শীতকালীন আলু তোলার পর কিংবা আমন রোপণের আগ পর্যন্ত বছরের পর বছর যে জমিগুলো অনাবাদী পতিত হিসেবে পড়ে থাকত, এখন সেই জমিতেই দক্ষিণা বাতাসে দুলছে নীলগাছ। ইতিহাসের অভিশাপকে সম্ভাবনায় রূপ দিয়েছেন একদল কৃষক ও একজন উদ্যোক্তা। ফলে গঙ্গাচড়ার মাঠে আজ নীল শুধু একটি ফসল নয়, এটি হয়ে উঠেছে বদলে যাওয়া সময়ের এক অনন্য গল্প।
১৮৫৯-৬০ সালের ঐতিহাসিক নীল বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ শোষণের বিরুদ্ধে বাংলার কৃষকের অন্যতম বড় আন্দোলন। সেই আন্দোলনের প্রভাব রংপুর অঞ্চলসহ উত্তরবঙ্গেও ছড়িয়ে পড়ে। কৃষকদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে একসময় বাংলা থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায় নীল চাষ।
দীর্ঘ প্রায় দেড়শ বছর পর হারিয়ে যাওয়া সেই নীল আবার ফিরে এসেছে সম্ভাবনার ফসল হিসেবে । রংপুরের স্থানীয় উদ্যোক্তা নিখিল চন্দ্র রায় ২০০৫ সালে পরীক্ষামূলকভাবে গঙ্গাচড়া এলাকায় নীল চাষ শুরু করেন। পরে গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও কৃষকদের সম্পৃক্ত করে তিনি প্রাকৃতিক ইন্ডিগো উৎপাদনের উদ্যোগ নেন। বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠিত ইন্ডিগো ফিল্ডস লিমিটেড প্রাকৃতিক নীল প্রক্রিয়াজাত করে দেশি-বিদেশি বাজারে সরবরাহ করছে।
গঙ্গাচড়ার উপজেলার বড়বিল, বেতগাড়ী ও খলেয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় এখন নীল চাষ হচ্ছে। মার্চ মাসের মাঝামাঝি বীজ বপনের পর মাত্র ৮০ থেকে ৯০ দিনের মধ্যেই পাতা সংগ্রহ করা যায়। একটি গাছ থেকে তিন দফায় পাতা কাটা সম্ভব। এরপর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গাছ রেখে বীজ সংগ্রহ করা হয়। কম খরচ, কম পরিচর্যা এবং তুলনামূলক বেশি লাভের কারণে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে।
বড়বিল ইউনিয়নের কৃষক আনোয়ার হোসেন প্রায় এক যুগ ধরে নীল চাষ করছেন। এবার তিনি ৫৯ শতক জমিতে আবাদ করেছেন।
তিনি বলেন, “আগে আলু কিংবা তামাক ওঠার পর জমি কয়েক মাস খালি পড়ে থাকত। এখন সেই সময়েই জমিতেই নীল চাষ করি। এতে বাড়তি আয় হচ্ছে, আবার জমির উর্বরতাও বাড়ছে।”
স্থানীয় কৃষক তরিকুল ইসলাম বলেন, “মাত্র ২০ থেকে ২৫ শতক জমিতে প্রায় ১ হাজার ২০০ টাকা খরচ হয়। তিন দফায় পাতা বিক্রি করে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা আয় করা যায়। অনেক সময় লাভ ৭ থেকে ৮ হাজার টাকাও হয়।”
কৃষকদের ভাষ্য, নীলগাছের ডালপালা ও নিচের অংশ উৎকৃষ্ট জৈবসার এবং জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। ফলে পরবর্তী ফসল উৎপাদনেও রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমে যায়।
গঙ্গাচড়া ও আশপাশের এলাকার কৃষকেরা উৎপাদিত সবুজ পাতা স্থানীয় কারখানায় প্রতি কেজি প্রায় ৪ থেকে ৫ টাকা দরে বিক্রি করেন। রংপুর সদর উপজেলার হরকলি এলাকায় অবস্থিত ইন্ডিগো ফিল্ডস লিমিটেডে এসব পাতা আধুনিক প্রযুক্তিতে প্রক্রিয়াজাত করে প্রাকৃতিক ইন্ডিগো তৈরি করে। প্রায় ৩০০ কেজি সবুজ পাতা থেকে ১ কেজি প্রাকৃতিক ইন্ডিগো উৎপাদন করা সম্ভব।
উদ্যোক্তা নিখিল চন্দ্র রায় বলেন, “রংপুর অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়া নীল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। আমরা কৃষকদের বিনামূল্যে বীজ দিচ্ছি এবং উৎপাদিত পাতা কিনে নিচ্ছি। বর্তমানে শত শত কৃষক আমাদের সঙ্গে কাজ করছেন।”
তিনি জানান, বিশ্ববাজারে প্রাকৃতিক ইন্ডিগোর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় উৎপাদন খুবই কম। সরকারি সহযোগিতা, গবেষণা, সহজ ঋণ ও রপ্তানি সুবিধা বাড়ানো গেলে শুধু রংপুর অঞ্চল থেকেই বছরে প্রায় ২০০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব বলে তিনি আশাবাদী।
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে রংপুর সদর, গঙ্গাচড়া ও তারাগঞ্জ উপজেলার ২০টি গ্রামে এবং নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলায় শত শত কৃষক নীল চাষ করেছেন। কৃষিবিদদের মতে, পরিবেশবান্ধব প্রাকৃতিক রঙের আন্তর্জাতিক বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বাংলাদেশের উৎপাদিত নীল আন্তর্জাতিক মানের হওয়ায় এর রপ্তানি সম্ভাবনাও উজ্জ্বল।
এবিষয়ে গঙ্গাচড়া উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ রুবেল হুসেন বলেন, যেহেতু নীল চাষের বিষয়ে সরকারি কোন নির্দেশ পাইনি তাই বিষয়টি আমার জানা নাই। তবে নীল চাষের বিষয়ে উর্ধতন কতৃপক্ষের সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা বলব এবং নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করব।
একসময় যে নীল চাষ ছিল বাংলার কৃষকের জন্য অভিশপ্ত অধ্যায় , আজ সেই নীলই গঙ্গাচড়ার কৃষকের কাছে সম্ভাবনাময় ফসল। ইতিহাসের গ্লানি পেরিয়ে নীল এখন শুধু একটি ফসল নয়—এটি উত্তরাঞ্চলের কৃষির সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলেছে। নীল চাষ এখন গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন শক্তি এবং বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে এক সম্ভাবনাময় অধ্যায়ের নাম।