সরেজমিনে দেখা যায়, করতোয়ার নদীর ত্রিমোহনী ঘাটে নির্মিত ব্রিজটি দিনাজপুর সদর থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার পূর্বে ইতিহাস সমৃদ্ধ ঘোড়াঘাট উপজেলায় অবস্থিত। এই উপজেলাতেই রয়েছে ঐতিহাসিক ঘোড়াঘাট দুর্গ, শাহ্ ইসমাইল গাজীর মাজার, ঐতিহাসিক বারোপাইকের গড়, মোঘল নিদর্শন সুজা মসজিদ, ভাঙ্গা মসজিদ। মাটির নীচে চাপা পড়ে আছে সেন ও পাল আমল সহ বহু ঐতিহাসিক নিদর্শন।
ইতিহাস সমৃদ্ধ এই ঘোড়াঘাটের পাশ দিয়েই বয়ে গেছে এক সময়ের খরস্রোতা করতোয়া নদী। বর্ষা মৌসুমে যেমন থাকে অথৈ পানি তেমনি খরা মৌসুমে নদীর বুক চিড়ে জেগে উঠে বিস্তীর্ণ চর। দুই পাড়ের মানুষের যাতায়াতের সুবিধার্থে ঘোড়াঘাটের ত্রিমোহনী নামক স্থানে তৈরি হয়েছে একটি ব্রিজ। যা ত্রিমোহনী ব্রিজ নামে সর্বত্র পরিচিত। খোলামেলা পরিবেশ, বর্ষা মৌসুমে নদীর অথৈ পানি ও বর্ষা মৌসুমে বিস্তীর্ণ চর দেখতে প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকসমাগম ঘটে। যা বর্তমানে বিনোদনের কেন্দ্র হিসাবে গড়ে উঠেছে। ইট-পাথরের ব্যস্ত শহরের কোলাহল থেকে মুক্তি পেতে ছুটে যাচ্ছেন অনেক দর্শনার্থী ওই ত্রিমোহনী ব্রিজে। বিশেষ করে বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব ঈদ ও দুর্গা পূজার পর পরই সেখানে বিনোদন প্রেমিদের আনাগোনা বেড়ে যায়।
ব্রিজটির অবস্থান দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে হলেও, উত্তরে রংপুর জেলার পীরগঞ্জ, পূর্বে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী ও দক্ষিণ পূর্ব কোণে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা থেকে খুব বেশি দূরে নয়। ব্রিজটি অন্যান্য উপজেলাগুলোর নিকটবর্তী হওয়ায় খুব সহজেই ব্রিজে আশা যাওয়া করা যায় বিধায় দিনদিন এর আকর্ষণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাকা রাস্তা হওয়ার কারণে অনেকেই সিএনজি চালিত যানবাহন রিজার্ভ করে নিয়ে আসে। কেউ আবার পরিবার সহ মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল যোগে অনেক দূর থেকে এসে বিনোদনের মাত্রা বাড়িয়ে নেয়। বিশেষ করে, বর্ষা মৌসুমে করতোয়া নদী পানিতে টই টুম্বর হয়ে যায় তখন এলাকাটি আরো আকর্ষনীয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে নৌকা নিয়ে ভ্রমণের জন্য হাজারো পর্যটকরা এখানে ভীড় জমান। খরা মৌসুমেও বিস্তীর্ণ চর বিনোদন প্রেমীদের মনকে চরম আনন্দ দিয়ে থাকে। দর্শনার্থীদের সুবিধার জন্যে এখানে গড়ে উঠেছে রেস্তোরাঁ। রাস্তা ও ব্রিজের পাশে বসে ঝাল মুড়ি সহ বিভিন্ন ধরনের মুখরোচক খাবারের দোকান। ঈদ ও দুর্গা পূজার সময় এখানে এক বা দুই দিনের মেলাও বসে। মেলাতে মিষ্টান্ন থেকে শুরু করে সব ধরনের খাবার পাওয়া যায়। চরকি, ঘূর্ণি সহ বিনোদনের বিভিন্ন উপকরণ দর্শনার্থীদের বিনোদনের মাত্রা বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। বিভিন্ন স্থান থেকে বহু মানুষ প্রশান্তির জন্য বা পিকনিক করতেও সেখানে ছুটে যান। প্রায় সারা বছর দর্শনার্থীদের কম বেশি আনাগোনা থাকলেও ঈদ ও পূজার সময় ত্রিমোহনী ব্রিজে তিল পরিমাণ জায়গা ফাঁকা থাকেনা।
গাইবান্ধা জেলার ঢোলভাঙ্গা উপজেলার দর্শনার্থী নাসির উদ্দীনের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, বিভিন্ন ব্যস্ততার কারণে ঈদে আসতে পারিনি। কিন্তু এখন এসেও খারাপ লাগছেনা। পরিবারকে সাথে এনেছি। খোলামেলা পরিবেশে এসে তাদেরও অনেক ভালো লাগছে।
পীরগঞ্জ উপজেলার চতরা থেকে আসা দর্শনার্থী রাইসুল ইসলাম জানান, সময় পেলেই ব্যস্ততার মাঝেও এখানে চলে আসি। সরকারিভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করে যদি এখানে বিনোদন কেন্দ্র করা যায় তা এ উপজেলার পরিচিতিকে আরও বাড়িয়ে দেবে। পাশাপাশি কাছাকাছি কোনো খোলামেলা বিনোদন কেন্দ্র না থাকায় বিনোদনের চাহিদাও পূরণ হবে।
উপজেলার রানীগঞ্জ বাজারের স্থানীয় বাসিন্দা মোস্তাফিজুর রহমানের সাথে কথা হলে বলেন, ত্রিমোহনী ব্রিজকে বিনোদন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। একটা ব্রিজকে কেন্দ্র করে যদি এতো লোকের সমাগম হয়, তবে বিনোদন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তুললে আরও বেশি জন সমাগম হবে। তিনি স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে সরকারকে বিষয়টি আমলে নেওয়ার অনুরোধ করেন।
বিষয়টি নিয়ে ঘোড়াঘাট পৌর বিএনপির সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র আব্দুস সাত্তার মিলনের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, দিনদিন ত্রিমোহনী ব্রিজে দর্শনার্থীদের সমাগম বেড়ে যাচ্ছে। একটা ভালো মানের পার্ক বা বিনোদন কেন্দ্র করার মতো সরকারি খাস জমিও আছে। স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে যদি এখানে বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলা যায় তাহলে ঘোড়াঘাটের সুনাম সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়বে।
বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, সরেজমিনে পরিদর্শন করে যদি এখানে সরকারি খাস জমি থেকে এবং তা বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলার উপযুক্ত হয়, তবে এখানে বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলা যাবে। তিনি আরও বলেন, স্থানীয় বাসিন্দাসহ উপজেলার সকল শ্রেণি পেশার মানুষের সার্বিক সহযোগিতা নিয়ে প্রথম বারের মতো উপজেলায় কোন এলাকাকে বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। এলাকাটি বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা গেলে স্থানীয়দের পাশাপাশি আশে পাশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষরা যান্ত্রিক এই জীবনের শত ব্যস্ততার মাঝেও একটু বিনোদন গ্রহণ করতে পারবেন। অপরদিকে হাজার হাজার পর্যটকের আগমনের ফলে এই অঞ্চলে গড়ে উঠবে নতুন নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। সৃষ্টি হবে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের। পাল্টে যাবে অর্থনৈতিক দৃশ্যপট।