


সম্প্রতি অনলাইন ক্যাসিনো এজেন্টদের রাতারাতি অর্থসম্পদের পাহাড় দেখে স্থানীয় মানুষদের চোখ কপালে, যারা কিছুদিন আগেও কোনরকম জীবনযাপন করেছে, তারাই এখন টাকার কুমির! ক্যাসিনো এজেন্ট ও তার সহযোগীরা এখন সম্পদশালী ও প্রভাবশালী। রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী সহ প্রায় সব জেলাতেই দিন দিন বেড়ে চলছে অবৈধ অনলাইন ক্যাসিনো জুয়ার আসর। লালমনিরহাটের অন্যান্য উপজেলা ছাড়াও কালীগঞ্জ উপজেলায় কাকিনা, মদাতি, তুষভান্ডার, ভোটমারী, ভুল্লারহাট বাজার সহ বিভিন্ন এলাকায় চলছে এই অবৈধ অনলাইন ক্যাসিনো জুয়া। এতে জড়িয়ে পড়ছে উঠতি বয়সী তরুণরা, যা সুন্দর স্বাভাবিক সমাজব্যবস্থার জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় এসব এজেন্ট অনলাইন ক্যাসিনো পরিচালিত হচ্ছে। অনেকে দাবি করেছেন, কিছু প্রভাবশালীর পৃষ্ঠপোষকতায় এসব ক্যাসিনো ব্যবসা দীর্ঘদিন ধরে অব্যাহত রয়েছে।
এর ফলে এলাকায় অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে, চুরি-ডাকাতির মতো অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং অনেক তরুণ পড়াশোনা ছেড়ে অনলাইন জুয়ার ফাঁদে পা দিচ্ছে। অনলাইন জুয়ার টাকায় তরুনদের বেশিরভাগ মাদক সেবন সহ অনেক অপরাধে জড়াচ্ছে। সূত্র জানিয়েছে, লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার শুধু মেডিকেল মোড়, ভুল্যারহাট ও মদাতী পয়েন্টেই শত শত তরুন যুবক অনলাইন জুয়ার অবৈধ কর্মকান্ডের সাথে জড়িত রয়েছেন, যা পরিচালিত হচ্ছে কয়েকজন এজেন্টের মাধ্যমে। এবং কেউ কেউ রংপুর শহরে বসে অন্য ব্যবসার আড়ালেও এজেন্ট চালাচ্ছেন উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে। তথ্য সংগ্রহের সময় অনেকেই জানান অনলাইন জুয়া সংক্রান্ত খবর প্রকাশে সাবধানতা অবলম্বন করার জন্য কারন, চক্রটির হাতে প্রচুর টাকা আছে, অস্ত্রও থাকতে পারে এবং প্রভাবশালীদের পৃষ্ঠপোষকতা আছে বলেই এদের বিষয়ে কেউ সংবাদ করার তেমন সাহস দেখায় না।
ক্যাসিনোতে নিঃস্ব হয়েছে এমন একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অবাধ তথ্যপ্রযুক্তির নেতিবাচক সুযোগ কাজে লাগিয়ে অনলাইনে গড়ে তোলা হয়েছে অপরাধের এই বিরাট সাম্রাজ্য। পদে পদে দেওয়া হচ্ছে লোভনীয় অফার। যেগুলো মূলত টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ফাঁদ। সেই ফাঁদে পা দিয়ে তিনি আজ নিঃস্ব। তবে তিনি জানান এজেন্টরা সবাই হয়েছেন আঙুল ফুলে কলাগাছ।
অনলাইন ক্যাসিনোতে শুধু অর্থ নয় নৈতিক স্খলনও ঘটছে অনেকের। বারংবার কঠোরতা দেখিয়েও নানা ফাঁকফোকর আর কতিপয় অসাধু ব্যক্তিদের তৎপরতায় শেষপর্যন্ত নীরব পরাজয়ের শিকার হতে হয় নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ও সংশ্লিষ্টদের দাবী অনেকের। ফলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে অনলাইন গ্যাম্বলিং (জুয়া), বেটিং (বাজি) আর ক্যাসিনো।
সূত্র জানিয়েছে, অনলাইন জুয়াড়িরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে নানা কৌশল এঁটেছে। হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রামে তারা এজেন্টদের সাথে যোগাযোগ করছে। নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য ব্যবহার করছে অপ্রচলিত বিভিন্ন অ্যাপস। যারা জুয়া খেলেন তারাও এসব অ্যাপ ও নাম্বার ব্যবহার করছেন। প্রতিনিয়তই নম্বরগুলো বদলে ফেলছেন তারা। চক্রের একজনের উপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারী আঁচ করতে পারলেই গ্রুপের সমস্ত তথ্য ডিলিট করে দেওয়া হয়। এছাড়া ছদ্মনামে এনক্রিপ্টেড অ্যাপে যোগাযোগ করার ফলে কেউ কাউকে চেনে না। এতে বিভিন্ন সময় গ্রেপ্তারকৃতের কাছ থেকেও আশানুরূপ তথ্য পাওয়া যায় না। অনুসন্ধানে জানা যায়, অনলাইন জুয়া পরিচালনা হচ্ছে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সাইট থেকে।
ফেসবুক-ইউটিউবে প্রচার করা হচ্ছে এসব সাইটের বিজ্ঞাপন। ফ্রি-ফায়ার, ক্যাসিনো, জেডউইন, বাবু ৮৮, জেডবার্ড, মারবেল, বাজি ৯৯৯, টেনবার্ডটি, পাবজি, লুডু, ক্যারাম বোর্ড, বেটিং, ক্যাসিনো বা জুয়া বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হলেও খুব সহজেই ওয়ান এক্স বেট, মেলবেট, বেট উইনার, জেটউইন বাংলাদেশ, মাইজেট, ক্রিকেক্স, বাজি ৩৬৫ ক্যাসিনোসহ (অন্যান্য বেটিং ও ক্যাসিনো ওয়েবসাইটের নাম অনুসন্ধানের স্বার্থে গোপন রাখা হলো) অনেক বেটিং ও ক্যাসিনোর ওয়েবসাইটে খুব সহজেই যুক্ত হওয়া যাচ্ছে। এসব সাইটে টাকা ডিপোজিট করে স্লটস, ই-গেমস, টেবিল গেম, কার্ড গেম, ভিডিও পোকার ও লাইভ ক্যাসিনোতে অংশ নেওয়া যায়। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবী, অনলাইন জুয়ার সাথে সম্পৃক্ত অভিযুক্তদের যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়, তখন অনেকেই হয়তো নীরৎসাহিত হবে। একই সাথে টেলিভিশন এবং ফেসবুক ও ইউটিউবসহ বিভিন্ন অনলাইন প্লাটফর্মে নানা বেটিং অ্যাপসের বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়, সরকারি উদ্যোগে সেগুলো বন্ধ করা উচিত।
অন্যথায় এই মহামারী বন্ধ করা সম্ভব নয়। উপজেলার ক্যাসিনো কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতে চাইলে কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু সিদ্দিক বলেন, অনলাইন ক্যাসিনোকান্ডে একজনকে এর আগে গ্রেফতার করা হয়েছিলো, এখন তেমন কর্মকান্ড দৃশ্যমান নেই, এমন অপরাধদমনে পুলিশ তৎপর আছে। এছাড়াও পাটগ্রাম উপজেলায় গত ডিসেম্বরে অনলাইন ক্যাসিনো ও জুয়ার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে দুইজন এজেন্টকে গ্রেপ্তার করেছিলো পুলিশ। পাশাপাশি লালমনিরহাট গোয়েন্দা পুলিশ গত মে মাসে চার জনকে গ্রেফতার করেছিলো।
সুধী সমাজ আশা করছেন মাদকনির্মুলসহ অনলাইন ক্যাসিনোর সাথে জড়িতদের তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমেই শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে পাশাপাশি পারিবারিক এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের নতুন নেতৃত্ব বড় ভুমিকা রাখবে বলে বিশ্বাস করেন তারা।