মতামত

বিলুপ্তির পথে ফুলবাড়ীর আড়াই,শ বছরের ঐতিহ্যবাহী জমিদারবাড়ী

অনিল চন্দ্র রায়,ফুলবাড়ী   কুড়িগ্রাম

২৭ জানুয়ারী ২০২৪


| ছবি: প্রতিনিধি

আড়াই,শ বছরের ঐতিহ্যবাহী নাওডাঙ্গা জমিদারবাড়ীটি এখন বিলুপ্তির পথে। স্থানীয়রা যুগের পর যুগ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমিদারবাড়ীটি সংস্কারের দাবী করে আসলেও আড়াই,শ বছর পেড়িয়ে গেলেও সংস্কারের উদ্যোগ নেয়নি কর্তপক্ষ। অবিভক্ত ভারত বর্ষে অনেক আগে নাওডাঙ্গার পরগনার জমিদার বাহাদুর শ্রীযুক্ত বাবু প্রমদা রঞ্জন বক্সী এটি নির্মাণ করেন। এটির দেখাশুনাসহ পূর্ণ পরিচালনার ভার ন্যস্ত ছিল শ্রী যুক্ত বাবু শীব প্রসাদ বক্সীর উপর। কুমার বাহাদুর বীরেশ্বর প্রসাদ বক্সী, বিশ্বেস্বর প্রসাদ বক্সী ও বিপুলেশ্বর প্রসাদ বক্সী এ তিনজন জমিদার ছিলেন। মেয়ে ছিল পুটু। বিয়ে হয় রংপুর জেলার মীরবাগের জমিদারের সঙ্গে।  তার প্রথম পুত্র বীরেশ্বর প্রসাদ বক্সী পাশ্চাত্যে পড়ালেখা করে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে কলকাতায় আইন পেশায় কর্মময় জীবন শুরু করেন। তিনি একজন  বিচারক ছিলেন। তার  দ্বিতীয় পুত্র বিশ্বেস্বর প্রসাদ বক্সীর হাতে জমিদারী ভার ন্যস্ত করে জমিদার প্রমদা রঞ্জন অবসর নেন। তৃতীয় পুত্র বিপুলেশ্বর প্রসাদ বক্সী ছিলেন প্রকৌশলী। 
কথিত আছে,পরবর্তী জমিদার জমিদারী ভার গ্রহণ করার আগে তৎকালীন সময়ে পর পর তিন বার প্রবেশিকা পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন। তার পিতা জমিদার প্রমদা রঞ্জন বক্সী তার পুত্রকে বলেন, “তোমার ভাগ্য খারাপ। অনেক ভাগ্যগুণে তুমি আমার সন্তান হিসাবে জন্ম নিয়েছ। বাকিরা যেহেতু পড়ালেখা শিখে অন্য কিছু হতে চায় সেহেতু তোমাকেই আমি আমার জমিদারী ভার দিতে চাই।” পরে তাকে এ দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। সে আমলে সেখানে তিনি একটি মাইনর স্কুল গড়ে দেন। সেটি এখন বর্তমানে নাওডাঙ্গা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও নাওডাঙ্গা স্কুল এন্ড কলেজে পরিনিত হয়েছে। শিক্ষার পাশাপাশি শিল্প সংস্কৃতির প্রতি জমিদার  বিশ্বেস্বর প্রসাদ বক্সী ছিলেন সমান অনুরাগী। 
তার ইচ্ছায় সে সময় ভগবান শ্রী কৃষ্ণের পূর্ণ জন্ম তিথি উপলক্ষে প্রতি বছর দোল পূর্ণিমায় জমিদার বাড়ীর সামনে বি¯তৃর্ন ফাকা মাঠে দোলের মেলা বসত। মেলায় বিভিন্ন এলাকা থেকে দোল সওয়ারীরা বাহারি সাজে সজ্জিত হয়ে দোল মূর্তি সিংহাসনে নিয়ে এই দোলের মেলায় অংশ গ্রহণ করত। যা এখনও বর্তমান।

১৩০৪ সনের ভূমিকম্পের পরে অন্য দুই ভাই কোচবিহারে স্থায়ী বসবাসের জন্য একটি বাড়ি কেনেন। তারা অনেক অনুনয় বিনয় করে তাদের পিতাকে সেখানে নিয়ে যান। সেই বাড়িতে তাদের পিতা-মাতা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তবে তিনি শুধু জমিদারী নিয়ে পড়েছিলেন নাওডাঙ্গায়। জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর তিনি সব কিছু ছেড়ে সেখানে চলে যান ভারতের কোচবিহার জেলায়। তবে সর্বশেষ চল্লিশ সনের রেকর্ডে নাওডাঙ্গার সমস্ত জমি তার নামেই হয়েছে। জমিদার বাড়ির গোমস্থা গঙ্গাধর বর্ম্মনের নাতি শৈলান চন্দ্র বর্মন ও বিজয় চন্দ্র রায় এ কথাগুলো জানান। 

ফুলবাড়ী উপজেলা সদর থেকে পশ্চিম উত্তরকোনে ৭ কিলোমিটা দুরে ক্ষয়িষ্ণু অবয়ব নিয়ে কালের স্বাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে আছে নাওডাঙ্গা জমিদার বাড়ি। জমিদার, জমিদারী শাসন, প্রজা, গোমস্থা বিহীন সেটি এখন অরক্ষিত। বেহাত হয়ে গেছে এখানকার অনেক সম্পদ। সচেতন মহলের দাবী এই জমিদার বাড়ীটি সংস্কার করাসহ সেখানকার সম্পদ উদ্ধারের জন্য সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেন। এটি সংস্কার হলে সঠিক ইতিহাস যেন তাদের ছেলে-মেয়েসহ নতুন প্রজন্ম জানতে পারে। 

এ বিষয়ে নাওডাঙ্গা জমিদার বাড়ীর মহাচর্না সংঘের সভাপতি শুশীল চন্দ্র রায় ও সাধারণ সম্পাদক রতন চন্দ্র বর্মন জানান, আমরা দীর্ঘদনি ধরে পরিচালনা কর্মিটির মাধ্যমে নাওডাঙ্গা জমিদার বাড়ীর পাঁচটি মন্দিরের বিভিন্ন ধরণের পূজা ও উৎসব সারা বছর ব্যাপী পালন করে আসছি। এর মধ্যে সব বড় উৎসব যেটি দোল উৎসব। আমরা হিন্দু-মুসলিম সবাই অত্যান্ত সম্প্রতির সঙ্গে এ উৎসবগুলো পালন করে আসছি। অত্যান্ত দু:খের বিষয় এবং পরিতাপের বিষয় যে এই নাওডাঙ্গা জমিদারবাড়ীর প্রত্নতান্তিক নিদর্শন দিন দিন ক্ষীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। জমিদার বাড়ীটি প্রায় আড়াই,শ বছরের পুরনা ঐতিহ্যবাহী বাড়ীটিসহ এখানকার পূনাতন মন্দিরগুলোর পূর্নূসংস্কারের দাবী জানাচ্ছি। 
এ প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সিব্বির আহমেদ জানান, নাওডাঙ্গা জমিদার বাড়ীটি এই উপজেলার একটি প্রাচীন ঐতিহ্য। এই প্রাচীন ঐতিহ্য ধরে রাখা যেমন খুবই জরুরী। ঠিক তেমনি ভাবে সংরক্ষণ করাটাও জরুরী। বিষয়টি গুরুত্বসহারে উদ্ধর্তন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।
 

95