1. [email protected] : Md Hozrot Ali : Md Hozrot Ali
  2. [email protected] : Sokaler Bani : Iqbal Sumon
  3. [email protected] : Md Hozrot Ali : Md Hozrot Ali
ক্র্যাচে ভর দিয়ে হাঁটেন, গাছের মগডালে উঠে সংসার চালান একরামুল | দৈনিক সকালের বাণী
বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০৮ অপরাহ্ন

ক্র্যাচে ভর দিয়ে হাঁটেন, গাছের মগডালে উঠে সংসার চালান একরামুল

কাউনিয়া (রংপুর) প্রতিনিধি
  • আপলোডের সময় : বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪৯ জন দেখেছেন
এক পা প্রায় অচল, অন্য পাটিও দুর্বল। মাটিতে কয়েক কদম হাঁটতেই ভর করতে হয় ক্র্যাচে। অথচ পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে সেই একরামুল হককেই প্রতিদিন উঠতে হয় গাছের মগডালে। কখনো ডাল কাটতে হয়, কখনো এক গাছ থেকে আরেক গাছে ঝুঁকি নিয়ে যেতে হয়। সামান্য আয়ের জন্য প্রতিনিয়ত জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছেন রংপুরের কাউনিয়ার এই যুবক।
কাউনিয়া উপজেলার দক্ষিণ মধামোদন এলাকার  আব্দুল করিমের ছেলে ৩২ বছর বয়সি একরামুল হকের জীবন যেন প্রতিদিনের সংগ্রামের আরেক নাম। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাঁর চলার পথ কঠিন করে তুললেও সংসারের দায়িত্ব তাঁকে থামার সুযোগ দেয়নি।
একরামুলের আয়ের ওপর নির্ভরশীল ছয় সদস্যের পরিবার। তাঁর বাবা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। বোন বিধবা। পরিবারের নানা দায়িত্বও এসে পড়েছে তাঁর কাঁধে। তাই নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতার কথা ভুলে প্রতিদিন জীবিকার সন্ধানে বের হতে হয় তাঁকে।
প্রতিদিন ক্র্যাচ হাতে গাছের কাছে যান একরামুল। এরপর শুরু হয় ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। কষ্ট করে গাছে উঠে ডালপালা কাটেন। কখনো এক গাছ থেকে আরেক গাছে যেতে হয়। মাটিতে হাঁটাই যেখানে কঠিন, সেখানে গাছের মগডালে উঠে কাজ করা তাঁর জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তা চোখে না দেখলে বোঝার উপায় নেই।
একরামুল বলেন, ‘শরীরের অনেক কষ্ট হয়। গাছে উঠতে ভয়ও লাগে। কিন্তু কাজ না করলে তো সংসার চলে না। একদিন কাজ না করলে ঘরে ভাত থাকে না।’
ঝুঁকিপূর্ণ এই কাজ করে দিনে তাঁর আয় হয় মাত্র ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। কয়েকদিন আগেও গাছের ডাল কাটতে গিয়ে পড়ে আহত হন তিনি। কিন্তু অর্থের অভাবে চিকিৎসা কিংবা বিশ্রামের সুযোগ হয়নি। পরিবারের খাবারের চিন্তায় পরদিনই আবার কাজে ফিরতে হয়েছে তাঁকে।
একরামুলের বৃদ্ধ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বাবা আব্দুল করিম  আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমার তো চোখে অন্ধকার, নিজে তো কিছুই করতে পারি না। এই পোলাডার (একরামুল) পা দুইটা নষ্ট। তবুও পেটের দায়ে ওরে প্রতিদিন গাছের মগডালে উঠতে হয়। বাপ হইয়া সন্তানের এই মৃত্যুঝুঁকি দেইখা বুক ফাইটা যায়। যদি একটা স্থায়ী কিছু হইত, তাইলে আমার পোলাটার এই নরকযন্ত্রণা লাঘব হইত।’
একরামুলের স্ত্রী  হাসনা বানু বলেন, ‘প্রতিদিন যখন ও বাড়ি থেইকা গাছে উইঠা যায়, বুকটা ভয়ে ফাইয়া আসে। মনে হয়, এই বুঝি একটা খারাপ খবর পামু। কিন্তু কী করব? ঘরে চাউল নাই, চুলা জ্বলে না। কাজ না করলে তো না খাইয়া মরতে হইব।’
 আমজাদ হোসেন নামে একজন প্রতিবেশী  বলেন, ‘একরামুল খুব সৎ ও পরিশ্রমী ছেলে। প্রতিবন্ধিতাকে হার মানিয়ে সে সংসার চালানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু গাছের মগডালে ও যেভাবে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে, যেকোনো দিন বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। আমরা স্থানীয়ভাবে সাময়িকভাবে সহযোগিতা করলেও স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। সরকারের উচিত তাঁর পাশে দাঁড়ানো।’
একরামুল বলেন, ‘আমি চাই একটা স্থায়ী কাজ। তাহলে আর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গাছে উঠতে হবে না। সরকার ও সমাজের বিত্তবান মানুষ যদি আমার দিকে একটু তাকান, তাহলে আমার পরিবারটা বাঁচবে।’
একরামুলের স্বপ্ন খুব বড় নয়—জীবনের ঝুঁকি ছাড়া একটি স্থায়ী কাজ, পরিবারের জন্য দুবেলা খাবারের নিশ্চয়তা আর স্বজনদের মুখে হাসি। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের পথেই প্রতিদিন তাঁকে লড়তে হচ্ছে নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতা ও দারিদ্র্যের সঙ্গে।
ক্র্যাচে ভর দিয়ে যে মানুষটির মাটিতে হাঁটাই কঠিন, অভাবের তাড়নায় তাকেই প্রতিদিন উঠতে হয় গাছের মগডালে। একটি দুর্ঘটনাই কেড়ে নিতে পারে তাঁর জীবন। তবুও পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে ঝুঁকি নিয়েই চলছে একরামুলের জীবনসংগ্রাম।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক সকালের বাণী
Theme Designed BY Kh Raad ( Frilix Group )