশকেও দুর্বল করে দেয়।
ইসলাম মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের নিরাপত্তাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। তাই জুলুম, ভয়ভীতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি এবং অন্যের অধিকার হরণের মতো কর্মকাণ্ড থেকে ব্যক্তি ও সমাজকে মুক্ত রাখা সবার দায়িত্ব। ন্যায়, সততা, পারস্পরিক সম্মান এবং মানুষের অধিকার সংরক্ষণের মধ্য দিয়েই একটি শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও কল্যাণময় সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক সকালের বাণী
Theme Designed BY Kh Raad ( Frilix Group )