


বাজেট অতীতের চেয়ে বড় হওয়ায় অনেকে প্রশংসা করছেন; নানান প্রশ্নও রয়েছে অনেকের। কিন্তু বাজেট তো ক্রমাগত বড় হওয়ারই কথা। কেননা, অর্থনীতির আকার বাড়ে, জিডিপি বাড়ে, জনসংখ্যা বাড়ে এবং বিভিন্ন চাহিদাও বাড়তে থাকে। সুতরাং বাজেটের আকার বড় হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো বাজেটের আয়-ব্যয়ের খাতগুলো যথাযথভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে কিনা। তার সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা কতটা, তাও বিবেচনাযোগ্য। সরকার বদলালেও আমাদের দেশে বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে বরাবরই ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা যায়। এবারের বাজেটেও সেই ধারাবাহিকতা রয়েছে। শুধু আকার-আকৃতি নয়; দর্শন ও অগ্রাধিকারের দিক থেকেও ধারাবাহিকতা বিদ্যমান। এমন বাজেটে ব্যয়ের সবচেয়ে বড় খাত হচ্ছে জনপ্রশাসন সরকারের কেন্দ্র থেকে মাঠ পর্যায়ে কর্মীদের বেতন-ভাতাই বাজেটের উল্লেখযোগ্য অংশ খেয়ে ফেলে। এই খাতের ব্যয় এ সরকারও কমাতে পারেনি। তারপর আছে দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধের খাত। সুদ খাত অন্য যে কোনো উৎপাদনশীল খাতের চেয়ে বড় হওয়া আরেকটা উদ্বেগের বিষয়। উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে সরকার বিস্তারিত জানায়নি। এ ব্যাপারে সরকারের উচিত জনগণকে সবিস্তারে জানানো। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপনের পর রংপুরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, বরাবরের মতো দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণে এবারের বাজেটেও সুনির্দিষ্ট কোনো উদ্যোগের প্রতিফলন নেই। তাদের মতে, দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট হলেও শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নদী ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগ অবকাঠামো ও কৃষিভিত্তিক শিল্প উন্নয়নে রংপুরের জন্য বিশেষ কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। এমনকি উন্নয়ন বরাদ্দের তালিকায় রংপুর সিটি করপোরেশনের নামও উল্লেখ করা হয়নি। রংপুর অঞ্চল এখনও মূলত কৃষিনির্ভর। আলু, ধান ও অন্যান্য কৃষিপণ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকলেও এসব পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। দীর্ঘদিন ধরে কৃষিভিত্তিক শিল্প, কোল্ড স্টোরেজ ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার দাবি জানানো হলেও এবারের বাজেটেও সে বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট ঘোষণা নেই।
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন রংপুর জেলা সভাপতি অধ্যক্ষ ফখরুল আনাম বেঞ্জু অভিযোগ করেন, ‘উত্তরবঙ্গকে কৃষি হাব হিসেবে গড়ে তুলতে ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব থাকলেও রংপুরের জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু নেই। বিশেষ করে রংপুরের জনপ্রিয় ‘হাড়িভাঙা’ আমের জন্য আধুনিক হিমাগার তৈরির দাবিটি এবারও পূরণ হয়নি। এছাড়া তিস্তার ভাঙন, কর্মসংস্থানের সংকট এবং শিল্পহীনতার ভার বয়ে চলা রংপুরবাসী এবারের বাজেটেও কোনো স্বস্তির বার্তা পায়নি। তিনি বলেন, মাথাপিছু উন্নয়ন বরাদ্দের দিক থেকে দেশের অন্যান্য বিভাগের চেয়ে অনেক পিছিয়ে রংপুর। আমরা আশা করেছিলাম, এ বৈষম্য দূর করতে সরকার এবার বিশেষ কোনো প্যাকেজ দেবে। কিন্তু বাজেট ঘোষণার পর দেখা গেল, আমাদের মৌলিক দাবিগুলো উপেক্ষিত রয়েছে। বছরের পর বছর বন্ধ থাকা এ অঞ্চলের ৪টি চিনিকল পুনরায় সচল করার জন্য কোনো অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়নি। উত্তরাঞ্চলের পরিত্যক্ত ৬টি বিমানবন্দর সচল করার প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাজেটে তার কোনো প্রতিফলন নেই। তিস্তা নদীকে ঘিরে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য নামমাত্র উল্লেখ থাকলেও সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। তিনি আরও বলেন, দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে বড় বড় মেগা প্রকল্প ও অবকাঠামো উন্নয়নের ঘোষণা থাকলেও রংপুরের সড়ক, রেল বা নৌপথের আধুনিকায়নে বড় কোনো প্রকল্পের ঘোষণা নেই। ঢাকা-রংপুর ব্রডগেজ রেলপথ বা চিলমারী বন্দর আধুনিকায়নের মতো দাবিগুলো উপেক্ষিত থেকেছে।
ব্যবসায়ীরা মনে করেন, রংপুর অঞ্চলের দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই প্রস্তাবিত বাজেট চূড়ান্তভাবে পাস হওয়ার আগে উত্তরাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যকে উজ্জীবিত করতে এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে সংশোধনী এনে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া উচিত। ব্যবসায়ী এনামুল হক বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে এখানে নতুন কারখানা হয় না। বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি অবকাঠামো নিয়ে রংপুরের জন্য বিশেষ কিছু না থাকায় নতুন বিনিয়োগকারীরা এখানে আসতে উৎসাহিত হবেন না। আলাদা বরাদ্দের জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি। রংপুর মহানগর দোকান মালিক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক তানবীর হোসেন আশরাফী বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কর সিস্টেমে কিছু পরিবর্তন আনছে। এটা বাস্তবায়ন হলে ভালো হবে। সামগ্রিক অর্থে এবারের বাজেট ভালো বলে মনে হচ্ছে। তবে রংপুরের জন্য আলাদাভাবে সুনির্দিষ্ট বাজেট থাকলে আরও ভালো হতো। আগামীতে এটাও হবে বলে আমরা আশা করছি। রংপুর মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির ভাইস প্রেসিডেন্ট রুবায়েত হোসেন খান বলেন, এবারের বাজেটে কৃষি, প্রযুক্তি, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও মানবসম্পদ উন্নয়নে একটা সুনির্দিষ্ট রূপরেখা আমরা দেখতে পাচ্ছি। ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর যে কর ছাড়ের ঘোষণা এসেছে তা সাধারণ মানুষের জন্য অবশ্যই সময়োপযোগী একটা সিদ্ধান্ত। সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করে এর আগে এমন বাজেট কম হয়েছে। হয়তো এর সুফল আমরা একদিনেই পাবো না। এজন্য কিছুটা সময় আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। রংপুর মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রেসিডেন্ট গোলাম জাকারিয়া পিন্টু বলেন, এবারের বাজেট সরকারের একটা প্রত্যাশার বাজেট। যে প্রত্যাশাটা জনগণ ও সরকারি যেসব প্রতিষ্ঠান আছে তাদের কাছে। এখানে সকলে যদি একসঙ্গে কাজ করা না যায় তাহলে এ বাজেট সফল করা দুঃসাধ্য হবে।
এটা দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য এ বাজেট করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী নিজেও বলেছেন, এ বাজেটের ফলাফল পেতে আগামী চার বছর সময় লাগবে। এ বিষয়টা মাথায় রেখে বাজেটকে বিশ্বাস করে আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এটাই হবে আমাদের মূল লক্ষ্য। আর ছোট ছোট বিষয়গুলো যেমন-নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানো। এখানে এই পণ্যগুলো পর্যবেক্ষণের জন্য সরকারের পাশাপাশি ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সহায়তা নিতে হবে। রংপুরের সচেতন মহলের দাবি, একটি সুষম ও উন্নত বাংলাদেশ গড়তে হলে উত্তরবঙ্গকে উন্নয়নের মূল স্রোতোধারা থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার কোনো সুযোগ নেই। অন্যথায় এই আঞ্চলিক বৈষম্য ভবিষ্যতে বড় ধরনের অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আমরা শুনে থাকি, বিভিন্ন খাতে অনেক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কিন্তু এর পাশাপাশি অনুৎপাদনশীল, অপচয়মূলক, অপ্রয়োজনীয় নির্মাণ ইত্যাদি চলে বিশেষ কিছু মানুষকে সুবিধা দেওয়ার জন্য। এসবের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য জনগণের সামনে বিস্তারিত তুলে ধরা দরকার। বিগত সরকারগুলো এটি কখনও করেনি। এ সরকারের কাছে থেকেও আমরা এ উদ্যোগ এখনও দেখিনি। আমরা বারবার এ দাবি জানিয়েছি। প্রত্যক্ষ করের চেয়ে পরোক্ষ করের অনুপাত আগের চেয়েও বেশি। সরকার কিছু পণ্য-দ্রব্যের দাম কমিয়েছে, যেটা ইতিবাচক। আমাদের এখানে কর বাড়লে পণ্যের দাম বাড়ে। পক্ষান্তরে কর কমলে দাম কমে না। এটা এখানকার নিয়ম। এবার বেশ কিছু জায়গায় কর কমানো হয়েছে। সেই জিনিসগুলোর দাম বাড়েনি, কমেওনি। একটা স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। এই কর কমানোর উদ্যোগটা ভালো। অন্যদিকে, করজাল এতই সম্প্রসারণ করা হয়েছে, যাতে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত ও শ্রমজীবী মানুষের ওপর বোঝাটা বাড়বে। পরোক্ষ করের অনুপাত বেশি হওয়ায় সীমিত কিংবা কম আয়ের মানুষের ওপর চাপটা এখনও বেশি। এখন পর্যন্ত যারা সম্পদশালী বা বিত্তশালী; যাদের ওপর করের ভার বেশি হওয়ার কথা, তাদের ওপর বরং করের পরিমাণ কমিয়েছে।
ফলে করের বিন্যাসের মধ্য দিয়ে বৈষম্য চিহ্নিত করার পথটা তৈরি হয়নি। যাই হোক, বাজেটে অনেক সদিচ্ছা প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তিটা এখনও অভিন্ন থাকার কারণে সদিচ্ছাগুলোর নিছক প্রতীকী মূল্য আছে; সেটাকে বাস্তবায়ন করতে গেলে অর্থনীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। অর্থনীতির নির্ধারক আমলা, ব্যবসায় গোষ্ঠী, বিশ্বব্যাংক, এডিপি এরা অভিন্ন থাকার কারণে আমাদের জনস্বার্থে পরিবর্তনটা আনা যায় না। সরকার যতক্ষণ স্বাধীনভাবে চিন্তা না করতে পারবে; স্বাধীনভাবে সক্ষমতা অর্জন না করবে, ততক্ষণ সদিচ্ছা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। বাজেট বক্তৃতায় নবায়নযোগ্য জ¦ালানি খাতের বিকাশে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। সৌরবিদ্যুতের সরঞ্জাম এতদিন পরে শুল্কমুক্ত করা হয়েছে। এগুলো ভালো।
কিন্তু নীতি, চুক্তি ও সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে বড় আকারে পুরোনো মডেলই পুষ্ট করা হচ্ছে। গত সরকারের সময় জাতীয় সক্ষমতা বিকাশে গুরুত্ব না দিয়ে আমদানিমুখী, বিদেশি ঋণনির্ভর, প্রাণবিনাশী, বিদেশি কোম্পানি নির্দেশিত নীতিমালা দিয়ে বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি খাত পঙ্গু করা হয়েছে। বর্তমান বিএনপি সরকার সেই ধারাতেই চলছে। জাতীয় সক্ষমতা বিকাশের পথে না গিয়ে বিদেশি কোম্পানি নির্দেশিত উৎপাদন অংশীদারি চুক্তি মডেল অনুসরণ করছে। এলএনজি আমদানিতে চুক্তি করে যাচ্ছে। বাজেটের আগেই জ¦ালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করেছে কোনো তথ্য বা যুক্তি না মেনে। মুদ্রাস্ফীতি ও প্রয়োজন বিবেচনায় তা সামান্য হলেও শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কিছু বৃদ্ধি করা হয়েছে। তবে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, ধাপে ধাপে তা আরও বৃদ্ধি করে জিডিপির ৫ শতাংশ করা হবে।
এটা ভালো। তবে অর্থনীতি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারের ওপর ঋণ পরিশোধের যে বিশাল চাপ সৃষ্টি হতে যাচ্ছে, তা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য একটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। এ বিপুল অর্থের জোগান দিতে গিয়ে সরকারকে হয় নতুন ঋণ নিতে হবে, নয়তো উন্নয়ন ব্যয় ও জনকল্যাণমূলক খাতে বরাদ্দ কমাতে হতে পারে। ফলে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে অতিরিক্ত ঋণগ্রহণ বেসরকারি বিনিয়োগকে সংকুচিত করতে পারে এবং মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়াতে পারে। বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও চাপ সৃষ্টি হবে। তাই ঋণ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বৃদ্ধি, রাজস্ব আহরণ সম্প্রসারণ এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সরকারকে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। অন্যথায় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।