
রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার তিস্তাপাড়ের মানুষের জীবন যেন বছরের পর বছর নদীভাঙন, বন্যা, জলাবদ্ধতা ও শুষ্ক মৌসুমের পানিসংকটের সঙ্গে এক নিরন্তর সংগ্রামের নাম। প্রতিবছর বর্ষা এলেই তিস্তার ভাঙনে বসতভিটা, ফসলি জমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গ্রামীণ সড়ক নদীগর্ভে বিলীন হয়। আবার শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় সেচ সংকটে পড়েন কৃষকরা। ফলে বছরের পর বছর একই দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে জীবন কাটাচ্ছেন তিস্তা তীরবর্তী হাজারো মানুষ।
এমন বাস্তবতায় জাতীয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যেকোনো মূল্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে—প্রধানমন্ত্রীর এমন ঘোষণায় নতুন করে আশার আলো দেখছেন কাউনিয়ার মানুষ। তাদের বিশ্বাস, দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নদীভাঙন, বন্যা, জলাবদ্ধতা ও পানিসংকটের স্থায়ী সমাধানের পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলের কৃষি, যোগাযোগ ও অর্থনীতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
স্থানীয়রা জানান, স্থায়ী নদীশাসন ও কার্যকর পানি ব্যবস্থাপনার অভাবে প্রতিবছর একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি ঘটছে। অনেক পরিবার একাধিকবার বসতভিটা হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় ফসলের ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত ফলন মিলছে না।
কাউনিয়া উপজেলার চর ঢুষমারা গ্রামের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, “তিস্তার ভাঙন বহুবার দেখেছি। কিন্তু এবারের মতো ভয়াবহ ভাঙন আগে দেখিনি। মাত্র এক সপ্তাহেই ২০টির বেশি পরিবার তাদের বসতভিটা হারিয়েছে। তারা এখন খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছে।”
ভাঙনে সর্বস্ব হারানো বাদশা মিয়া বলেন, “বন্যার পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়েছে। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পুরো চর ঢুষমারা মানচিত্র থেকেই হারিয়ে যাবে।”
ক্ষতিগ্রস্ত জয়নাল আবেদীন বলেন, “আমরা ত্রাণ চাই না। চাই স্থায়ীভাবে নদীভাঙন রোধের ব্যবস্থা এবং দ্রুত তিস্তা মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়ন।”
স্থানীয় বাসিন্দা আবেদ আলী বলেন, “নির্বাচনের আগে সবাই নদীভাঙন রোধের প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু নির্বাচনের পর আর কেউ খোঁজ নেন না। দ্রুত নদীশাসনের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্তমানে শুধু বসতভিটাই নয়, ফসলি জমি, গ্রামীণ সড়ক, মাঠ ও ঘাটও নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। এতে নদীতীরবর্তী মানুষের দুর্ভোগ দিন দিন বেড়েই চলেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে নদীশাসনের মাধ্যমে ভাঙন নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক বন্যা ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা নিরসন, নদীর নাব্যতা সংরক্ষণ এবং সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ সম্ভব হবে। একই সঙ্গে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, মৎস্যসম্পদ উন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
এ বিষয়ে কাউনিয়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সফিকুল ইসলাম সফি বলেন, “তিস্তা মহাপরিকল্পনা উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি। এটি কোনো দলীয় বিষয় নয়, বরং লাখো মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িত একটি জাতীয় প্রকল্প। প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ঘোষণা আমাদের আশাবাদী করেছে। আমরা চাই, ঘোষণাটি দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে তিস্তাপাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের স্থায়ী সমাধান হোক। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নদীভাঙন, বন্যা ও জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কৃষি, সেচ, মৎস্য, যোগাযোগ এবং উত্তরাঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।”
এর আগে কাউনিয়ার তিস্তা রেলসেতু এলাকায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে বৃহৎ সমাবেশ ও গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে তিস্তাপাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ তুলে ধরে দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নের জোর দাবি জানানো হয়। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে স্থায়ী সমাধানের আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় রয়েছেন স্থানীয়রা।
এদিকে কাউনিয়াসহ সমগ্র তিস্তা অববাহিকার মানুষের একটাই প্রত্যাশা—প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার দ্রুত বাস্তবায়ন। তাদের বিশ্বাস, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা ও পানিসংকটের স্থায়ী সমাধানের পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য একটি নিরাপদ, টেকসই ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হবে।
Related