
আগের মতো গরু নয়। তেলের ঘানি টানছে ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান অটোরিকশা। মানুষ ছাড়াই অনবরত ঘুরছে অটোরিকশাটি। ঘোরাচ্ছে ঘানি। সরিষার দানা পিষে তেল-খৈল বের হচ্ছে। ফলে কমেছে ঝুক্কি আর ব্যয়। বেড়েছে উৎপাদন-মুনাফা। এমন দৃশ্যটি দেখা গেছে, কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের আরাজী নেওয়াশী গ্রামে। ওই গ্রামের কৃষক মুকুল মিয়ার বাবা দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে গরু দিয়ে তেলের ঘানি টেনে আসছেন।
বাবার পেশা এখন ছেলে মুকুল মিয়া ধরে রেখেছেন। তিনি গত দুইদিন তিন বছর আগে ইউটিউবে দেখতে পান অটোরিকশা দিয়ে ঘানি টাকার নতুন কৌশল। পরে নতুন কৌশল অবলম্বন করে গরুর বদলে সরিষা তেলের ঘানি টানছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। গরুর চেয়ে এই পদ্ধতি দিয়ে ঘানি টানা অতি সাশ্রয়ী। অল্প সময়ে তেল মাড়াইয়ের কাজ সম্পূর্ণ হয় বলে জানান তেল ব্যবসায়ী মুকুল মিয়া। মুকুল মিয়ার অভিনব পদ্ধতির মাধ্যমে ঘানি টানার দৃশ্যটি স্থানীয়দের নজর কেড়েছে।
মুকুল মিয়া জানান, ঘানি দিয়ে মাড়াই করা সরিষার তেল বিক্রির পেশা বংশপরম্পরায় করে আসছেন। ইউটিউবে অটোরিকশা দিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘানি টানার বিষয়টি মাথায় আসে। কিন্তু ঘানি টানার গরু পালনের ঝক্কি-ব্যয় আর সীমিত পরিমাণ উৎপাদনের কারণে কোনো রকমে চালতো ব্যবসা। ঘানি ঘোরানোর জন্য অটোরিকশাটি তৈরি করে দেওয়ায় পাল্টে গেছে আগেকার চালচিত্র। উৎপাদন বেড়েছে। লাভ বেড়েছে। তবে সরিষার দাম বাড়ায় বর্তমানে লাভ কিছুটা কম। তিনি আরও জানান, এখন প্রতিদিন ১৫ কেজি সরিষা মাড়াই করা হচ্ছে। সরিষার দাম, একজন মজুরের মজুরি, ব্যাটারি চার্জ ও অন্যান্য খরচ বাদ দিলে তেল-খৈল মিলিয়ে মুনাফা থাকছে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা।
খড়িবাড়ী বাজারের সন্তোষ চন্দ্র রায় বলেন, মুকুলের ঘানিতে মাড়াইকৃত তেল ও খৈল খুবই ভালো মানের। এই উদ্যোগ এলাকার অনেক মানুষের নজর কেড়েছে। তেল পুড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও নেই এবং ঘানিতে ভেজাল কেমিক্যাল মেশানোর কোন সুযোগ নেই। স্থানীয় আমির হোসেন ও জ্যোতিশ চন্দ্র রায় জানান, অটোরিকশা দিয়ে তেলের ঘানি টানা নতুন পদ্ধতিটি খুবই ভালো উদ্যোগ। এই ঘানির উৎপাদিত তেলের মান আগের মতোই আছে। এ ছাড়া স্বাদ, গন্ধ, ঝাঁজ সব একই রকম।
এ প্রসঙ্গে সাইফুর রহমান সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম জানান, যুগ যুগ ধরে দেখে আসছি, তেলের ঘানি টানতে ব্যবহার হয় গরু। এখন সব কিছুই বদলে গেছে। কেউ ঘোড়া নিয়ে ঘানি টানছে, আবার কেউ দেখছি, গরু, ঘোড়া কেনার সামর্থ্য নেই কিন্তু তারা নিজেই কাঠের জোওয়াল ঘাড়ে নিয়ে ঘানি টানছেন। আমরা এরকম দৃশ্য পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে দেখেছি। তবে অটোরিকশা দিয়ে নতুন উদ্ভাবন স্থানীয়দের নজর কেড়েছে। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব এই নতুন পদ্ধতি স্থানীয় কৃষি ও উদ্যোক্তাদের অনুপ্রেরণা জোগাবে।
Related