


দিনাজপুর-গোবিন্দগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের ঘোড়াঘাট অংশে আশঙ্কাজনক হারে দিন দিন বেড়েই চলেছে সড়ক দুর্ঘটনা। জনবহুল বাজার, গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসংলগ্ন এলাকাগুলোতে প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটলেও তা প্রতিরোধে কার্যকর ও দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, দিনাজপুর-গোবিন্দগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের ঘোড়াঘাট অংশে হরিপাড়া হাট (কানাগাড়ি মোড়), উপজেলার সর্ববৃহৎ রানীগঞ্জ বাজার, গুচ্ছগ্রাম এলাকা, টিএন্ডটি মোড় দীর্ঘদিন ধরেই দুর্ঘটনাপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত। স্থানগুলোতে মোড় ও জনবহুল বাজার হওয়ায় প্রতিনিয়ত হাজার হাজার লোকের সমাগম ঘটে। নিত্য প্রয়োজনীয় কাজে রাস্তা পারাপার হতে হয়। মহাসড়কে অবস্থান হওয়ায় দ্রুত এবং বেপরোয়া গতির যানবাহন চলাচলের ফলে উপজেলার এ অংশেই ঘটে ছোট বড় মিলিয়ে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা।
ঘোড়াঘাট ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অন্তত ১২টি সড়ক দুর্ঘটনার ঘটনায় তারা উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। এসব দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলে ১৭ জন আহত ও ৩ জন নিহত হন। সূত্র আরও জানায়, তাদের কাছে শুধুমাত্র দুর্ঘটনাস্থলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রাপ্ত হতাহতদের তথ্য সংরক্ষিত থাকে। পরবর্তীতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে তা তাদের রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত হয় না।
এদিকে ঘোড়াঘাট থানা সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছরে সড়ক দুর্ঘটনা সংক্রান্ত ৫টি মামলা রুজু হয়েছে।”
তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহলের দাবি, প্রকৃতপক্ষে চলতি বছরে ছোট-বড় মিলিয়ে অন্তত ৩০টিরও বেশি দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে। অনেক দুর্ঘটনায় আহতদের স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয় বা পক্ষগুলোর মধ্যে আপস-মীমাংসা হওয়ায় সেগুলোর কোনো আনুষ্ঠানিক রেকর্ড তৈরি হয় না। ফলে প্রকৃত দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি বলে মনে করছেন তারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অধিকাংশ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় গতিনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, জেব্রা ক্রসিং, সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড কিংবা পথচারীদের জন্য নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা নেই। অনেক স্থানে অবৈধভাবে মহাসড়কের পাশে দোকানপাট ও যানবাহন দাঁড় করিয়ে রাখার কারণে চালকদের দৃষ্টিসীমা সংকুচিত হয়ে পড়ে, যা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। স্থানীয়রা বলছেন, দুর্ঘটনা কমাতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে রাম্বল স্ট্রিপ, গতিনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, সড়ক বিভাজক, জেব্রা ক্রসিং, পর্যাপ্ত সাইনবোর্ড ও স্ট্রিটলাইট স্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি অবৈধ পার্কিং নিয়ন্ত্রণ, বাজারসংলগ্ন এলাকায় নির্ধারিত গতিসীমা বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত ট্রাফিক নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন। দুর্ঘটনা ঘটার পর কেবল শোক প্রকাশ বা সাময়িক তৎপরতা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণই পারে প্রাণহানি ও দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে।
১নং বুলাকিপুর (হরিপাড়া হাট) ইউনিয়ন পরিষদে সেবা নিতে আসা পার্বতীপুর গ্রামের জিয়াউল হক বলেন, যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত ঝুঁকিতে চলাচল করছেন। রানীগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী আব্দুল আলিম বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে বাজার এলাকায় স্পিডব্রেকার, সাইনবোর্ড ও স্থায়ী ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জরুরি। গুচ্ছগ্রাম এলাকার রনি কুমার মোহন্ত জানান, সড়কে দ্রুতগতির যানবাহন চলাচলের কারণে প্রতিনিয়ত শিশু ও বৃদ্ধদের সড়ক পারাপারে সবসময় আতঙ্কে থাকতে হয়।
এ বিষয়ে সওজ দিনাজপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী আসাদুজ্জামানের সাথে মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ঘোড়াঘাট অংশের কয়েকটি স্থানকে দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে কোথায় কী ধরনের নিরাপত্তা অবকাঠামো প্রয়োজন, তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে জনবহুল রানীগঞ্জ বাজার এলাকা ও মোড়গুলোতে আরও কি ধরনের নিরাপত্তামূলক অবকাঠামো স্থাপন করলে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের পরিকল্পনা চলছে।”
বিষয়টি নিয়ে ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল আল মামুন কাওসার শেখ বলেন, “সড়ক দুর্ঘটনা একটি জাতীয় সমস্যা। আমরা উপজেলা প্রশাসন, সড়ক বিভাগ, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিবো। পাশাপাশি মহাসড়কের দুই পাশে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও অটো রিক্সা-ভ্যান যাতে দাঁড় করাইতে না পারে সে বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।”