


নদী বেষ্টিত চরাঞ্চল বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৃষি ও প্রাণিসম্পদ নির্ভর এলাকা। একসময় এসব অঞ্চলে মহিষ পালন ছিল মানুষের জীবিকা নির্বাহের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ুর নানান প্রতিকূলতার কারণে চরাঞ্চলে মহিষ পালনের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। জানাগেছে, কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের মধ্যে ৩টি নদীর ওপারে চর।
আর এইসব চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ খোলা মাঠ, নদীর তীরবর্তী চারণভূমি ও প্রাকৃতিক ঘাস মহিষ পালনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। আগে এসব এলাকায় পরিবারপ্রতি একাধিক মহিষ দেখা যেত। মহিষের দুধ, মাংস এবং কৃষিকাজে ব্যবহারের মাধ্যমে চরবাসী অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হতো। কিন্তু বর্তমানে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। নদী ভাঙনের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় কুড়িগ্রামের চিলমারীর বিশাল অংশের চারণভূমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
যেই জমিগুলো একসময় ঘাসে পরিপূর্ণ ছিল এবং গরু-মহিষ চড়ানোর জন্য ব্যবহৃত হতো, তা এখন পানির নিচে বা নদীতে হারিয়ে গেছে। এছাড়াও বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর জমিতে পলিমাটির বদলে বালুর পুরু আস্তরণ পড়ছে। বালুময় মাটিতে স্বাভাবিক ঘাস বা গবাদিপশুর খাওয়ার উপযোগী লতাপাতা জন্মাতে পারে না। ফলে একসময়ের উর্বর চারণভূমি এখন ধু-ধু বালুচরে পরিণত হচ্ছে। এতে মহিষ পালনের পরিবেশ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ফলে প্রতিবছর কমছে মহিষের সংখ্যা। যা স্থানীয় দুধ ও মাংস উৎপাদন এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। উপজেলা প্রাণিসম্পদ সূত্রে জানা গেছে, এক দশক আগে চিলমারীতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মহিষ থাকলেও গত তিন বছরে এর সংখ্যা প্রায় ২০–২৫ শতাংশ কমেছে। মহিষ কমে যাওয়ায় স্থানীয় বাজারে দুধ ও মাংসের সরবরাহও হ্রাস পাচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এইসব গৃহপালিত মহিষ পালন কমে যাওয়ার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে নদীভাঙন ও চরাঞ্চলের ভূমি সংকট। প্রতিবছর নদীভাঙনের ফলে বিস্তীর্ণ চারণভূমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ফলে মহিষ চরানোর জন্য পর্যাপ্ত জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া ঘাস ও খাবারের সংকটও বড় একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো পশু চিকিৎসা সেবার অভাব। চরাঞ্চলে পর্যাপ্ত ভেটেরিনারি ডাক্তার ও ওষুধের ব্যবস্থা না থাকায় মহিষ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে অনেক মহিষ মারা যাচ্ছে, ফলে খামারিরা এই পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
চর কড়াইবরিশাল গ্রামের মহিষ পালক জেল হক জোদ্দার বলেন, আগে চরের মাঠে মহিষ ছেড়ে দিলেই সারাদিন চরে খেত। এখন চারপাশে আবাদ, বেড়িবাঁধ আর বসতি, মহিষ রাখার জায়গাই নেই, তাছাড়া ভুট্টা চাষে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করে ঘাস মেরে ফেলা হচ্ছে। বাজারের খাবার কিনে খাওয়াতে গেলে লাভ তো দূরের কথা, লোকসান হয়। তাই অনেকেই মহিষ পালনে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
স্থানীয় আর এক মহিষ পালক জমির আলী বলেন, নদীভাঙনে আমার সব জমিজমা বিলীন হয়ে গেছে। চাষাবাদ করার মতো এক টুকরো জমিও আর অবশিষ্ট নেই। তাই জীবন-জীবিকার একমাত্র অবলম্বন হিসেবে চরে চরে ঘুরে মহিষ পালন করি। এই মহিষের ওপরই নির্ভর করে আমার সংসার, ছেলেমেয়ের লেখাপড়া, কাপড়-চোপড়, চিকিৎসা আর দৈনন্দিন খরচ। যখন বড় অঙ্কের টাকার প্রয়োজন হয়, তখন একটি মহিষ বিক্রি করেই সেই চাহিদা মেটাই। মহিষ না থাকলে আমাদের মতো চরবাসীর বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে পড়বে। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, মহিষ পালন কমে যাওয়ার ফলে চরাঞ্চলের অর্থনীতি ও পুষ্টি নিরাপত্তায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে এবং অনেক মানুষ বেকার হয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
নদী তথ্য বিশ্লেষক জাহানুর রহমান বলেন, নদীর গতিপথ পরিবর্তন, অনিয়মিত বন্যা ও বালুচর সৃষ্টির ফলে একসময়কার উর্বর চারণভূমি বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এতে মহিষসহ পশুপালন সংকটে পড়ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পরিকল্পিত অভিযোজন জরুরি। চরাঞ্চলে নির্দিষ্ট চারণভূমি সংরক্ষণ, নদীতীরবর্তী এলাকায় ঘাস ও পশুখাদ্য উপযোগী গাছ লাগানো, বালুময় জমিতে সহনশীল ঘাস চাষ এবং সমবায়ভিত্তিক পশুপালন চালু করতে হবে। পাশাপাশি সরকারি সহায়তা ও প্রশিক্ষণ জোরদার করা গেলে জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যেও পশুপালন ও গ্রামীণ অর্থনীতি টেকসই করা সম্ভব।
চিলমারী গোলাম হাবিব মহিলা ডিগ্রি কলেজের সহ অধ্যাপক আব্দুর রহমান রতন জানান, চরাঞ্চলে উন্নত পশু চিকিৎসা সেবা, প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ এবং মহিষের খাদ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হলে আবারও মহিষ পালনে আগ্রহ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে মহিষের দুধ ও মাংসের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা জরুরি। সঠিক পরিকল্পনা ও সহায়তা পেলে চরাঞ্চলে মহিষ পালন আবারও প্রাণ ফিরে পাবে এবং চরবাসীর জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
চিলমারী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সাগরিকা কার্জ্জী বলেন, মহিষের দুধ গরুর দুধের তুলনায় বেশি পুষ্টিকর এবং মহিষের মাংসে কোলেস্টেরল কম থাকায় বাজারে এর চাহিদা রয়েছে। তবে চারণভূমি সংকট মহিষ পালনের সবচেয়ে বড়ো বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চরাঞ্চলে নির্দিষ্ট চারণভূমি সংরক্ষণ ও সমন্বিত পশুপালন পরিকল্পনা নেওয়া হলে মহিষ পালন আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
কুড়িগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, চরাঞ্চলের প্রাকৃতিক চারণভূমি রক্ষা করা না গেলে শুধু চিলমারী নয়, পুরো জেলার মহিষ পালনই ঝুঁকির মুখে পড়বে। আমরা স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে চরভিত্তিক সমন্বিত পশুপালন মডেল চালুর চেষ্টা করছি। একই সঙ্গে খামারিদের জন্য উন্নত জাত, টিকা, প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ সেবা জোরদার করা হচ্ছে। মহিষ পালনের ঐতিহ্য রক্ষার পাশাপাশি দুধ ও মাংস উৎপাদন বাড়াতে সরকারি সহায়তা প্রয়োজন। পরিকল্পিত চারণভূমি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে মহিষ পালন আবার লাভজনক খাতে পরিণত হবে।