পরিপত্র অনুযায়ী শুধু প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা অর্থাৎ ইউএনও, এসিল্যান্ড বা সমমানের সরকারি কর্মকর্তারাই প্রশাসক হতে পারেন। অথচ নিয়োগপ্রাপ্ত দুইজনের কেউই সরকারি বা রাজস্বভুক্ত কর্মকর্তা নন।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ১২ ডিসেম্বর রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রবিউল ফয়সাল স্বাক্ষরিত এক পত্রে বলা হয়, পীরগাছা উপজেলার কল্যানী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নূর আলম ইউনিয়ন পরিষদে অনুপস্থিত রয়েছেন।
পীরগাছা উপজেলা নির্বাহী অফিসার ওই চেয়ারম্যানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতির কারণে জনসাধারণ কাঙ্খিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ প্রেক্ষাপটে ইউনিয়ন পরিষদের স্বাভাবিক কাজ পরিচালনা এবং জনসেবা অব্যাহত রাখার জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগ কর্তৃক গত ১৯ আগস্ট তারিখে জারীকৃত পরিপত্রের অনুচ্ছেদ তিন মোতাবেক ইউএনও’র সুপারিশে উপজেলা ফারুকুজ্জামান ডাকুয়াকে কল্যাণী ইউনিয়ন পরিষদ পরিচালনার জন্য আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা অর্পণ করা হলো।
একইভাবে ১৭ নভেম্বর উপজেলার অন্নদানগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলামকে অনুপস্থিত দেখিয়ে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) উপজেলা ফ্যাসিলেটর আক্তার ফারুক মিয়াকে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়।
তবে স্থানীয় সরকার বিভাগ কর্তৃক গত বছরের ১৯ আগস্ট জারীকৃত পরিপত্রের অনুচ্ছেদ তিনে বলা হয়েছে, প্যানেল চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে অথবা যে কোন জটিলতা পরিলক্ষিত হলে বর্ণিত আইনের ধারা ১০১ ও ১০২ প্রয়োগ করে বিভাগীয় কমিশনার বা জেলা প্রশাসক স্ব স্ব অধিক্ষেত্রে তাঁর অধীনস্থ কর্মকর্তা যেমন: উপজেলা নির্বাহী অফিসার বা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা উপযুক্ত সরকারি কর্মকর্তাকে আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা অর্পণ করে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদগুলোকে সচল রেখে জনসেবা অব্যাহত রাখবেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রামের (সেসিপ) আওতায় উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) উপজেলা ফ্যাসিলেটর চুক্তিভিত্তিক পদে কর্মরত।
নিয়োগপ্রাপ্ত দুইজনের কেউই সরকারি কর্মকর্তা নন। সেসিপের একাডেমিক সুপারভাইজার ও জাইকার উপজেলা ফ্যাসিলেটর পদটি রাজস্বভুক্তও নয়। তাই উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার ফারুকুজ্জামান ডাকুয়া ও উপজেলা ফ্যাসিলেটর আক্তার ফারুক মিয়াকে অবৈধভাবে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। অভিযোগে জানা যায়, মাধ্যমিক স্তরে শ্রেণি কক্ষ পরিচালনা, প্রাত্যাহিক সমাবেশ ও শুদ্ধভাবে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া, শিক্ষকদের নিয়মিত পাঠটীকা প্রস্তুত এবং সে অনুযায়ি ক্লাশ নেয়া হচ্ছে কিনা তা দেখভালের দায়িত্ব উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজারের।
কিন্তু পীরগাছায় একাডেমিক সুপারভাইজার থাকলেও তার বিরুদ্ধে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথভাবে পরিদর্শন না করার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া নিজে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা না হয়েও প্রিজাইডিং কর্মকর্তা সেজে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গোপনে কমিটি গঠন ও নিয়োগে সহযোগিতা করেন তিনি। এতে পীরগাছার বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কমিটি গঠন ও নিয়োগ বাণিজ্য নিয়ে স্থানীয়ভাবে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছে।
সর্বশেষ নিজে সরকারি কর্মকর্তা না হয়েও কল্যাণী ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক পদ বাগিয়ে নেন তিনি। এছাড়া মাসের অধিকাংশ সময়ই তাকে উপজেলার নানা অনুষ্ঠানে উপস্থাপকের দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। ফলে উপস্থাপনা ও প্রশাসকের কাজ করতে গিয়ে তার মূল কাজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তদারকি বন্ধ রয়েছে। এতে উপজেলাজুড়ে শিক্ষার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
কল্যাণী ইউনিয়নের ইউপি সদস্য শাহীন মির্জা সুমন বলেন, এই নিয়োগে বাণিজ্য হয়েছে। না হলে সরকারি নিয়ম না মেনে কেন প্রশাসক নিয়োগে সুপারিশ করবেন ইউএনও। উপজেলায় তো প্রথম শ্রেণির উপযুক্ত কর্মকর্তার অভাব নেই। জাইকার উপজেলা ফ্যাসিলেটর আক্তার ফারুক মিয়া বলেন, আমি সরকারি কর্মকর্তা না তবে আমি উপযুক্ত বলেই ইউএনও সুপারিশ করেছেন। এ বিষয়ে পীরগাছা উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার ও কল্যাণী ইউপি প্রশাসক ফারুকুজ্জামান ডাকুয়া বলেন, নিয়ম মেনেই আমি দায়িত্ব পালন করছি।
এ বিষয়ে সদ্য বিদায়ী ইউএনও নাজমুল হক সুমনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রবিউল ফয়সাল বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।