আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন জানিয়েছে, বর্তমানে তদন্ত প্রতিবেদনের খসড়া চূড়ান্ত যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে জমা দেওয়া হবে।
বুধবার (৮ জুলাই) নিজ কার্যালয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, তদন্তকারী সংস্থা দীর্ঘ সময় ধরে সাক্ষ্য-প্রমাণ, ভিডিওচিত্র, আলোকচিত্র, নথিপত্র এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি পর্যালোচনা করে তদন্ত শেষ করেছে। এখন কেবল আইনি ও কারিগরি যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের অপেক্ষা।
ট্রাইব্যুনালের অবকাশকালীন ছুটি শেষে আগামী ২১ জুলাই বিচারিক কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যেই তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেলে প্রসিকিউশন দ্রুত আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র (ফরমাল চার্জ) প্রস্তুত করে ট্রাইব্যুনালে দাখিল করবে বলে জানান তিনি।
মামলায় সম্ভাব্য আসামির সংখ্যা ২৮ থেকে ৩০ জন হতে পারে জানিয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে, তাদের বিরুদ্ধেই অভিযোগপত্র দাখিলের প্রস্তুতি চলছে।
তবে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আগে সম্ভাব্য আসামিদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করতে চায়নি প্রসিকিউশন। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যানুযায়ী, প্রধান আসামি শেখ হাসিনা ছাড়াও এ মামলার আসামির তালিকায় রয়েছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, পুলিশের সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, এ কে এম শহীদুল হক, বেনজীর আহমেদ, র্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল আহসান, ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) হারুন অর রশীদ, পুলিশ কর্মকর্তা বিপ্লব কুমার সরকার, একাত্তর টেলিভিশনের মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রুপাসহ বেশ কয়েকজন সাংবাদিক।
এর আগে গত ২ জুলাই জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু এ মামলায় আসামি হতে পারেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন আমিনুল ইসলাম।
সে সময় চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ইনু তথ্যমন্ত্রী থাকার সময় হেফাজতের সমাবেশকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও তথ্যমন্ত্রীর নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে দিগন্ত টেলিভিশন এবং ইসলামিক টেলিভিশনের সরাসরি সম্প্রচার বন্ধ করা হয়। ওই রাতে ইসলামিক টেলিভিশনের কার্যালয়েও ভাঙচুর করা হয়।
শাপলা চত্বরে ওই রাতের অভিযানে ৩২ জনের প্রাণহানির সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা।
সংস্থাটির এক কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন, এ ঘটনায় এরই মধ্যে আমরা ৩২ জন নিহত ব্যক্তির তালিকা পেয়েছি। তারা শাপলা চত্বরেই নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামেও হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, পুলিশ সদস্য কিংবা যারা অর্থের জোগান দিয়েছেন, তাদেরও এ মামলায় আসামি করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, শাপলা চত্বরের এ মামলার ৯০ শতাংশ তদন্ত শেষ হয়েছে। বাকি কাজও শিগগির সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
গত ৭ জুন শাপলা চত্বর হত্যাযজ্ঞের এ মামলায় সাবেক মন্ত্রী দীপু মনি, একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক এমডি মোজাম্মেল হক বাবু ও সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রুপাকে এক দিন করে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন ট্রাইব্যুনাল।
বর্তমানে এ মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন ছয়জন। তারা হলেন—সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান, পুলিশের সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, সাবেক ডিআইজি মোল্যা নজরুল ইসলাম ও আবদুল জলিল মণ্ডল এবং একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টা শাহরিয়ার কবির।
গত ৫ এপ্রিল তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। সে সময় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সময় চেয়ে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেল আগামী ১০ আগস্ট প্রতিবেদন দাখিলের নতুন দিন ধার্য করেছেন।
শাহবাগের গণজাগরণ আন্দোলনের বিপরীতে ব্লগারদের শাস্তির দাবিতে ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলে সমাবেশ ডাকে নারী ও শিক্ষানীতির বিরোধিতাকারী কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম।
সেদিন ওই সমাবেশ ঘিরে পুরো মতিঝিল এলাকায় ব্যাপক সহিংসতা ও তাণ্ডব চলে। পরে রাতে যৌথ অভিযান চালিয়ে হেফাজতের কর্মীদের শাপলা চত্বর থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
মানবাধিকার সংগঠন অধিকার সে সময় এক প্রতিবেদনে দাবি করেছিল, শাপলা চত্বরে ওই অভিযানে ৬১ জন নিহত হন। যদিও তৎকালীন পুলিশের দাবি ছিল, রাতের অভিযানে কেউ মারা যাননি। আর দিনভর সংঘাতে নিহতের সংখ্যা ছিল ১১।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ২০ আগস্ট শাপলা চত্বরের এ ঘটনা নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নতুন করে অভিযোগ জমা পড়ে।






















