এর প্রভাবে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে সিলেট ও সুনামগঞ্জের নিচু এলাকাগুলোতে আগাম বন্যার পদধ্বনি শুরু হয়েছে। দেশের আবহাওয়াবিদদের দেওয়া আবহাওয়ার পূর্বাভাস সেই আশঙ্কাকে আরও ঘণীভূত করেছে।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক জানান, দেশের উত্তরাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন এলাকায় গভীর সঞ্চালনশীল মেঘমালা তৈরি এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে। এর প্রভাবে শনিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরবর্তী ৯৬ ঘণ্টায় ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণ হতে পারে। এর ফলে ময়মনসিংহ ও সিলেটের কোথাও কোথাও জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ওয়েদার অবজারভেশন টিমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমান জানান, বাংলাদেশের দিকে ধেয়ে আসা প্রাক-মৌসুমি বৃষ্টি বলয় ‘ঝুমুল’ আগামী ৭ মে পর্যন্ত কার্যকর থাকতে পারে। এই সময় দেশের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ এলাকায় বজ্রবৃষ্টি, কালবৈশাখী ঝড় এবং কোথাও কোথাও অতিভারী বর্ষণের আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘শনিবার দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বৃষ্টিপাত বৃদ্ধির লক্ষণ দেখা গেছে এবং সকালে কিছু এলাকায় বৃষ্টিও হয়েছে। আজ রাত থেকে বৃষ্টিপাত আরও সক্রিয় হতে পারে এবং সামগ্রিকভাবে একটি অনুকূল আবহাওয়া তৈরি হচ্ছে, যা আগামী প্রায় ৭ মে পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। এই সময়ের মধ্যে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’
এই আবহাওয়াবিদ জানান, উজানের এলাকাগুলো, যেমন মেঘালয়, আসাম এবং চেরাপুঞ্জি অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃষ্টিপাত হতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, এই সময়কালে এসব এলাকায় প্রায় ৫০০ থেকে ৭০০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে পাহাড়ি ঢলের আশঙ্কা রয়েছে, যা বাংলাদেশের সিলেট ও সুনামগঞ্জের নিচু এলাকাগুলোতে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। তবে এই বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ পানি দ্রুত নেমে যেতে পারে।
তিনি জানান, প্রথমদিকে বৃষ্টিপাত উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকলেও ২৮ বা ২৯ এপ্রিল থেকে এটি ধীরে ধীরে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ২৯ এপ্রিল থেকে ৫ মে পর্যন্ত সময়ে দেশের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ এলাকায় নিয়মিত ঝড়-বৃষ্টির প্রবণতা থাকতে পারে। যদিও মাঝেমধ্যে এক-দুই দিনের জন্য বিরতি দেখা যেতে পারে। তবুও এই সময়ে বৃষ্টিপাতের আধিক্য থাকার সম্ভাবনা বেশি।
ঝড়ের বিষয়ে এই আবহাওয়াবিদ বলেন, এই সময়ে অধিকাংশ এলাকায় দমকা হাওয়া বা ঝড়ের গতিবেগ ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৮০ কিলোমিটারের মধ্যে থাকতে পারে। কিছু কিছু স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে এর চেয়ে কম বা বেশি গতিবেগও হতে পারে।
এই বৃষ্টিপাতের কারণে হাওর অঞ্চলে চলমান ধান কাটার কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। টানা বৃষ্টি হলে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এতে কৃষকরা সময়মতো ধান কাটতে পারবেন না। ফলে ফসলের ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এদিকে বাংলাদেশ ওয়েদার অবজারভেশন টিম লিমিটেডের (বিডব্লিউওটি) পূর্বাভাসও বলছে, বৃষ্টি বলয় ‘ঝুলুম’-এর প্রভাবে সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের অতি বন্যা প্রবণ নিচু এলাকায় আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির ঝুঁকি রয়েছে। সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কিশোরগঞ্জ জেলার কিছু কিছু নিচু এলাকায় অস্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে।
এছাড়া উজানে ভারতের আসাম ও মেঘালয়ে ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড়ি ঢলের সৃষ্টি হতে পারে। এর প্রভাবে রংপুর, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের নদী ও হাওরে পানি আকস্মিক বৃদ্ধি পেতে পারে বলেও বিডব্লিউওটি-এর পূর্বাভাসে বলা হয়েছে।
অন্যদিকে আবার শনিবার (২৫ এপ্রিল) রাতে কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ ফেসবুকে দেওয়া এক পূর্বাভাসে জানিয়েছেন, আজ সন্ধ্যা ৭টা থেকে রোববার (২৬ এপ্রিল) সকাল ৮টার মধ্যে রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগসহ দেশের বিভিন্ন জেলার ওপর দিয়ে কালবৈশাখী ঝড়, বজ্রপাত ও বৃষ্টিপাত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
ঝড়ের সময় বজ্রপাতের আশঙ্কা থাকায় এই সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় খোলা মাঠে না থাকা এবং নদী পথে যাতায়াতের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের কথা বলা হয়েছে।
এছাড়া আবহাওয়া অধিদফতরও জানিয়েছে, ঢাকাসহ দেশের ছয় বিভাগে আগামী কয়েকদিন বৃষ্টির পরিমাণ বাড়তে পারে। এর সঙ্গে দমকা হাওয়া ও বজ্রসহ বৃষ্টির প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরবর্তী ১২০ ঘণ্টার অর্থাৎ, আগামী পাঁচ দিনের পূর্বাভাসে এ তথ্য জানায় অধিদফতর। এই পাঁচ দিন দেশের কোথাও কোথাও মাঝারী ধরণের ভারী থেকে ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে বলেও জানানো হয়েছে।
এদিকে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে পড়ে, দেশের তাপমাত্রা ৪৫ থেকে ৫৭ ডিগ্রি পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।
এ ব্যাপারে আবহাওয়া নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ ওয়েদার অবজারভেশন টিমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমান জানিয়েছেন, এ খবর সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। বাস্তবে এমন কোনো সম্ভাবনা নেই। বরং বৃষ্টিপাত বৃদ্ধির কারণে তাপমাত্রা কমে আসার সম্ভাবনাই বেশি।


























