


দিনাজপুরের পার্বতীপুর মধ্যপাড়া রেঞ্জ বনবিভাগের কুশদহ বনবিটের ১হাজার ১শ’ একর জমি দখলে নিয়েছেন উপকারভোগীরা। রাতের আঁধারে গাছ কেটে নিয়ে সরকারি বনভূমিকে ফসলি কৃষিজমিতে রূপান্তর করে চাষাবাদ শুরু করেছে ৭০০ উপকারভোগী। আবার বনবিভাগের জমি দখলের পর বিক্রিও করে দিচ্ছেন শতাধিক উপকারভোগী। জবর দখলকারী ৩শ’ একর বনভূমি দখল করে সেখানে নির্মাণ করছেন দ্বিতল বাড়ী, রিসোর্ট-কটেজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার, ঘর-বাড়ি। ১শ’ একর বনভূমি রুপান্তর করে কৃষিজমি তৈরী করে করা হয় হলুদ ক্ষেত, আম ও মাল্টার বাগান। উপকারভোগি তাঁদের দাপটে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অসহায়। কোন ভাবেই এসব উপকারভোগীদের হাত থেকে রক্ষা করা যাচ্ছে না সরকারি বনবিভাগের জমি।
মধ্যপাড়া রেঞ্জের বন বিভাগের কুশদহ বীটে ৩০০ একর জমি দখল করে গড়ে উঠেছে কুষ্টিয়াপাড়া, চাপাইপাড়া, হঠাৎপাড়া, অফিসপাড়া, ডাঙ্গাপাড়া, জায়গিরপাড়া ও স্বষ্ঠীপাড়া। এই বনবিটের ৭০০ একর জমি দখলে সরকারি বনভূমিকে ফসলি কৃষিজমিতে রূপান্তর করে চাষাবাদ করছেন উপকারভোগীরা। অবশিষ্ট বনবিভাগের ৪২৫ একর জমিতে রয়েছে বাগান। কুশদহ বিটে ১ হাজার ৫২৫ একর বনভুমি রয়েছে। পার্বতীপুর মধ্যপাড়া রেঞ্জ সুত্র জানায়, পার্বতীপুর মধ্যপাড়া রেঞ্জ বন বিভাগের সরকারি অর্থায়নে বনবিভাগের সৃজিত সরকারি বাগান রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচর্যা প্রথম ২০০০-২০০১ অর্থবছরসহ বিভিন্ন সময়ে এসব ৫৫০ উপকারভোগির সাথে চুক্তি হয় ১০ বছরের। ২০১০-২০১১ কর্তন করে এসব উপকারভোগি তাদের নিলাম মূল্যে বিক্রিরত ৪৫% টাকা বুঝে পায়। সরকার পায় ৬৫% টাকা। এরপর ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে কর্তনের পর নতুন করে লাগানো হয় গাছ। সেই গাছ অঙ্কুরেই ধংস্ব করে দেয় উপকারভোগিরা। এভাবেই মধ্যপাড়া বনবিভাগের জমি দখলের পর বিক্রিও করে দিচ্ছেন উপকারভোগিরা। কেটে ফেলেছে হাজার হাজার গাছ। রাতের আঁধারে গাছ কেটে নিয়ে ধীরে ধীরে তা কৃষিজমিতে রূপান্তর করে চাষাবাদ শুরু করেছে।
কুশদহ বিটের অফিসপাড়ার ছাইদুল পাগলা নিজে বনভূমিকে ফসলি কৃষিজমিতে রূপান্তর করে চাষাবাদ করছেন ১০ একর জমি। এছাড়াও আত্মীয়, স্বজন ও প্রতিবেশির কাছে দখলস্বত্ব বিক্রি করে প্রায় ১০০ একর জমি বিক্রি করে দেয়। কুশদহ বিটে সরকারি বনভূমিতে অফিসপাড়ায় ১০ একর জমিতে ৫০০ গাছের মাল্টা বাগান, ১০ একর জমিতে ১ হাজার গাছের আম বাগান ও ১০ একর বনভূমিকে কৃষিজমিতে রূপান্তর করে চাষাবাদ করছেন উপকারভোগি মোক্তার হোসেন হাজি, একই এলাকার হাকিম মাষ্টার ১৫ একর জমিতে ১২শ’ গাছের আম বাগান ও ১৫ একর জমিতে চাষাবাদ করছেন, হাদিসপাড়া গ্রামের ইউপি সদস্য রাহেনুল ইসলাম ৩০ একর জমি চাষাবাদ করে, দখলস্বত্ব বিক্রি করে ১৫ একর বনভূমি। হঠাৎপাড়া গ্রামের শিবপুর মাদ্রানার সুপার নুর ইসলাম দুই ভাই মিলে ১৫ একর জমি চাষাবাদ করছে। হাদিসপাড়ার ইব্রাহিম আলীর নেতৃত্বে গত ৭ আগষ্ট রাতের আধারে ৮ একর জমি দখল হয়েছে। বর্তমানে সেই সরকারি বনভূমির জমিতে সব্জি চাষ করা হচ্ছে। পার্বতীপুরের মধ্যপাড়া রেঞ্জের কুশদহ বিটের ১ হাজার ৫শ’ ২৫ একর জমির মধ্যে ১ হাজার ১শ’ একর জমি উপকারভোগিদের দখলে চলে গেছে। অবশিষ্ট আছে মাত্র ৪২৫ একর জমিতে বাগান। পার্বতীপুরের মধ্যপাড়া রেঞ্জের কর্মকর্তা মো: আল আমিন হক বলেন, মধ্যপাড়া রেঞ্জের কুশদহ বিটে নিরাপত্তার কারনে কোন বিট কর্মকর্তা কর্মস্থলে থাকতে পারছেন না। বনবিভাগের বাগান টেন্ডার নেই, শুধু তারা ‘এগ্রো ফরেষ্ট’ নিয়মে ১৮ ফিট পর পর তিন সারিগাছ রেখে মধ্যখানে চাষাবাদ করবে। এরজন্য কোন খাজনা দিতে হবে না। ধান দিতে হবে না।
১০ বছর পর সরকারকে নিলাম মূল্যে বিক্রিরত ৪৫% টাকা পাবে। সরকার পাবে ৬৫% টাকা। কিন্তু উপকারভোগি তা না করে বনভুমিকে ফসলি জমিতে রুপান্তর করছে। যেটা সম্পুর্ন রুপে বেআইনী। মধ্যপাড়া রেঞ্জ সুত্রে বলা হয়েছে, পার্বতীপুর ও নবাবগঞ্জ উপজেলার বনবিভাগ নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মধ্যপাড়া রেঞ্জ। এ রেঞ্জের অধীনে রয়েছে মধ্যপাড়া সদর, নবাবগঞ্জ কুশদহ বীট, আফতাবগঞ্জ বীট, ভবানীপুর বীট ও পার্বতীপুর উপজেলা নার্সারী। আফতাবগঞ্জ বীটে ২৬০০ একর, মধ্যপাড়া বীটে ১৪০০ একর, নবাবগঞ্জ কুশদহ বীটে ১৫৫০ একর ও ভবানীপুর বীটে ১৬০০ একর বনভুমি রয়েছে। মধ্যপাড়া রেঞ্জে মোট ৭ হাজার ১৫০ একর বনভূমি থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে এখানে বনভূমি আছে মাত্র ২ হাজার ১৫০ একর। আর বাকি ৫ হাজার একর বনভূমি বেদখলে চলে গেছে। ২০১৫ সালে মধ্যপাড়া রেঞ্জের আফতাবগঞ্জ বনবিটে বিনোদন পার্ক ‘স্বপ্নপুরী’ মালিক বনবিভাগের ৩৭ একর (১০০ বিঘা) জায়গার দখল নিতে সেখানকার ১০৪ শালগাছ কেটে ফেলে দেয়। এ ঘটনায় স্বপ্নপুরীর জেনারেল ম্যানেজার মিজানুর রহমান মিজানসহ ৫ জনকে আসামি করে একটি মামলা করে বনবিভাগ।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপর হামলা, ৫০ কোটি টাকার সম্পত্তি উদ্ধার : গত ১১ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় কুশদহ বিট কর্মকর্তা আব্দুর রহমান কে লালঘাট বাজার এলাকায় একাকি পেয়ে উপকাভোগি শাহাজুল ইসলাম, সোহেল , সালমান ও রশিদুল ইসলামের নেতৃত্বে তাকে বেধরক মারধর করা হয়। গুরুত্বর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে দ্রুত পার্শ্ববর্তী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
৬ ফেব্রয়ারী বন বিভাগের জমি থেকে ১৫ লাখ টাকা মূল্যের আকাশমনি ও শালগাছ ৪০০ টুকরা উদ্ধার করা হয়েছে। চোরাই গাছ উদ্ধার করতে গিয়ে বনপ্রহরী আতিকুল ইসলাম, রুহুল আমিন, জনি, সহযোগি ওয়াচার মাজেদুল হক, আজিজুল হক গুরুতর আহত হয়। এলাকাবাসী কেড়ে নেয় ওয়াচারের ভ্যানগাড়ী ও মোবাইল। এসময় জীবন রক্ষার্থে ৯ রাউন্ড গুলি খরচ করা হয়। ২৩ মার্চ কুশদহ বিটের কুশদহ মৌজার ২২০৯ দাগে ৫০০টি মূল্যবান আকাশমনি গাছ কর্তনের ফলে প্রায় ৫০ লাখ ক্ষতির অভিযোগে এনে থানায় ৪৩ নামে একটি মামলা দায়ের করেন কুশদহ বিটের বিট কর্মকর্তা আব্দুল মোত্তালেব। এরআগে দিনাজপুর বন সংরক্ষক কর্মকর্তা রকিবুল জামান শাহ, গাছের চারা রোপন করতে গিয়ে ডারকামারী গ্রামে মধ্যপাড়া রেঞ্জের কর্মকর্তা আব্দুল হাইসহ ৫/৬ কর্মকর্তা ও ৫০ কর্মচারী আহত হন। এসব উদ্ধার করতে গিয়ে বিভিন্ন সময় হামলার শিকার হতে এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। এসব ঘটনায় এপর্যন্ত প্রায় ৭০০টি মামলা হয়েছে। এপর্যন্ত ১০০ একর জায়গা তাঁরা দখলমুক্ত করা হয়েছে। যার বাজার মূল্য প্রায় ৫০ কোটি টাকা। জবরদখল হয়ে যাওয়া বনভূমি উদ্ধারে মাঠে কাজ করছে বন বিভাগ।
বনবিভাগের জমি দখলের উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে পার্বতীপুরের মধ্যপাড়া রেঞ্জের কর্মকর্তা মো: আল আমিন হক বলেন, উপকারভোগিদের সাথে বাগান রক্ষণাবেক্ষন ও পরিচার্যার চুক্তি ছিল, এখন তারাই বন ধ্বংস করে বনভূমি ফসলি কৃষিজমিতে রুপান্তর করে চাষাবাদ করছে উপকারভোগি। দখল ছেড়ে দেয়ার জন্য সম্প্রতি ১৪ জনকে নোটিশ দেয়ার পরেও তারা দখল ছাড়েনি। কুশদহ বিটের বনভূমি দখলমুক্ত করতে ৭২ মামলাও দেয়া হয়েছে। আছে ৫টা জিআর মামলা। বিভিন্ন সময়ে দখল উচ্ছেদ প্রস্তাব দেয়া হয়েছে ৩১৪ টি নোটিশ করা হয়। মধ্যপাড়া রেঞ্জের করা প্রায় ৭০০ মামলা চলমান রয়েছে। ১০০ একর জায়গা তাঁরা দখলমুক্ত করা হয়েছে।