


ভারতের হঠাৎ করে আরোপিত আমদানি নিষেধাজ্ঞার কারণে লালমনিরহাটের বুড়িমারী স্থলবন্দরে খাদ্যপণ্যবাহী ২০টি ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান আটকা পড়েছে। এরমধ্যে ১০টি খালি ট্রাকও রয়েছে। যেগুলো ভারতের শিলিগুড়িতে প্রবেশের অপেক্ষায় ছিল।
গত রোববার (১৮ মে) সকালে এসব যানবাহন বুড়িমারী সীমান্ত পার হয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি যাওয়ার কথা থাকলেও ভারতীয় কাস্টমস সেগুলো গ্রহণ করেনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শনিবার বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক (আরএমজি) ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যসামগ্রীসহ কিছু পণ্য স্থলবন্দর দিয়ে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ভারত। দেশটির বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের বৈদেশিক বাণিজ্য অধিদপ্তর (ডিজিএফটি) এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা জারি করেছে। বাংলাদেশ সমুদ্রবন্দর ও স্থলবন্দর দিয়ে ভারতীয় তুলা আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর এ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করল ভারত।
এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নির্দিষ্ট কিছু পণ্যে ভারতের স্থলবন্দর দিয়ে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলো। এর পরিপ্রেক্ষিতে কোনো স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে না। কেবল নাভা শেভা ও কলকাতা সমুদ্রবন্দর দিয়েই প্রবেশের অনুমতি থাকবে। এ নিষেধাজ্ঞা ভারতের মধ্য দিয়ে পরিবহনকারী বাংলাদেশি পণ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না, যা নেপাল ও ভুটানের উদ্দেশে পাঠানো হবে। এ নির্দেশনা কার্যকর করা হয়েছে।
ফলের স্বাদযুক্ত ও কার্বনেটেড পানীয়, প্রক্রিয়াজাত খাদ্যসামগ্রী, তুলা ও সুতির সুতার বর্জ্য, প্লাস্টিক ও পিভিসি তৈরিপণ্য, নিজস্ব শিল্পের জন্য ইনপুট হিসেবে ব্যবহৃত রঙিন পদার্থ, রং, প্লাস্টিসাইজার, কাঠের আসবাবপত্র ও অন্যান্য পণ্য আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিজোরামের কোনো স্থল কাস্টমস স্টেশন (এলসিএস)/ ইন্টিগ্রেটেড চেকপোস্ট (আইসিপি) এবং পশ্চিমবঙ্গের (এলসিএস) চ্যাংড়াবান্ধা ও ফুলবাড়ি দিয়ে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে না।
তবে বাংলাদেশ থেকে মাছ, এলপিজি, ভোজ্যতেল ও চূর্ণী পাথর প্রবেশের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার; স্থলপথে বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি ও রফতানি হয়। খাদ্যশস্য (চাল, ডাল, তেল) ও শিল্প কাঁচামালের (কেমিক্যাল, ইস্পাত, সিঙ্ক) অধিকাংশই ভারত থেকে আসে। পথ ও নিকাশন মূলভাবে চট্টগ্রাম–কলকাতা, সিলেট–শিলিগুড়ি ও বেনাপোল–বদিদ্দা পোর্টস দিয়ে বন্দরপথে সরবরাহ হয়। আকাশপথে আমদানি কম, এবং সামুদ্রিক পথ অপেক্ষাকৃত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ।
ভারতে খাদ্যদ্রব্যের রপ্তানিকারকের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মেসার্স ট্রেড সিন্ডিকেটের স্বত্বাধিকারী রেকায়েত হোসেন লাবু বলেন, ভারতীয় নিষেধাজ্ঞায় বুড়িমারী স্থলবন্দরে ফলের জুস, বিস্কুট ও নুডলসের ১৩টি গাড়ি আটকে আছে। অন্যান্য রপ্তানি পণ্যের গাড়িও এ বন্দরে আটকে আছে। গাড়িগুলো পাঠানো সম্ভব না হওয়ায় রপ্তানিকারক ও ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
বুড়িমারী স্থলবন্দরের ব্যবসায়ী আবু সুফিয়ান বলেন, একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রায় সব পণ্যই বন্ধ করে দিয়েছে ভারত। প্রাণ, আরএফএল, হাশিম ফুডসহ অনেক বড় কোম্পানির পণ্য এতে অন্তর্ভুক্ত। এতে ছোট-বড় সব ব্যবসায়ীরই ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে।
বুড়িমারী স্থলবন্দরের রপ্তানিকারক দুলাল হোসেন বলেন, ‘ ভারতীয় নিষেধাজ্ঞায় বুড়িমারী স্থলবন্দরে ২০টি গাড়ি আটকা পড়েছে। পাশাপাশি রপ্তানি পণ্যের গাড়িও এ বন্দরে আটকে আছে। এতে ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
বুড়িমারী স্থলবন্দরের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এ এস এম নিয়াজ নাহিদ বলেন, ভারতে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এতে দুই দেশের ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। ‘বাকি কয়েকটি পণ্য ঠিকভাবে চালু না থাকলে আমাদের রপ্তানি কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে। এতে কাস্টমস, সিঅ্যান্ডএফ ও শ্রমিক সবাই বিপদে পড়বে।’
বুড়িমারী কাস্টমস কর্মকর্তা রাশেদ জানান, ভারতে রপ্তানির জন্য প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ, সজীব গ্রুপ ও আকিজ গ্রুপের ২০টির মতো বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্যবোঝাই ট্রাক আটকা রয়েছে। শনিবার দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এসব পণ্যবাহী ট্রাক বুড়িমারী স্থলবন্দরে এসে পৌঁছায়।
বুড়িমারী স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের সহকারী পরিচালক (ট্রাফিক) মেহেদী হাসান বলেন, ভারত কর্তৃক বাংলাদেশ থেকে কিছু পণ্য রপ্তানি করার বিধিনিষেধ আরোপের বিজ্ঞপ্তি দেখেছি। রপ্তানি পণ্যের গাড়িগুলো সকালে স্থলবন্দরের শেডে প্রবেশ করে। নিষেধাজ্ঞার কারণে আজ প্রবেশ করেনি। ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যক্তিগত হেফাজতে রেখেছেন।
বুড়িমারী স্থলবন্দরের সহকারী কমিশনার (এসি) রাহাত হোসেন বলেন, ভারত কিছু খাদ্যপণ্য ও তুলার সুতার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এজন্য বুড়িমারী স্থলবন্দর থেকে এসব মালামাল ভারতে যাচ্ছে না। তবে এ বিষয়ে আমরা এখন পর্যন্ত কোনো চিঠি পাইনি।
ভারতের সঙ্গে সীমান্ত দিয়ে পণ্য ও যাত্রী চলাচল বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্থলপথ বন্ধ হলে ভারত থেকে আমদানিকৃত খাদ্যদ্রব্য ও শিল্প কাঁচামালের সরবরাহে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হবে, যা দেশে সামগ্রিক উৎপাদন ও বাজার মূল্যকে প্রভাবিত করবে।
বাণিজ্য: ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার; স্থলপথে বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি ও রফতানি হয়। খাদ্যশস্য (চাল, ডাল, তেল) ও শিল্প কাঁচামালের (কেমিক্যাল, ইস্পাত, সিঙ্ক) অধিকাংশই ভারত থেকে আসে।
পথ ও নিকাশন: মূলভাবে চট্টগ্রাম–কলকাতা, সিলেট–শিলিগুড়ি ও বেনাপোল–বদিদ্দা পোর্টস দিয়ে বন্দরপথে সরবরাহ হয়। আকাশপথে আমদানি কম, এবং সামুদ্রিক পথ অপেক্ষাকৃত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ।
চালের অভাব ও মূল্যস্ফীতি: ভারত থেকে বাংলাদেশের চাল আমদানির হার প্রায় ২০–২৫%। বন্ধ হলে ঘাটতির কারণে স্থানীয় বাজারে চালের দাম ১৫–২০% বৃদ্ধি পাবে।
তেলের ঘাটতি: রান্নার তেল আমদানির প্রধান উৎস ভারত; সরবরাহ কমে গেলে বিকল্প হিসেবে মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়া থেকে আনতে হবে—যাতে পরিবহণ খরচ বাড়বে ও মূল্যস্ফীতি তীব্র হবে।
ডালের সংকট: মসুর ও ছোলা ডালের আমদানি বন্ধ হলে কম দামের ডালের দিকে ভোক্তা ঝুঁকবে, স্থানীয় চাহিদা মেটে না—ভোজনাভ্যাসে পরিবর্তন ও খাদ্য নিরাপত্তায় প্রভাব।
শিল্প কাঁচামালের সংকট/ কেমিক্যাল ও পলিমার: পলিমার, রাসায়নিক সার, কেমিক্যাল দ্রব্য বন্ধ হয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক শিল্পে প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যাহত হবে।
ইস্পাত ও মেটাল: নির্মাণ খাতসহ হালকা–ভারী শিল্পে ব্যবহৃত ইস্পাত, সিঙ্ক, অ্যালুমিনিয়ামের আমদানির অভাবে দাম বৃদ্ধি ও উৎপাদন।
প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে স্টেইবলিটি: প্যাকেজিং, প্লাস্টিক ও গ্লাস পণ্য তৈরিতে কাঁচামাল না পেলে উৎপাদন বন্ধ অথবা চরম সীমাবদ্ধতা।
সম্ভাব্য প্রতিকার ও বিকল্প/ সমুদ্র পথের সম্প্রসারণ: চট্টগ্রাম, মুজিবনগর ও পটুয়াখালীর সমুদ্রবন্দরগুলোর সম্ভাব্য সম্প্রসারণ এবং লজিস্টিক নেটওয়ার্ক উন্নয়ন।
আকাশপথে আমদানির অনুপ্রেরণা: জরুরি খাদ্য ও কাঁচামালে বিমানঘাঁটিতে সাশ্রয়ী করার জন্য ভর্তুকি নীতি।
বৈদেশিক বৈচিত্র্য: মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব নাগরিকদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে খাদ্য পদার্থ আমদানির দলিলবদ্ধতা।
ন্যাশনাল স্টকপাইল: সরকারি ন্যাশনাল স্টকপাইল দ্রুততার সঙ্গে পূর্ণ করা এবং স্থানীয় চাষিদের উৎপাদন বাড়ানোর অনুদান।
সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রস্তুতি/ সরকারের প্রাথমিক পদক্ষেপ: ভোক্তামূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কড়াকড়ি, জরুরি আমদানি লাইসেন্স প্রদান।
বেসরকারি উদ্যোগ: লজিস্টিক কোম্পানির সঙ্গে সমন্বয়, ভলিউম ডিসকাউন্টের মাধ্যমে সমুদ্রপথে বড় অর্ডার।
সীমান্ত পারাপারে ডিজিটালাইজেশন: পাসপোর্ট ও পণ্যের চালান সংক্রান্ত ই-কলসার মাধ্যমে পারাপার সহজলভ্য এবং দ্রুতিকরণ।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ ১৭ হাজার ৬৫৯ কোটি টাকার পণ্য ভারতে রপ্তানি করে, গত অর্থবছরে তা প্রায় অপরিবর্তিত ছিল। অন্যদিকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারতে রপ্তানি করেছে ১৭ হাজার ৪২৫ কোটি টাকার পণ্য। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয়মাসে রপ্তানি হয়েছে ১১ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকার পণ্য। যেসব দেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বাড়ছে, তার মধ্যে ভারত একটি, যেখানে প্রতিবছর প্রায় ৭০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়। এর মধ্যে ৯৩ শতাংশের মত পোশাক পণ্য স্থলপথেই রপ্তানি হয়। ফলে ভারতের নতুন নিষেধাজ্ঞা এ খাতের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দেখা দেবে বলে ব্যবসায়ীদের শঙ্কা।