1. [email protected] : Md Hozrot Ali : Md Hozrot Ali
  2. [email protected] : Sokaler Bani : Iqbal Sumon
  3. [email protected] : Md Hozrot Ali : Md Hozrot Ali
খেলার চেয়ে বড় হয়ে উঠল রাজনৈতিক প্রভাব | দৈনিক সকালের বাণী
বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬, ১১:৫৯ পূর্বাহ্ন

খেলার চেয়ে বড় হয়ে উঠল রাজনৈতিক প্রভাব

ঢাকা অফিস
  • আপলোডের সময় : বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২৬
  • ১১ জন দেখেছেন

বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই কোটি কোটি মানুষের আবেগ, উন্মাদনা ও উৎসব। কিন্তু এবারের আসরে মাঠের খেলার পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে মাঠের বাইরের ঘটনা। ফুটবলের লড়াইকে ছাপিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে রাজনৈতিক প্রভাব, কূটনৈতিক চাপ এবং ফিফার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন।

মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র ও বেলজিয়ামের নকআউট ম্যাচটি প্রথমে সাধারণ একটি দ্বিতীয় রাউন্ডের লড়াই হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছিল। কিন্তু ম্যাচ শুরুর আগেই এটি বিশ্বরাজনীতির আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়। ক্রীড়াপ্রেমীদের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের রাজনীতিক, কূটনীতিক ও নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিও ছিল এই ম্যাচের দিকে। অনেকেই জানতে চেয়েছিলেন—শেষ পর্যন্ত জয়ী হবে ফুটবল, নাকি রাজনৈতিক প্রভাব?

এই বিতর্কের সূচনা যুক্তরাষ্ট্র ও বসনিয়ার ম্যাচকে কেন্দ্র করে। সেই ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে গোল করার পর দ্বিতীয়ার্ধে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড় তারিক মুহারেমোভিচের ওপর বিপজ্জনক ট্যাকলের দায়ে ভিএআরের সহায়তায় লাল কার্ড দেখেন ফোলারিন বালোগান। নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী ম্যাচে নিষিদ্ধ হওয়ার কথা ছিল তাঁর।

কিন্তু ঘটনাটি সেখানেই থেমে থাকেনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। পরে জানা যায়, তিনি ব্যক্তিগতভাবে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গে যোগাযোগ করে বালোগানের শাস্তি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানান। ইনফান্তিনোও পরে স্বীকার করেন যে তিনি প্রেসিডেন্টের ফোন পেয়েছিলেন।

এরপর ঘটে সবচেয়ে বিতর্কিত ঘটনা। ফিফা শৃঙ্খলাবিধির ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদ ব্যবহার করে বালোগানের এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। অর্থাৎ ভবিষ্যতে একই ধরনের অপরাধ করলে সেই শাস্তি কার্যকর হবে। তবে কেন এই ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, সে বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়নি সংস্থাটি।

ফিফার এই সিদ্ধান্ত শুধু বেলজিয়াম নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ফুটবলপ্রেমী ও বিশ্লেষকদের মধ্যেও তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। অনেকেই মনে করেন, এতে ফিফার দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষতার দাবিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। রেফারির সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক প্রভাব পড়েছে—এমন অভিযোগও সামনে আসে।

তবে এটাই ছিল না এবারের বিশ্বকাপের একমাত্র বিতর্ক। টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার আগ থেকেই নানা সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনার মুখে ছিল ফিফা। বিশেষ করে গত বছরের বিশ্বকাপ ড্র অনুষ্ঠানে হঠাৎ করেই ‘ফিফা শান্তি পুরস্কার’ চালু করে সেটি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দেওয়ার ঘটনা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।

এই পুরস্কারের আগে কোনো ঘোষণা, নীতিমালা কিংবা নির্বাচন প্রক্রিয়ার কথা জানা ছিল না। এমনকি ফিফা কাউন্সিলের কয়েকজন সদস্যও দাবি করেন, অনুষ্ঠান শুরুর আগ পর্যন্ত তাঁরা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ঘটনাটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অনেকে এটিকে ‘রাজনৈতিক নাটক’, ‘শান্তির ধারণার অপমান’ কিংবা যুক্তরাষ্ট্রকে সন্তুষ্ট করার প্রচেষ্টা বলেও মন্তব্য করেন।

দুর্নীতি, প্রভাব খাটানো এবং রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ নতুন নয় ফিফার জন্য। তবে আগাম ঘোষণা ছাড়া নতুন একটি পুরস্কার তৈরি করে তা কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে দেওয়ার ঘটনায় সংস্থাটির বিশ্বাসযোগ্যতা আরও ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

অনেকের মতে, ফিফার ‘রাজনীতিমুক্ত ফুটবল’-এর দাবি এখন বাস্তবের চেয়ে প্রচারণাতেই বেশি সীমাবদ্ধ।

এবারের বিশ্বকাপে ইরানের ঘটনাও ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করে। গ্রুপপর্বে কোনো ম্যাচে না হেরেও দলটি টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয়। তবে মাঠের ফলাফলের চেয়েও বেশি আলোচিত হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণ, ভিসা জটিলতা এবং রাজনৈতিক চাপের অভিযোগ।

সিয়াটলে শেষ ম্যাচের পর ইরানের অধিনায়ক মেহদি তারেমি সরাসরি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবেই ইরানকে নকআউট পর্বে দেখতে চায়নি। তাঁর ভাষায়, মাঠে প্রতিপক্ষের পাশাপাশি মাঠের বাইরের নানা বাধার বিরুদ্ধেও তাদের লড়াই করতে হয়েছে।

এমনকি ইরানকে আটকে দিতে অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়ার ম্যাচ নিয়ে কারসাজির অভিযোগও ওঠে। যদিও ফিফা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে, তবুও বিশ্বের বহু ফুটবলপ্রেমী বিষয়টি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।

বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিলেও ইরানের লড়াকু মানসিকতা প্রশংসিত হয়েছে। অন্যদিকে প্রশ্নের মুখে পড়েছে ফিফার ভূমিকা। পুরো টুর্নামেন্টেই নির্দিষ্ট কিছু দলের প্রতি নমনীয়তা এবং রেফারিংয়ে অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে। যদিও প্রায় সব বিশ্বকাপেই এমন অভিযোগ দেখা যায়, তবে বালোগানের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘটনা এবারের আসরকে সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত করে তুলেছে।

এই ঘটনার পর অনেকেই ফিরে তাকিয়েছেন ১৯৩৪ সালের ইতালি বিশ্বকাপের দিকে।

সেবার স্বাগতিক ইতালির শাসক বেনিতো মুসোলিনি বিশ্বকাপকে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। জাতীয় দলকে শক্তিশালী করতে বিদেশি খেলোয়াড়দের দ্রুত নাগরিকত্ব দেওয়া হয়। অভিযোগ ছিল, প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ না করেও কয়েকজন ফুটবলারকে ইতালির হয়ে খেলতে দেওয়া হয়েছিল এবং ফিফা সে বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

আরও অভিযোগ রয়েছে, সেমিফাইনাল ও ফাইনালের দায়িত্বে থাকা সুইডিশ রেফারি টুর্নামেন্টের আগে মুসোলিনির সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছিলেন। এমনকি ইতালির স্বার্থে ম্যাচ পরিচালনার জন্যও তাঁকে প্রভাবিত করা হয়েছিল বলে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে।

শেষ পর্যন্ত ইতালি শিরোপা জয়ের পাশাপাশি মুসোলিনির বিশেষ উদ্যোগে তৈরি ‘কোপা দেল দুচে’ ট্রফিও গ্রহণ করে। ফলে অনেকের কাছে সেই বিশ্বকাপ কেবল ফুটবলের নয়, ফ্যাসিবাদী শক্তির প্রচারণারও প্রতীক হয়ে ওঠে।

এবার ট্রাম্পের ফোনকলের পর ফিফার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ঘটনায় তাই স্বাভাবিকভাবেই ১৯৩৪ সালের সেই বিতর্ক আবার সামনে চলে আসে। অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে হয়তো যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যাম্পিয়ন করার পথ তৈরি করা হচ্ছে।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই আশঙ্কা সত্যি হয়নি। বেলজিয়ামের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ের মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে, সব বিতর্কের পরও মাঠের খেলাই শেষ কথা বলতে পারে। অন্তত এই ম্যাচে জয় হয়েছে ফুটবলের।

তবু পুরো বিশ্বকাপ একটি বড় প্রশ্ন রেখে গেছে—রাজনৈতিক প্রভাব কি বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাটির স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত করছে?

ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়; এটি বিশ্বের মানুষের আবেগ, ভালোবাসা ও ঐক্যের প্রতীক। ভাষা, ধর্ম, বর্ণ কিংবা ভৌগোলিক সীমারেখা অতিক্রম করে কোটি মানুষকে একই অনুভূতিতে যুক্ত করে এই খেলা। নেইমারের কান্না যেমন আমাদের স্পর্শ করে, তেমনি মেসির সাফল্যে আমরা আনন্দিত হই, রোনালদোর বিদায়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি।

খেলাধুলা মানুষকে মানবিক হতে শেখায়, সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্যের শিক্ষা দেয়। একজন খেলোয়াড় যখন মানবকল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করেন, তখন তা কোটি মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। তাই খেলাধুলার মূল শক্তি কেবল প্রতিযোগিতা নয়; এটি মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠারও অন্যতম মাধ্যম।

সেই কারণেই ক্রীড়াঙ্গনকে রাজনৈতিক স্বার্থের বাইরে রাখা ফিফার মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর অন্যতম দায়িত্ব। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপে বিভিন্ন সিদ্ধান্তে তারা সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পেরেছে কি না—তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

তারপরও শেষ পর্যন্ত একটি বিষয়ই সবচেয়ে বেশি আশাব্যঞ্জক। সব বিতর্ক, সমালোচনা ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেও মাঠের খেলাই শেষ কথা বলেছে। তাই এই বিশ্বকাপে কে শিরোপা জিতবে, সেটির চেয়েও বড় বিষয় হলো—ফুটবল যেন তার নিজস্ব সৌন্দর্য, নিরপেক্ষতা ও মানবিক চেতনাকে ধরে রাখতে পারে। বিশ্বরাজনীতির হাতিয়ার নয়, মানুষের মিলনের ভাষা হিসেবেই ফুটবল বেঁচে থাকুক—এটাই সবার প্রত্যাশা।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক সকালের বাণী
Theme Designed BY Kh Raad ( Frilix Group )