সারা বছর বিভিন্ন ধরনের মৌসুমি সবজি উৎপাদন করে একদিকে যেমন রাজারহাট উপজেলার মানুষের সবজির চাহিদা মেটাচ্ছেন, অন্যদিকে এসব সবজি যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।
রাজারহাট উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার মোট সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৫৩ শতাংশই অর্জিত হয় মীরেরবাড়ি এলাকায়। এ এলাকায় প্রায় ৮০০ জন কৃষক সরাসরি সবজি চাষের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন।
সরেজমিনে মীরেরবাড়ি গ্রামের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, মাঠের পর মাঠজুড়ে বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজির সমারোহ। কৃষকের হাড়ভাঙা খাটুনি, নিপুণ পরিচর্যা আর মাটির গুণে বেড়ে উঠছে এসব ফসল। বাড়ির আঙিনা থেকে শুরু করে বিস্তীর্ণ আবাদি জমি—সবখানেই যেন সবুজের ছোঁয়া।
কৃষকেরা জানান, মীরেরবাড়ির মাটি মূলত দো-আঁশ। যেখানে বালি, পলি ও কাদা মাটির সমতা রয়েছে। পাশাপাশি এলাকার জমিগুলো তুলনামূলক উঁচু হওয়ায় অতিরিক্ত পানি জমে থাকে না। ফলে এ এলাকার জমি সবজি চাষের জন্য বেশ উপযোগী।
এ ছাড়া বাজারে সবজির চাহিদা এবং তুলনামূলক ভালো লাভের আশায় কৃষকেরা সবজি চাষের দিকে বেশি ঝুঁকছেন। কৃষকদের দাবি, মাটির গুণাগুণ ভালো হওয়ায় অনেক সময় তুলনামূলক কম সার ও কীটনাশক ব্যবহার করেই ভালো ফলন পাওয়া যায়। এতে উৎপাদন খরচ কমে আসে এবং সবজির গুণগত মানও ভালো থাকে।
কৃষক রুহুল আমিনের কাছে সবজি চাষে কেমন লাভ হয়, জানতে চাইলে নিজের জমির হিসাব কষে দেন তিনি। এ বছর শীতের মৌসুমের জন্য ৫০ শতক জমিতে পাতাকপি ও ৬০ শতকে ফুলকপি চাষ করেছেন তিনি। এতে তার খরচ হয়েছে ৮০ হাজার টাকা। ফসল ভালো হলে এবং বাজারে সঠিক দাম পেলে প্রায় ২ লাখ টাকার ফসল বিক্রির আশা করছেন তিনি।
কিষাণী মোছা. জহুরা বেগম ও রহিমা বেগম জানান, তারা অন্যের ৩০ শতক জমি বর্গা নিয়ে সবজি চাষ করেছেন। এবার তারা ওই জমিতে বেগুন লাগিয়েছেন। ৩০ শতক জমি প্রস্তুত, বীজ ক্রয়, সার, বালাইনাশক, সেচ ও পরিচর্যাসহ সব মিলিয়ে তাদের ২৭ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। জমিতে শ্রমিক হিসেবেও তারা নিজেরাই কাজ করেন।
মীরেরবাড়ি থেকে উৎপাদিত সবজি সংগ্রহকারী স্থানীয় পাইকার দুলু মিয়ার ভাষ্য, মীরেরবাড়ির এই সবজি শুধু রাজারহাট না দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যায়। ৩০ টাকা দরে সবজি কিনে, ৫০ টাকায় বাহিরে পাঠাই। সেই সবজি দোকানদার ৮০ টাকা বেচায়।
কৃষকদের অভিযোগ, দোকানে গেলে অনেক সময় সার পাওয়া যায় না। সার নিতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ানোর পরও চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত পরিমাণ সার পাওয়া যায় না। এতে সময়মতো জমিতে সার প্রয়োগ করা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছো।
কৃষকদের মতে, সবজি উৎপাদনের পাশাপাশি ন্যায্য বাজারদর নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ। সময়মতো সার-বীজ ও বালাইনাশক সরবরাহ, কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ এবং উৎপাদিত সবজি সহজে বাজারজাত করার সুযোগ তৈরি করা গেলে মীরেরবাড়ির সবজি চাষ আরও সম্প্রসারিত হতে পারে।
এ বিষয়ে রাজারহাট উপজেলা অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা হৈমন্তী রানী জানান, গত অর্থবছরে মীরেরবাড়িতে সবজি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪০০ হেক্টর, অর্জনও হয়েছে ৪০০ হেক্টর। পুরো উপজেলায় লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭৬০ হেক্টর।
কৃষকদের পর্যাপ্ত পরিমাণ সার না পাওয়ার অভিযোগের বিষয়ে হৈমন্তী রানী বলেছেন, বর্তমানে কোনো সারসংকট নেই। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে সার সরবরাহ করা হচ্ছে।