1. [email protected] : Md Hozrot Ali : Md Hozrot Ali
  2. [email protected] : Sokaler Bani : Iqbal Sumon
  3. [email protected] : Md Hozrot Ali : Md Hozrot Ali
চালের দামে ‘চালাকি’ নয় | দৈনিক সকালের বাণী
বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬, ০২:৩৫ পূর্বাহ্ন

চালের দামে ‘চালাকি’ নয়

স্বপন চৌধুরী
  • আপলোডের সময় : মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২৬
  • ২৪ জন দেখেছেন

বিশ্বের শীর্ষ চাল রপ্তানিকারক দেশ ভারতে অনাবৃষ্টির কারণে নতুন মৌসুমের চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে চলতি সপ্তাহে চালের রপ্তানি মূল্য কিছুটা বেড়েছে। বাজারে ভারতের ৫ শতাংশ ভাঙা সেদ্ধ চাল বিক্রি হয়েছে প্রতি টন ৩৪০-৩৪৫ ডলারে, যা আগের সপ্তাহে ছিল ৩৩৭-৩৪২ ডলার। অন্যদিকে দেশটির ৫ শতাংশ ভাঙা আতপ চালের দাম দাঁড়িয়েছে প্রতি টন ৩৪৭-৩৫২ ডলারে। নয়াদিল্লির ব্যবসায়ীরা জানান, জুনে বৃষ্টিপাতের ঘাটতি থাকায় ধান রোপণের গতি স্বাভাবিকের চেয়ে ধীর ছিল। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত ২৫ জুন পর্যন্ত কৃষকরা ২৫ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর জমিতে গ্রীষ্মকালীন ধান রোপণ করেছেন। এ পরিমাণ গত বছরের একই সময়ের ৩৪ লাখ ৪০ হাজার হেক্টরের চেয়ে বেশ কম। তবে চলতি মাসে মৌসুমি বৃষ্টি বাড়ায় চাষাবাদের গতি ফিরবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শুধু ভারত নয়, এশিয়ায় প্রধান চাল উৎপাদনকারী দেশগুলোয় বাড়তে শুরু করেছে চালের দাম। প্রতিকূল আবহাওয়া ও বাড়তি চাহিদার কারণে দামের এ ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ভারত, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ায় চালের রপ্তানি মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি জাপানেও এ প্রধান খাদ্যশস্যটির উৎপাদন কমবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে মার্কিন কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ)। এদিকে, ভিয়েতনামেও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে চালের দাম। দেশটিতে ৫ শতাংশ ভাঙা চালের দাম প্রতি টন ৪৪৫-৪৫০ ডলারে উঠেছে, যা আগের সপ্তাহেও ৪১০-৪১৫ ডলার ছিল। হো চি মিন সিটির ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, স্থানীয় বাজারে চাল সরবরাহ কম। তবে থাইল্যান্ডের তুলনায় দাম কিছুটা সাশ্রয়ী হওয়ায় ভিয়েতনামের চালের চাহিদা বাজারে বেশ ভালো। পাশাপাশি দুর্যোগপূর্ণ মৌসুমের আগে ফিলিপাইন চালের আমদানি বাড়াতে পারে বলে শোনা যাচ্ছে। চলতি বছরের প্রথমার্ধে ভিয়েতনামের চাল রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ৯ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ৫২ লাখ টনে পৌঁছেছে।

অন্যদিকে, ক্রেতার অভাবে থাইল্যান্ডের ৫ শতাংশ ভাঙা চালের দাম কমে প্রতি টন ৪৬৫ ডলারে নেমেছে, যা আগের সপ্তাহে ৪৮০-৫০০ ডলার ছিল। ব্যাংককের ব্যবসায়ীরা জানান, ফিলিপাইন নিজস্ব উৎপাদন পরিস্থিতি মূল্যায়নে সাময়িকভাবে কেনাকাটা কমিয়েছে। তবে এল নিনোর প্রভাবে বছরের শেষের দিকে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা করা হচ্ছে। আঞ্চলিক এ পরিস্থিতির মধ্যেই বাংলাদেশ সরকার বেসরকারি ব্যবসায়ীদের আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৩৭ হাজার টন সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমতি দিয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে ১০-২০ লাখ টন সুগন্ধি চাল উৎপাদন হয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ইন্দোনেশিয়ায় সরকারি গুদামে রেকর্ড পরিমাণ চালের মজুদ থাকা সত্ত্বেও টানা ছয় মাস ধরে দাম বাড়ছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় লজিস্টিক সংস্থা বুলগ জানিয়েছে, জুনের শেষ নাগাদ তাদের চালের মজুদ দাঁড়িয়েছে ৫৪ লাখ টনে, যা গত বছরের শেষের তুলনায় ৬৬ শতাংশ বেশি। এ বিপুল মজুদের পরও জানুয়ারি-জুন পর্যন্ত খুচরা পর্যায়ে চালের দাম প্রায় ২ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। পাশাপাশি পাইকারি ও মিল পর্যায়েও দাম ঊর্ধ্বমুখী। এল নিনো ও খরা থেকে ফসল বাঁচাতে ইন্দোনেশিয়া সরকার কৃষকদের আগাম ধান চাষের তাগিদ দিচ্ছে। এছাড়া জাপানে ২০২৬-২৭ বিপণন বর্ষে চাল উৎপাদন ১ দশমিক ৫ শতাংশ কমে ৭৩ লাখ ৮০ হাজার টনে নামতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে মার্কিন কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ)। মূলত বয়োবৃদ্ধ কৃষকদের অবসর নেওয়া এবং গম ও বার্লির মতো বিকল্প ফসলের দিকে ঝুঁকে পড়ায় দেশটিতে চাল উৎপাদন ও চাষের জমি কমছে। জাপানে চালের ব্যবহার বেশি হলেও জনসংখ্যা কমে যাওয়া এবং বয়োবৃদ্ধির কারণে ছয় দশকে খাদ্যতালিকায় চালের চাহিদা অনেকটাই কমে এসেছে।

কৃষি প্রধান আমাদের বাংলাদেশ। বিশেষ করে উদ্বৃত্ত এলাকা রংপুর অঞ্চল থেকে খাদ্যশস্য বিভিন্ন জেলায় রপ্তানি হয়ে থাকে। কিন্তু ধানের সেই এলাকাতেও ফের চালের দাম বেড়েছে। জাতীয় একটি দৈনিকে ‘চালের দামে নাভিশ্বাস’ শিরোনামে মঙ্গলবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, মান ও প্রকারভেদে পণ্যটির দাম বেড়েছে প্রতি বস্তায় (৫০ কেজি) ২০০ থেকে ৫০০ টাকা। খুচরায় কেজিতে বেড়েছে ৫ থেকে ৭ টাকা। এতে মহাবিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষজন। মাসখানেক আগে বোরো ধানের কাটামাড়াই শেষ হয়েছে। বর্তমানে কৃষকের মাঠে ধান নেই, হাটেও মিলছেনা। ধান কিনে মজুদের পাহাড় গড়ছে আটোরাইস মিল মালিক এবং বড় বড় ব্যবসায়ীরা। এছাড়া বেশি দামের আশায় অনেক বড় কৃষক ধান বিক্রি না করে গোলায় তুলে রেখেছেন। ফলে চালের দামে লাগাম টানা যাচ্ছেনা। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, অটো রাইসমিল ও বড় বড় ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট মজুদ করায় চালের মূল্য বৃদ্ধি হয়েছে।
সিটি বাজার, সিও বাজার, ধাপ বাজারসহ রংপুরের কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা যায়, স্বর্ণা ও ব্রিধান-২৯ জাতের মোটা চালের প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকায় (এক সপ্তাহ আগেও যার দাম ছিল ৫৫ থেকে ৫৬ টাকা)। আর মাঝারি মানের চালের (ব্রি-২৮) দাম ৬২ টাকার স্থলে ৬৫ টাকা নেওয়া হচ্ছে। এর চেয়েও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে ভালো মানের চিকন চাল (নাজিরশাইল, জিরাশাইল ও মিনিকেট)। যা প্রতিকেজি ৬৮ টাকার স্থলে দাম বাড়িয়ে নেওয়া হচ্ছে ৭৫ টাকা। সাধারণ মানুষের ভরসা নিম্নমানের মোটা চালও এখন ৬০ টাকা কেজির নিচে কোন বাজারেই মিলছে না। সিটি বাজারে চাল কিনতে আসা রিকশাচালক লোকমান হোসেন জানান, বাবা-মা সন্তানসহ সাতজনের সংসারে প্রতিদিন গড়ে তিন কেজি চাল প্রয়োজন হয়। এজন্য ১৮০ টাকা জোগাড় করতে খুবই কষ্ট হয় তার।

চালের বাজার ফের অস্থির হওয়ায় এ অঞ্চলের অধিকাংশ প্রান্তিক মানুষ চাপে রয়েছেন। শ্রমজীবী আবুল কালাম বললেন, ‘আমাদের আয় বাড়েনি অথচ চালের দাম বেড়েছে। মোটা চালের কেজি ৬০ টাকায় উঠেছে। সংসারে কম খেয়েও আমাদের মত নিম্নআয়ের মানুষের চলা অসম্ভব হয়ে উঠেছে।’ খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, মুষ্টিমেয় কয়েকটি অটোরাইস মিল মালিক ও মজুদদারদের ইচ্ছেমতো দাম নির্ধারণের কারণে সব ধরনের চালের দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে সরকারের নিয়ন্ত্রণ সংস্থার প্রতিও অভিযোগ রয়েছে তাদের। সিটি বাজারস্থ চালের দোকানদার আজগর আলী বললেন, আমরা বেশি দামে কিনি বলেই বেশি দামে বিক্রি করতে হয়। তবে স্থানীয় মিল মালিক ও আড়তদাররা বলছেন, কৃষকরা ধান চাষ করলেও তার সিংহভাগই চলে যাচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলের ব্যবসায়ীদের কাছে। তাদের বড় মোকামে সব ধরনের চালের দাম বেড়ে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে রংপুরের বাজারেও। মাহিগঞ্জ এলাকার চালের আড়তদার মাসুম মিয়াসহ কয়েকজন জানান, বোরো ধানের কাটামাড়াই শেষ হতে না হতেই আটো রাইসমিল মালিকরা ধান কিনে মজুদ করে রেখেছে। এছাড়া সরকারিভাবে ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান চলায় বাজারে কিছুটা কৃত্রিম সংকট দেখা দিয়েছে। সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে চালের বাজার স্থিতিশীল হবে না বলেও জানান তারা।

কৃষকরা জানান, সংসারের খরচসহ ধান উৎপাদনে নেওয়া ঋণ পরিশোধ ও পরবর্তী ফসল চাষের যোগান দিতে ধান কেটেই বিক্রি করতে বাধ্য হতে হয়। সারা বছরের জন্য ধান সংরক্ষণের কোনো সুযোগ থাকেনা। এতে আগেই ধান বিক্রিতে যেমন ভালো দাম মেলেনা, তেমনি বেশি দামে চাল কিনে খেতে হয়। রংপুরের মিঠাপুকর উপজেলার বলদিপুকুর এলাকার কৃষক আলী হোসেন, ‘প্রয়োজনের তাগিদে কাটার পরই ধান বিক্রি করতে হয়। এছাড়া ঘরে তোলা ধান সিদ্ধ-শুকাতে শ্রমিক ও জ¦ালানির পাশাপাশি মিলে তা ভেঙে চাল করতে খরচ বেশি হওয়ায় ঝক্কি নিতে চাননা কেউ।’ তবে বাজার থেকে বেশি দামে চাল কিনতে হিমসিম খেতে হয় বলেও জানান তিনি।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে রংপুরের একজন রাইস মিল মালিক বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি জানান, নানা সংকটে কৃষকদের ধান কেটেই বিক্রি করতে হয়। আর এই সুযোগটি নেন বড় মিল মালিকরা। মৌসুমের শুরুতেই কম দামে ধান কিনে তারা মজুদ করেন। তবে সুযোগ গ্রহণে দক্ষিণাঞ্চলের বড় ব্যবসায়ীদের নিয়োগকৃত লোকজন এই অঞ্চলের কৃষকদের ধান কিনে নেন। মজুদের বড় অংশ তাদের কাছে থাকায় বাজার নিয়ন্ত্রন করেন তারা। কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২৮ লাখ মেট্রিকটন চাহিদার বিপরীতে চলতি মৌসুমে রংপুর বিভাগে প্রায় ৫৫ লাখ মেট্রিকটন ধান উৎপাদন হয়েছে। তার পরও বৃদ্ধি পেয়েছে চালের দাম।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক সকালের বাণী
Theme Designed BY Kh Raad ( Frilix Group )