
হেমন্তের শেষ দিকে ঠাকুরগাঁওয়ের মাঠে মাঠে যখন আলুর চারা সবে মাথা তুলছিল, তখন কৃষকের চোখে ছিল ভবিষ্যতের স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিয়েছিল শীতের শেষে, যখন দিগন্তজোড়া মাঠে বাম্পার ফলন দেখে কৃষকের মুখে হাসি ফুটেছিল। রাশি রাশি আলু উঠেছিল মাটি ফুঁড়ে। মনে হচ্ছিল, এবার বুঝি সোনালি ফসল ঘরে তুলে দেনা শোধ হবে, ছেলেমেয়ের মুখে হাসি ফুটবে, থাকবে আগামীর সংস্থান। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন পরিণত হয়েছে এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে। মাঠ থেকে তোলা আলু ঘরে, বারান্দায়, রাস্তার পাশে, এমনকি পুকুরপাড়েও পচে নষ্ট হচ্ছে। ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন এলাকা, বিশেষ করে ঢোলারহাট, আকচা, নারগুন আর বেগুনবাড়ি জুড়ে এখন কেবল পচা আলুর তীব্র দুর্গন্ধ আর কৃষকের বুকফাটা হাহাকার। ভালো ফলনের পরও এমন সর্বনাশ মেনে নিতে পারছে না কেউ।
আলু একসময় এই অঞ্চলের কৃষকের কাছে ‘সোনালি ফসল’ হিসেবে পরিচিত ছিল। কম সময়ে ভালো ফলন এবং সঠিক দাম পেলে কৃষকের ভাগ্য বদলে যেত। গত কয়েক বছর ধরে আলুর মোটামুটি ভালো দাম পাচ্ছিলেন চাষিরা। অন্যান্য ফসলের অনিশ্চয়তা আর কম লাভের তুলনায় আলু হয়ে উঠেছিল প্রধান অবলম্বন। তাই এবারও লাভের আশায় এবং হয়তো কৃষি বিভাগের পরোক্ষ উৎসাহে অনেক কৃষকই আলুর আবাদ বাড়িয়েছিলেন। কেউ কেউ ধারদেনা করে, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে, সমিতি থেকে টাকা তুলে আলুর চাষ করেছিলেন। মাঠ ভরা ফসল দেখে তাঁদের মনে ছিল বুকভরা আশা।
কিন্তু সেই আশার গুড়ে বালি পড়েছে সংরক্ষণের অব্যবস্থাপনায়। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে ঠাকুরগাঁও জেলায় ২৭ হাজার হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছিল। ফলনও হয়েছে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি, প্রায় ৮ লাখ ৫০ হাজার টন। এ পর্যন্ত সব ঠিক ছিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—এই বিপুল পরিমাণ আলু সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা জেলায় নেই। ঠাকুরগাঁও জেলায় সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মোট হিমাগার আছে মাত্র ১৭টি। আর এই ১৭টি হিমাগারের মোট ধারণক্ষমতা মাত্র ১ লাখ ৫০ হাজার টন! এর মানে হচ্ছে, অন্তত সাড়ে ৬ লাখ টনের বেশি আলু সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা নেই। এই বিপুল পরিমাণ আলুই এখন খোলা আকাশের নিচে, অনিরাপদ স্থানে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে।
ঢোলারহাট ইউনিয়নের পুকুরপাড়ে পচে যাওয়া আলুর বিশাল স্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে বোবা দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন শ্রীমতি রায়। চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছিল জল। তাঁর কষ্টের কথাগুলো জড়ানো কণ্ঠে বেরিয়ে আসছিল। তিনি বলেন, “প্রায় ৩০ বিঘা জমিতে আলু লাগাইছিলাম। ধারদেনা করে বীজ, সার, ওষুধ কিনছি। ফলনও খুব ভালো হইছিল। ভাবছিলাম হিমাগারে রাখব, পরে ভালো দামে বিক্রি করব। কিন্তু কোনো হিমাগারে জায়গা পাই নাই। পরিচিত অনেকের মাধ্যমে চেষ্টা করেও লাভ হয় নাই। শুনছি আগে থেইকা নাকি বুকিং দেওয়া লাগে, টাকাও বেশি লাগে। গরিব মানুষ, অত হিসাব বুঝি না। পরে বাড়ির পাশে পুকুরপাড়ে বস্তা বন্দী করে রাখছিলাম। এখন দেখেন কী অবস্থা!” পচে যাওয়া আলুর দুর্গন্ধ যেন তাঁর কথার মতোই ভারী। তিনি বলেন, “এই আলু ছিল আমার স্বপ্ন, আমার পরিবারের ভবিষ্যতের স্বপ্ন। এই আলুই আজ আমার সর্বনাশের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঋণের টাকা ক্যামনে শোধ করব, জানি না।”
শ্রীমতী রায় গল্প ঠাকুরগাঁওয়ের হাজার হাজার কৃষকের প্রতিনিধিত্ব করে। আঁকচা ইউনিয়নের কৃষক লুৎফর রহমানেরও একই দশা। তিনি ৫০০ মণ আলু উৎপাদন করেছিলেন। হিমাগারে জায়গা না পেয়ে নিজের টিনের ঘরে মাচা বানিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু তাপমাত্রা আর আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণে না থাকায় সেখানেও আলু পচন ধরেছে। প্রায় ২০০ মণ আলুই নষ্ট হয়ে গেছে। লুৎফর রহমান বলেন, “নিজের হাতে ফলানো ফসল এভাবে পচে যাচ্ছে, আর কিছুই করার নাই। বাজারে দাম নাই, আর পচা আলু তো কেউ কিনবেই না। এখন এই পচা আলু ফালাবো কোথায় সেই চিন্তায় আছি। কিছু তো রাস্তার পাশে ফেলেই দিছি।”
নারগুন ইউনিয়নের কৃষক শরিফুল ইসলাম দুর্দশা আরও মারাত্মক। দেড় একর জমিতে আলু চাষ করতে তাঁর প্রায় ২ লাখ টাকা খরচ হয়েছিল। এর মধ্যে বেশিরভাগই ছিল ব্যাংক ঋণ আর স্থানীয় দোকান থেকে নেওয়া বাকি।
শরিফুল বলেন, “আলু বিক্রি করে আশা করছিলাম অন্তত আড়াই লাখ টাকা আসবে। লাভের টাকা দিয়ে সংসারের খরচ চালাব, ঋণ শোধ করব। কিন্তু এখন বিক্রি করে ৫০ হাজার টাকাও উঠছে না। আলু কিনতেই চায় না কেউ, দাম বলে একদম কম। হিমাগারেও জায়গা পাই নাই। এখন ব্যাংকের কিস্তি ক্যামনে দিব, দোকানের বাকি ক্যামনে শোধ করব? মহাজনরা টাকার জন্য চাপ দিতাছে। পরিবার নিয়া না খাইয়া মরা লাগব।” তাঁর চোখেমুখে গভীর হতাশা আর ভয়ের ছাপ স্পষ্ট।
হরিপুরের সাইফুল ইসলামের পরিস্থিতি আরও হৃদয়বিদারক। হিমাগারে জায়গা না পেয়ে তিনি তাঁর আলুর একাংশ রেখেছেন ঘরের বারান্দায়, একাংশ রান্নাঘরের পাশে, এমনকি কিছু আলুর বস্তা রেখেছেন ঘরের নিচেও। বাড়ির ভেতর পচা আলুর তীব্র গন্ধে টেকা দায়। সাইফুল ইসলাম বলেন, “চোখে সরাসরি না দেখলেও পচা আলুর গন্ধে মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে যায়। এই গন্ধই বলে দেয়-আমার সব শেষ হয়ে গেছে। যে ফসল ঘরে তুলছিলাম আশা নিয়ে, এখন সেটাই আমার বসবাসের শান্তি নষ্ট করছে। এর চেয়ে খারাপ আর কী হইতে পারে?” এই অবস্থা শুধু সাইফুল ইসলামের নয়, অনেক কৃষকই তাঁদের বসতবাড়ির বিভিন্ন জায়গায় আলু রেখে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
কেবল সংরক্ষণের অভাবই নয়, আলু ব্যবসায়ীরা বলছেন রপ্তানি বন্ধ থাকাটাও এবারের সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ। আলু ব্যবসায়ী খোরশেদ আলম বলেন, “গত বছরগুলোতে রাশিয়া, নেপাল, মালয়েশিয়া, ভুটানসহ কয়েকটি দেশে আমাদের আলু রপ্তানি হতো। তখন কৃষকরাও ভালো দাম পেত। কিন্তু এবার সরকারের পক্ষ থেকে বড় কোনো রপ্তানি উদ্যোগ দেখা যায়নি। যে কারণে দেশের ভেতরে আলুর সরবরাহ অনেক বেশি, কিন্তু সেই তুলনায় চাহিদা বা বাজারের পরিধি বাড়েনি। ফলে দাম তলানিতে ঠেকেছে।” রপ্তানির বাজার চালু থাকলে এই বিপুল পরিমাণ আলুর কিছুটা হলেও বিদেশে পাঠানো যেত এবং কৃষকরা ন্যায্য দাম পেত বলে তিনি মনে করেন।
অন্যদিকে, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মোঃ আলমগীর, পরিস্থিতি স্বীকার করে বলেন, “চাষিরা এবার আমাদের পরামর্শ না শুনে অনেক বেশি জমিতে আলু লাগিয়েছেন। আমরা আগেই তাঁদের বলেছিলাম যেন বিভিন্ন প্রকারের ফসল উৎপাদন করে। কিন্তু অধিক উৎপাদন হওয়ায় হিমাগারে জায়গা হয়নি। তাই সংরক্ষণের অভাবে পচন ধরেছে।” তিনি জানান, অধিদপ্তর থেকে কৃষকদের বিকল্প ফসল চাষে উৎসাহিত করা হয়েছিল, কিন্তু আলুর লাভের আশায় অনেক কৃষকই সেদিকে যাননি।
তবে এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন বেগুনবাড়ি এলাকার কৃষক আবদুল হাকিম (সম্ভবত ঢোলারহাটের একই ব্যক্তি বা ভিন্ন)। তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আপনারা পরামর্শ দেন ভালো কথা। কিন্তু চাষ না করলে আমরা খাব কী? কৃষিকাজই তো আমাদের একমাত্র অবলম্বন। আর সরকার যদি এত উৎপাদনের পর সংরক্ষণের ব্যবস্থা না করে, ন্যায্যমূল্যের বাজার তৈরি না করে, তাহলে আমরা কোথায় যাব? শুধু উৎপাদন কমাও বললে তো হবে না, অন্য কী চাষ করব, সেই নিশ্চয়তা কে দেবে? লাভের আশায় ফসল ফলাইয়া যদি দেনার দায়ে মরতে হয়, এর চেয়ে না করা ভালো।”
ঠাকুরগাঁওয়ের মাঠঘাট, রাস্তাঘাট, পুকুরপাড় আর কৃষকের বসতবাড়ি জুড়ে ছড়িয়ে থাকা পচা আলুর স্তূপ যেন শুধু হাজার হাজার টন ফসলের পচন নয়, এটা এই অঞ্চলের কৃষি নির্ভর অর্থনীতির পচন, কৃষকের স্বপ্ন আর বেঁচে থাকার শেষ আশাটুকুর পচন। যে ফসল কৃষকের মুখে হাসি ফোটাতে পারত, সেটাই আজ তাঁদের গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ আলুর অপচয় একদিকে যেমন খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ, তেমনি কৃষকের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা না হলে, পর্যাপ্ত হিমাগার নির্মাণ, রপ্তানির বাজার সচল করা এবং কৃষকদের জন্য বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করা না হলে, ঠাকুরগাঁওয়ের কৃষকের এই কান্না থামবে না। আলু একসময় স্বপ্নের ফসল ছিল, আজ তা শুধুই হতাশার প্রতীক। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ খুঁজছে ঠাকুরগাঁওয়ের হাজার হাজার কৃষক পরিবার।
Related