


ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের সময়ে নানা অজুহাতে আটকে ছিল তিস্তা মহা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ। সম্প্রতি ‘তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনথ নামে একটি সংগঠন তিস্তা মহা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। আর এই সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিএনপিথর সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ আসাদুল হাবীব দুলুসহ কুড়িগ্রাম-লালমনিরহাট জেলার বিএনপির নেতৃবৃন্দ। ফলে আবারও স্বপ্নে বিভোর তিস্তা পারের হাজারো ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ। আগামী ১৭ ও ১৮ ফেব্রুয়ারি দুইদিন ব্যাপী কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারী জেলার তিস্তা নদী অববাহিকার ১০টি স্থানে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। কর্মসূচি উদ্বোধন করবেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সমাপণি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখবেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলে জানা গেছে।
কর্মসূচি ঘিরে তিস্তা পারের মানুষের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপণার সৃষ্টি হয়েছে। তিস্তা পারের মানুষের আশা তিস্তা নদী রক্ষায় তিস্তার ন্যায্য হিস্যা বাস্তবায়ন হবে মহাপরিকল্পনায়। ভরা বর্ষা মৌসুমের আর ভাঙনের মুখে পরে বসতভিটাসহ আবাদি জমি হারাতে হবে না। দুঃখ ঘুচবে তিস্তা পারের হাজারো মানুষের। সব কিছু হারিয়ে নিঃস্ব হওয়া মানুষজন ফিরে পাবে তাদের পৈত্রিক ভিটেমাটি। আবারও মুখে হাসি ফুটবে সর্বশান্ত হওয়া মানুষগুলোর।এ দিকে রবিবার (৯ফেব্রুয়ারি) রংপুরের কাউনিয়ায় তিস্তা রেলব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় ‘তিস্তা নিয়ে করণীয় শীর্ষক গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান তিস্তা নদীর দুই পাড়ে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার ভাঙন কবলিত এলাকার ২০ কিলোমিটার এলাকায় ভাঙনরোধের কাজ আগামী মার্চের মধ্যে শুরু হবে বলে ঘোষণা দেন।
এরআগে গত ২৫ জানুয়ারি (শনিবার) তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষে ‘জাগো বাহে তিস্তা বাঁচাইথ এই স্লোগানে কুড়িগ্রামের রাজারহাটে মীর ইসমাইল হোসেন সরকারি কলেজ মাঠে সমাবেশ করে তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলন কমিটির জেলা শাখা। এ সময় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক ও বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির রংপুর বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু। তিস্তা নদীর ডান তীরে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তারাপুর ইউনিয়নের চর লাটশালা ও চর খোর্দা এলাকায় দরবেশখ্যাত সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপ গড়ে তোলেন সোলার প্রকল্প। পাশেই গড়ে আরেকটি বিনোদন কেন্দ্র আলীবাবা থিম পার্ক।
তিস্তা পারের বাসিন্দাদের অভিযোগ ২০১৭ সালে আবাদি জমির ওপর সালমান এফ রহমানের সোলার প্যানেলটা গড়ে ওঠার কারণে নদীর গতিপথ পরিবর্তন করা হয়। এর প্রতিবাদে মিটিং-মিছিল মানববন্ধন করেও কাজ হয়নি। বরং উল্টো মামলার ভয় দেখিয়ে দমিয়ে রাখা হয়। ফলে রাজারহাট-উলিপুর উপজেলার কয়েকটি গ্রাম প্রতি বছর ভাঙনের কবলে পড়ে। কথা হয় উলিপুর উপজেলার থেতরাই ইউনিয়নের হোকডাঙা গ্রামের বৃদ্ধ মোজাফফর আলীর (৭৬) সঙ্গে। তিনি জানান, ‘এক সময় হালগিরস্ত সব ছিল। চারবার নদী ভাঙনের শিকার হয়েছি। বসতভিটাসহ ছয় একর আবাদি জমি ছিল। সেসবের এখন কিছুই নেই।
রাজারহাট ঘড়িয়ালডাঙা ইউনিয়নের চর খিতাবখাঁ গ্রামের জালাল (৬২) উদ্দিন বলেন, ‘তিস্তা নদীর গতিবিধি বোঝা বড়ই মুশকিল। পানি বাড়লেও ভাঙে, কমলেও ভাঙে। ভাঙতে ভাঙতে আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে। এখন দিনমজুরি করে খাই। আমরা বুক ভরা আসা নিয়ে আছি তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তাবায়ন হলে এই দুঃখ ঘুচে যাবে।
উলিপুর থেতরাই ইউনিয়নের গোড়াইপিয়ার এলাকার তিস্তা নদীর চরে কথা হয়, ভাঙন কবলিত ভিটেমাটি হারা মজিবর রহমানের(৬০) সঙ্গে। তিস্তার বুকে জেগে ওঠা এক টুকরো জমিতে কাজ করে গোধুলী লগ্নে ফিরছিলেন বাড়িতে। প্রশ্ন করতেই হাত দিয়ে দেখিয়ে দেন, ওই এলাকায় তার বাড়ি ছিল। তিন বার তার ঘরবাড়ি তিস্তা নদীর ভাঙনের শিকার হয়েছে। চর জেগে ওঠায় সেই জমিতে সবজি চাষ করেছেন। পরিচর্যা শেষে ফিরছেন।
একটু দূরে গিয়ে দেখা হয় শামছুল হক (৪৫)নামের আর কৃষকের সঙ্গে। তিনি তার শিশু সন্তানকে নিয়ে চরে স্যালো মেশিন চালিয়ে সদ্য রোপন করা বাদাম ক্ষেতে সেচ দিচ্ছেন। এ সময় তিনি বলেন, চরে জেগে ওঠা এটুকু জমিই এখন সম্বল। তিস্তার ভাঙনে সব কিছু হারিয়ে তিনিও এখন নিঃস্ব।
কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির এক নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, প্রতিবছর তিস্তা নদীর ভাঙনের কবলে পড়ে এ অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ তাদের ভিটেমাটি হারিয়ে সর্বশান্ত হয়ে গেছেন। ২০১৬ সাল থেকে দীর্ঘ ৯ বছর ধরে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার তিস্তা পরিকল্পনার নামে এ এলাকার মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিল। তিস্তা একটি অতি পুরনো নদী, আমাদের একটাই দাবি তিস্তার ন্যায্য হিস্যা হোক। এই দাবির লক্ষ্যে জনগনকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের আন্দোলন-সংগ্রাম অব্যাহত রয়েছে। সেই সঙ্গে নদী ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দাবি জানাচ্ছি।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিবার্হী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, রাজারহাট উপজেলার ঘড়িয়ালডাঙা ইউনিয়নের চর খিতাবখাঁ থেকে চিলমারী উপজেলার হরিপুর এলাকা পর্যন্ত তিস্তা নদীর ভাঙনের ঝুঁকির মুখে থাকা সাড়ে ৬ কিলোমিটার এলাকা প্রাক্কলন তৈরি করে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। অনুমোদনের পর জরুরি ভিত্তিতে এসব এলাকায় ভাঙন রোধে কাজ শুরু হবে।