


প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর যে পরিমাণ কোরবানির পশুর চাহিদা নির্ধারণ করেছিল তার তুলনায় বিভিন্ন বিভাগ ও জেলায় কম কোরবানির তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে কোরবানিযোগ্য পশুর একটি উল্লেখযোগ্য অংশই থেকে গেছে উদ্বৃত্ত। এতে লোকসানে পড়েছেন চাষি, খামারি ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। কৃষি অর্থনীতিবিদদের ধারণা, সরকার কোরবানির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল তার তুলনায় এবার ১০ লাখ কম পশু কোরবানি হয়েছে। যা উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার প্রভাব। প্রতি বছর ঈদের পর কী পরিমাণ পশু কোরবানি ও উদ্বৃত্ত থাকে সে পরিসংখ্যান প্রকাশ করে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। তবে এবারে এখন পর্যন্ত তারা পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করেনি। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, জেলা ও বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অফিস, খামারিরা বলছেন, এবার যে পরিমাণ চাহিদা নির্ধারণ হয়েছে তার তুলনায় পশু বিক্রি হয়েছে কম। ফলে কোরবানিও কম হয়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, এ বছর কোরবানিযোগ্য পশু রয়েছে ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। বিপরীতে চাহিদা নির্ধারণ করা হয় ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি পশুর। সে হিসাবে চাহিদার তুলনায় ২২ লাখ ২৭ হাজার ৫০৬টি পশু উদ্বৃত্ত থাকতে পারে বলে জানিয়েছিল। তবে খাতসংশ্লিষ্ট ও মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, এর চেয়েও বেশি উদ্বৃত্ত রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ বছর রংপুর জেলায় কোরবানির পশুর চাহিদা নির্ধারণ করা হয় ২ লাখ ২৬ হাজার ৯৯৬টি। কোরবানিযোগ্য পশু প্রস্তুত করা হয় ৩ লাখ ৬৬ হাজার ৫৯১টি। রংপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মুহ. নাজমুল হুদা জানিয়েছেন, রংপুরে এবার কোরবানি হয়েছে দুই লাখ ৬ হাজারের মতো পশু। অর্থাৎ যে চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছিল তার তুলনায় ২১ হাজারের মতো পশু কম কোরবানি হয়েছে। একইভাবে দেশের অন্যান্য জেলাগুলোতেও চাহিদার তুলনায় কম পশু কোরবানির তথ্য মিলেছে। আর্থিক চাপে অনেকে পশু কোরবানি দিতে পারেননি। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিগত কয়েক বছর মানুষ মূল্যস্ফীতির চাপে পিষ্ট। এতে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তরা। মূল্যস্ফীতির প্রভাবে পশুপালনকারীর ব্যয় বেড়েছে। সেটি দামেও প্রভাব ফেলায় কোরবানির ব্যয় বেড়েছে। ক্রয়সক্ষমতাও কমেছে মানুষের। এতে একদিকে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে, অন্যদিকে খামারিদের কাছে উদ্বৃত্ত রয়েছে অনেক গরু। যার পিছনে প্রতিদিন অনেক টাকা ব্যয় করতে হয়। কোরবানির ঈদেও গরু বিক্রি করতে না পারায় লোকসানের শঙ্কা রয়েছে তাদের। এছাড়া কোরবানির পশুর চামড়াতেও বিশাল অঙ্কের টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে ব্যবসায়ীদের।
ঈদের দিন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে চামড়া কিনেছেন মৌসুমি ব্যবসায়ী রংপুর নগরীর বুড়িরহাট এলাকার আনোয়ার হোসেন। তার সঙ্গী ছিলেন আরও চারজন। বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) থেকে স্ত্রীর নামে পঞ্চাশ হাজার টাকা ঋণ করেছেন। সেই টাকা দিয়ে শতাধিক গরুর চামড়া ক্রয় করেছেন তিনি। গড়ে প্রতিটি চামড়ার দাম পড়েছে ৫০০ টাকা। সারাদিনে ঘাম ঝরানো পরিশ্রমে ক্রয় করা চামড়া বিক্রি করতে এসে হতাশ আনোয়ার। লাভতো দূরের কথা, পুঁজির অর্ধেক টাকাই নেই। এমন লোকসানে দিশেহারা আনোয়ারের চোখে তখন জল ছলছল করছিল। রংপুরের আড়তে আনোয়ার হোসেনের মতো চামড়া বেচতে এসে অনেকেই কেঁদেছেন। কেউ কেউ সারাদিনের গাড়িভাড়া ও শ্রমিকদের টাকা দেওয়াতো দূরের কথা, নিজের মূলধন হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন।
বিভাগীয় নগরী রংপুরে কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে বিপাকে পড়েছেন মৌসুমি ব্যাবসায়ীরা। এবারে চামড়ার দাম সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। সরকার দাম নির্ধারণ করে দিলেও চামড়ার দাম নিয়ে নৈরাজ্য তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আড়তদাররা ইচ্ছে মতো দাম নির্ধারণ করে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য করছে। ২০০ থেকে ৩০০ টাকা দরে গরুর চামড়া কিনছে আড়তদাররা। অথচ গ্রামে গ্রামে ঘুরে তারা গড়ে ৫০০ টাকা দরে গরুর চামড়া কিনেছেন। এ নিয়ে মুলধন হারানোর ঝুঁকিতে থাকা চামড়া সংগ্রহকারী মৌসুমি ব্যবসায়ী, ফড়িয়া ও খুচরা বিক্রেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এমনকি অনেকেই বিক্রি না করতে পেরে চামড়া ফেলে দিয়েছেন। তারা জানান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এবার ঢাকার বাইরে গরুর লবণযুক্ত কাঁচা চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সে হিসেবে একটি মাঝারি আকারের গরুর চামড়ার দাম অন্তত ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে সেই চামড়া বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ টাকায়। আর ২০ হাজার টাকায় কেনা খাসির চামড়ার এক টাকাও দাম নেই। রংপুরে আড়তদারদের সিন্ডিকেটই চামড়ার বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে বলেও অভিযোগ তাদের।
প্রতি বছর কোরবানির ঈদের সময় রংপুরের চামড়াপট্রিতে বিকিকিনিতে ব্যস্ত থাকে ক্রেতা-বিক্রেতারা। তবে এ বছরের চিত্র ভিন্ন। চামড়া কেনার ব্যাপারে ব্যবসায়ীদের তেমন আগ্রহ নেই। বেশিরভাগ ব্যবসায়ী তাদের গুদাম বন্ধ করে রেখেছেন। গত বছরের লোকসান আর বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দাভাবের কারণে চামড়াশিল্পে জড়িত বড় বড় ব্যবসায়ীরা এবার হাত গুটিয়ে নিয়েছেন। ঈদের দিন নামাজের পরপরই চামড়াপট্টিতে গুদাম খুলে বসতেন ব্যবসায়ীরা, এবার তারা চামড়া না কেনার সিদ্ধান্তে বন্ধ রেখেছেন বেশিরভাগ গুদাম। রংপুরের প্রধান চামড়ার আড়ত শাপলাচত্বর সংলগ্ন কামারপাড়া এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ঈদের দিন থেকে অনেকেই চামড়া নিয়ে অপেক্ষা করলেও আড়তদাররা কেনার আগ্রহ দেখাননি। কেউ কেউ দাম বললেও তা ছিল ন্যায্যমূল্যের অর্ধেকেরও কম। চামড়া ব্যবসায়ী ও ফড়িয়ারা বলছেন, আড়তদার ও ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেটের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ফলে চামড়ার দাম পাচ্ছেন না সাধারণ বিক্রেতারা। নগরীর হাজিরাট এলাকা থেকে ১০০ চামড়া নিয়ে আসেন আব্দুর রহমান সরকার নামে এক ব্যবসায়ী। তিনি বললেন, ‘সরকারের নির্ধারিত দাম অনুযায়ী মাঝারি গরুর চামড়া ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা হওয়ার কথা।
কিন্তু আড়তদাররা ৩০০ টাকার বেশি দামে চামড়া নিতে রাজি নয়।’ একই অবস্থার কথা জানালেন কাউনিয়ার মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী আজিজুর রহমান, গঙ্গাচড়ার মাহফুজ আলী, তারাগঞ্জের লুৎফর রহমান, দর্শনা এলাকার একরামুল হকসহ আড়তে চামড়া নিয়ে আসা অনেকেই। তারা জানান, বাড়ি বাড়ি ঘুরে প্রতিটি চামড়া গড়ে ৫০০ টাকা দরে কিনেছেন। কিন্তু সেই চামড়ার দাম কেউই ২০০ থেকে ৩০০ টাকার বেশি দিতে রাজি হয়নি। ঈদের তৃতীয় দিন শনিবার নগরীর মডার্ণ মোড় এলাকা থেকে দুইটি ছাগলের ও একটি গরুর চামড়া বিক্রি করতে আড়তে রিকশায় করে আসেন জামাল উদ্দিন। ছাগলের চামড়ার কদর না থাকায় রাস্তায় ফেলে দেন তিনি। আর ৮৫ হাজার টাকায় কেনা কোরবানির গরুর চামড়াটি বিক্রি করেন মাত্র ৩০০ টাকায়। বাজারের এমন পরিস্থিতিতে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন, ‘আড়তদারদের কাছে চামড়ার কোনো দামই নেই। এটা কী ধরণের সিন্ডিকেট! ৮০ টাকা রিকশা ভাড়া করে তিনটি চামড়া বিক্রি করতে এসে কী লাভ হলো? এখন নিজের পকেট থেকে লোকসান গুণতে হচ্ছে।’ সাধারণ কোরবানিদাতাদের একটি বড় অংশ প্রতি বছরই সওয়াবের উদ্দেশ্যে স্থানীয় এতিমখানা ও মাদরাসায় চামড়া দান করেন। ঈদ মৌসুমে মাদরাসাগুলোর আয়ের অন্যতম বড় একটি উৎস এই চামড়া। কিন্তু এবারও দাম না থাকায় প্রাপ্ত চামড়া তাদের ‘গলার কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় হাফিজিয়া মাদরাসা ও এতিমখানার দায়িত্বে থাকা বাহারুল ইসলাম বললেন, মানুষ অনেক চামড়া দান করেছেন। কিন্তু গত তিন দিনেও কোনো ক্রেতার দেখা মেলেনি। বাধ্য হয়ে নামমাত্র মূল্যে চামড়া ছেড়ে দিতে হয়েছে।
গত এক দশকে চামড়া শিল্পে এমন বিপর্যয় কখনো দেখা যায়নি বলে মনে করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। তবে আড়তদাররা বলছেন, চামড়া কেনার কোনো ধরনের প্রস্তুতি নিতে পারেননি পুঁজি সংকটে থাকা ব্যবসায়ীরা। বকেয়া টাকা আদায় ও মূলধনের সংকট কাটিয়ে উঠতে না পারায় অনেক ব্যবসায়ী এবারের ঈদে চামড়া কিনতে পারেননি। সেই সুযোগকে কাজে লাগাতে গুটিকয়েক ব্যবসায়ী সেখানে গড়েছেন সিন্ডিকেট। তাদের কারণে ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বিক্রেতা ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। চামড়া ব্যাবসায়ী আড়তদার মকবুল হোসেন বললেন, চামড়া সংরক্ষণ করা লবন কেনাসহ চামড়া প্রতি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা ব্যয় হয়। ফলে তাদের সরকার নির্ধারিত মুল্যে চামড়া কেনা সম্ভব হচ্ছেনা বলে স্বীকার করেন তিনি। আরেক প্রবীণ ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করেন, ‘ট্যানারি ছাড়া স্থানীয়ভাবে চামড়া সংরক্ষণে বিকল্প কোনো উপায় নেই। এত কিছুর মাঝেও ট্যানারি মালিকরা সরকার থেকে ঋণ পাচ্ছে। কিন্তু আমাদের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ঋণ সুবিধার বাইরে রয়েছে। অথচ ট্যানারি মালিকরা চামড়া ব্যবসার নামে ঋণ নিয়ে তা অন্য খাতে বিনিয়োগ করছে।’