প্রতিবেদনে বলা হয়, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র ৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান ১৭ বছর নির্বাসিত জীবন কাটানোর পর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দেশে ফেরেন। ওইদিন লাখ লাখ উচ্ছ্বসিত জনতা তাকে স্বাগত জানায়। সেখান থেকেই বিএনপির নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করে তারেক রহমান যুক্তরাষ্ট্রের অধিকারকর্মী মার্টিন লুথার কিংয়ের বিখ্যাত উক্তির প্রতিধ্বনি করে বলেন, ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’।
এরপর থেকেই ভারত, দক্ষিণ এশিয়া অনান্য দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্র তার সেই পরিকল্পনাটি আসলে কি তার জানার অপেক্ষায় আছে।
ভারতের প্রথম পদক্ষেপ
শুক্রবার সকালেই চীন ও পাকিস্তানের আগে বাংলাদেশের নতুন নেতাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছে নয়াদিল্লি। বিশ্লেষকরা বলছেন, ঢাকাকে নিয়ে চীন ও পাকিস্তানের ‘স্নায়ু যুদ্ধের’ ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
এদিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তারেক রহমান এবং বিএনপিকে উষ্ণ অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন, তার সরকার একটি গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশকে সমর্থন করবে।
তারেক রহমানকে মোদির এই বার্তা একজন নবনির্বাচিত নেতাকে পাঠানো সাধারণ বার্তার মতো ছিল। তবে এতে অন্তর্নিহিত বক্তব্য স্পষ্ট ছিল যে, গত ১৮ মাসে বাংলাদেশের বিভিন্ন পদক্ষেপ, যার মধ্যে চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এবং কথিত হিন্দু সংখ্যালঘুদের বিষয়ে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা ভুলে গিয়ে একটি স্থিতিশীল সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে চায় ভারত। এটি নিশ্চিত করবে ‘পুরোনো মিত্র’ (বাংলাদেশ) তাদের পাশেই থাকবে।
ভারত কী পর্যবেক্ষণ করছে
ভারত বাংলাদেশের এ নির্বাচন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে। কারণ তাদের আশঙ্কা রয়েছে বাংলাদেশের নতুন সরকারের ওপর দক্ষিণ এশিয়া ও এর বাইরের আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এবং ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
নয়াদিল্লিন দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ নিয়ে তাদের তিনটি আন্তঃসংযুক্ত বিষয় রয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে বড় হল- সম্ভাব্য পাকিস্তান-চীন-বাংলাদেশ জোট। তাদের ধারণা, তারেক রহমান যদি শেখ হাসিনার চেয়ে ভারতকে কম গুরুত্ব দেন এবং ভারতের প্রতি কম বন্ধুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেন তবে চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের জোট হওয়ার সম্ভাবনা জোরালো হবে। কারণ পাকিস্তান-চীন-বাংলাদেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের কর্তৃত্ব দুর্বল করে দিতে পারে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশ- (বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম নির্বাচনের আগে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ওপর প্রভাব) এবং শেখ হাসিনার পতনের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে ভারত বিদ্বেষী মনোভাবের কারণে ভারত তার নিজের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন।
এরসঙ্গে আছে বাণিজ্যের বিষয়টি। যদিও উপরের বিষয়গুলো থেকে এটি ভারতের জন্য কম গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশ ও ভারত অর্থনৈতিক দিক দিয়ে একে-অপরের প্রতি এমনিই অনেক নির্ভরশীল।
সম্পর্কের ভিত্তি
হাসিনা ক্ষমতায় থাকাকালীন ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে সম্পর্ক স্থিতিশীল হিসেবে দেখা হত। আওয়ামী লীগের প্রধান, যিনি এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে নিষিদ্ধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত- ‘ভারতপন্থি’ সরকার পরিচালনা করেছেন, যেটি বাণিজ্য, যাতায়াত, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং পানিবণ্টন নিয়ে নয়াদিল্লির সঙ্গে কাজ করেছে।
যদিও স্পষ্টতই হাসিনাকেই আবার ক্ষমতায় চাইবে ভারত। কিন্তু ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা স্বীকার করেছেন, ভারত সরকার এখন বাংলাদেশের নেতৃত্বের পরিবর্তনটিকে স্বীকৃতি দেয়। তাই ক্ষমতায় আসতে যাওয়া বিএনপি ভারতকে অহেতুক চিন্তিত করবে না। কারণ তারেক রহমান বলেছেন, তিনি ভারতের স্বার্থকে সম্মান করবেন, যা তার মা খালেদা জিয়ার ‘বাংলাদেশ প্রথম’ নীতি থেকে কিছুটা সরে আসার ইঙ্গিত।
বাস্তব অর্থে এটি কী হবে এ মুহূর্তে ভারতের জন্য এটি একটি অপেক্ষার খেলা হবে। তবে ভারতের জন্য সুখবর হলো- ইসলামপন্থি দল জামায়াতে ইসলামী সরকারের অংশীদার হিসেবে সংসদে যাচ্ছে না। তাহলে বিএনপির সঙ্গে তাদের প্রস্তাব ভিন্ন হতো। কিন্তু বিএনপি স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিকে এগিয়ে যাওয়ায় স্বস্তি পেয়েছে ভারত।


























