


দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলায় অটো রাইস মিলের ছাই ও দুর্গন্ধময় বর্জ্য পানির কারণে পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে গোটা এলাকা। বিশেষ করে সেতাবগঞ্জ পৌর শহর যেন ধোঁয়া, ছাই ও দূষণের নগরীতে পরিণত হয়েছে। প্রায় ১৭ বছর ধরে এ সমস্যা চলমান থাকলেও কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে পরিস্থিতি দিন দিন ভয়াবহ হয়ে উঠছে।বোচাগঞ্জ খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে এবছর ৩৭ টি অটো রাইস মিল নবায়ন করেছেন। তবে বোচাগঞ্জ পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধ কমিটির তথ্যমতে উপজেলায় ৪৪টি অটো রাইস মিল রয়েছে। ২৮ টি রয়েছে পৌর এলাকায়।
এ বছর ৩৭টি মিল নবায়ন করা হলেও, কোনো মিলেই পানি শোধনাগার নেই, কেউ ফেলেন নদীতে, কেউ পুকুরে, কেউ নিজস্ব জমিতে। ফলে এসব মিল থেকে প্রতিনিয়ত ছাই ও দুর্গন্ধময় পানি বের হয়ে আশপাশের নদী, খালে ছড়িয়ে পড়ছে। ছাই নিয়ন্ত্রণের জন্য সাইক্লোন মেশিন ৫-৭ অটো রাইস মিলে নামকাওয়াস্তে থাকলেও কার্যকরী নেই। সরেজমিনে দেখা গেছে, সেতাবগঞ্জ পৌর শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত সোয়া নদী ও ইশানিয়া ইউনিয়নের রাক্ষুসিনী নদীতে মিল থেকে নির্গত দুর্গন্ধময় পানি পড়ছে। এতে নদীগুলো এখন কার্যত মৃতপ্রায়। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, প্রায় ১৭ বছর ধরে এসব দূষণের কারণে ৪৫ প্রকার দেশি মাছ হারিয়ে গেছে। যদি এখনই পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, আগামী ১০ বছরের মধ্যে এ নদীগুলো সম্পূর্ণভাবে জীববৈচিত্র্যহীন হয়ে পড়বে।
সেতাবগঞ্জ পৌর এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা কুলসুম বেগম বলেন,আমাদের সোয়া নদীতে আগে বালিয়া আর তারা বাইম মাছ পাওয়া যেত। এখন আর পাওয়া যায় না। প্রায় ১৭ বছর ধরে এই মাছগুলো একেবারে হারিয়ে গেছে।আরেক বাসিন্দা মাসুদুর রহমান জানান,আগে এই নদীতে দেশীয় চোপড়া আর পুঁটি মাছ সহজেই ধরা যেত। আলুর সঙ্গে ভেজে খেতাম অসাধারণ স্বাদ ছিল। এখন টেংরা সহ অনেক দেশীয় মাছই আর নেই।শুভ ইসলাম, সেতাবগঞ্জ পৌর এলাকার আরেক বাসিন্দা, বলেন সকালে ঘর থেকে বের হতে চশমা আর মাস্ক ছাড়া উপায় নেই। ছাই চোখে পড়লে প্রচণ্ড জ্বালা করে। একই এলাকার সিদ্দিকুর রহমান অভিযোগ করে বলেন,অটো রাইস মিলের ছাই টিনের চালা, গাছের পাতা, এমনকি খাবারের মাঝেও পড়ে। কাপড় শুকাতে দিলে কালো দাগ পড়ে যায়। এই দূষণ এখন আমাদের নিত্যদিনের যন্ত্রণা।”
স্থানীয় কিশোর ও আইডিয়াল স্কুলের ছাত্র রাবিদ জানায়, বাড়ির বাইরে খেলতে গিয়েছিলাম, চোখে ছাই পড়লে চোখ লাল হয়ে যায়। পরে আমি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নিয়েছি।আরও কয়েকজন বাসিন্দা জানান,অটো রাইস মিলের পাশ দিয়ে হাঁটলে চোখে ছাই পড়ে, চোখ লাল হয়ে যায় এবং জ্বালা করে। পরিবেশটা একেবারেই অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ কিন্ডার গার্ডেন অ্যাসোসিয়েশনের বোচাগঞ্জ উপজেলা শাখার সভাপতি এম এ তাফসীর হাসান বলেন, সেতাবগঞ্জ পৌর এলাকায় নিয়মবহির্ভূতভাবে একের পর এক অটো রাইস মিল গড়ে উঠছে। ফ্যাসিস্ট আমলে নৌপরিবহণ প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় অনুমোদন ছাড়াই বহু মিল স্থাপন করা হয়। তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল হান্নান একাই পৌর এলাকায় প্রায় ১৪টি মিল গড়ে তোলেন। এর ফলে সোয়া নদী ধ্বংসের মুখে পড়েছে মাছ নেই, গাছ নেই, চারদিকে শুধু দূষণ আর রোগব্যাধি বাড়ছে। এম এ তাফসীর হাসান সতর্ক করে বলেন, বোচাগঞ্জে মিলগুলোর দেড় কিলোমিটারের মধ্যে সরকারি-বেসরকারি প্রায় ৩০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। অটো রাইস মিলগুলো যদি পরিবেশবান্ধব না করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে পুরো এলাকা ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়বে।
স্কুলের পাশে অটো রাইস মিল, ঝুঁকিতে শিক্ষার্থীরা সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সেতাবগঞ্জ পৌর এলাকার মুশিদহাট মালিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়–এর পাশেই স্থাপিত হয়েছে সালেহা অটো রাইস মিল। বিদ্যালয়ের প্রাচীর ও মিলের প্রাচীর একসাথেই একপাশে স্কুল, আরেকপাশে মিল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কমল চন্দ্র রায় বলেন, আগের সরকারের কিছু প্রভাবশালী লোক আমাকে চাপ প্রয়োগ করে লিখিত নিয়েছিল মিল স্থাপনের সময়। আমি তখন নিরুপায় ছিলাম। তিনি আরও বলেন,আমি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য দিতে পারছি না। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, মিল থেকে নির্গত ধোঁয়া, শব্দ,ছাই ও ধুলাবালি শিশুদের পড়াশোনার পরিবেশ ব্যাহত করছে এবং শিক্ষার্থীরা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি ক্রমশ বাড়ছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. বিজয় কুমার রায় বলেন,ছাই ও ধোঁয়ার কারণে শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসজনিত জটিলতা, অ্যালার্জি এবং চর্মরোগের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২৩ সালে গড়ে প্রতিদিন ২-৩ জন এ ধরনের রোগে চিকিৎসা নিতেন,২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪-৫ জনে,আর চলতি ২০২৫ সালে প্রতিদিন গড়ে ৬-৭ জন রোগী এসব সমস্যায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। এছাড়া গাউসুল আজম বিএনএসবি আই হসপিটাল দিনাজপুর পরিচালিত সেতাবগঞ্জ ভিশন সেন্টার ও চক্ষু সেবা ও পরামর্শ কেন্দ্র থেকেও চোখে ছাই পড়ার কারণে প্রতিদিন গড়ে ৫-৭ জন রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। সেন্টারের ইনচার্জ আবু সাঈদ মণ্ডল জানান, চোখে ছাই পড়ার কারণে কর্নিয়ায় আলসারের প্রবণতা বেড়েছে। এখানে যারা চিকিৎসা নিতে আসেন, তারা মূলত মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষ। সামর্থ্যবানরা দিনাজপুরে চিকিৎসা নিতে যান। প্রতি শুক্রবার সেতাবগঞ্জ কাবেরী ফার্মেসিতে চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও ফ্যাকো সার্জন ডা. ওয়াহিদা বেগম নিয়মিত চোখের চিকিৎসা ও পরামর্শ দেন। অন্যদিকে সেতাবগঞ্জ সাহা মেডিকেল স্টোরে প্রতি রবিবার দিনাজপুর জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট (চক্ষু) ডা. আশরাফুল ইসলামও চক্ষু সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
এছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পল্লি চিকিৎসকরা শ্রমজীবী ও খেটে খাওয়া মানুষের চোখের প্রাথমিক চিকিৎসা দিচ্ছেন। সব মিলিয়ে বোচাগঞ্জ উপজেলায় প্রতিদিন গড়ে অর্ধশতাধিক মানুষ চোখের চিকিৎসা নিচ্ছেন।
একাধিক অটো রাইস মিলের শ্রমিকরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মিলের বাইরে যেমন ছাই পড়ে, ভেতরেও আমরা যারা কাজ করি, আমাদের গায়েও ছাই পড়ে। ধানের খোসা বস্তায় ভরার সময় ছাই ও ধুলা চোখে পড়ে, তখন চোখ লাল হয়ে যায়। তারা আরও বলেন, মিলে কাজ করলে মাঝে মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়ি। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, কিন্তু কয়েকদিন বিশ্রাম নিয়ে আবার কাজে ফিরি। পেটের দায়ে সব সহ্য করতে হয় পেট তো আর এসব বুঝে না।
বোচাগঞ্জ পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মাইনুল ইসলাম (বুলু) জানান, ১৭ বছর ধরে এসব মিল স্থানীয় পরিবেশকে ধ্বংস করছে। আমরা মালিকদের অনুরোধ করেছি যেন পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থা নেয়, কিন্তু তারা শুনেনি। ডিসি, ইউএনও, পরিবেশ অধিদপ্তর—সব জায়গায় গিয়েছি, তবুও কোনো সাড়া পাইনি। ইতোমধ্যে দেশীয় ফলগাছ কমে গেছে। মাছ নেই বললেই চলে। যদি মিলগুলো স্থানান্তর না করা হয়, শিগগিরই আমরা কঠোর আন্দোলনে নামব।”
বোচাগঞ্জ উপজেলা মৎস্য অফিসার প্রণব রায় জানান, বোচাগঞ্জ উপজেলার উপর দিয়ে ৪টি নদী প্রবাহিত এরমধ্যে দুটি নদীতে অটো রাইস মিলের বজ্র নদীতে পতিত হয় ফলে পানি দূষণ হয়। বলা যায় এদুটি নদী থেকে দেশীয় প্রজাতির মাছ প্রায় বিলুপ্ত। আমরা কিছুদিন আগে মৎস্য সপ্তাহ পালন করেছি। আমরা উপজেলা প্রশাসনের সাথে আলোচনা করেছি ভবিষ্যতে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া দরকার উপজেলা প্রশাসনকে অবহিত করে সে দিকে এগিয়ে যাব। আমাদেরকে দেশীয় মাছ ধরে রাখতে গেলে এই নদীগুলোকে সংরক্ষণ করতে হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মারুফ হাসান বলেন, আমাদের কাছে অভিযোগ এসেছে, সেটি জেলায় পাঠানো হয়েছে। পরিবেশ রক্ষায় ৪২ হাজার গাছ রোপণ করা হয়েছে। বোচাগঞ্জ এসপি অটো রাইসমিলের মালিক সুবাস চন্দ্র রায় বলেন, আমাদের শোধনাগার নেই। আমরা দুই বছরের জন্য সময় নিয়েছি। উত্তরা অটো রাইস মিলের মালিক আলতাবুর রহমান বলেন আমার শোধনাগার নেই কিন্তু আমি আমার নিজস্ব জমিতে বজ্র ফেলি আমি কোন নদীতে ফেলিনা। দিনাজপুর জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক বদরুন্নাহার সীমার কাছে বোচাগঞ্জ উপজেলায় মোট কতটি অটো রাইস মিল রয়েছে এবং এর মধ্যে কয়টিতে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বোচাগঞ্জ উপজেলায় কতটি অটো রাইস মিল আছে, সে সম্পর্কে আমার কাছে সঠিক রেকর্ড নেই। ছাড়পত্র সংক্রান্ত তথ্যও এখনো পাইনি। আমি মাত্র এক মাস হলো দিনাজপুরে যোগদান করেছি। তবে যে-সব অটো রাইস মিল থেকে অতিমাত্রায় দূষণ হয়, সেসব মিলের ফাইল ইতোমধ্যে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। তাদেরকে ঢাকায় ডাকবেন হয়ত।