
রাজধানীর ভাটারা থানার মাদানী অ্যাভিনিউয়ের ১০০ ফিট সড়ক। নামেই ১০০ ফিট, বাস্তবে কোথাও কোথাও যান চলাচলের জায়গা অবশিষ্ট মাত্র ১০ ফুট। সড়কের দুই পাশজুড়ে সারি সারি অস্থায়ী দোকান, এক পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে রাখা অটোরিকশা, অন্যদিকে যত্রতত্র ব্যক্তিগত গাড়ি পার্কিং। সব মিলিয়ে ব্যস্ত এই সড়কটির বড় অংশই কার্যত দখলে। অথচ এসব দেখার যেন কেউ নেই।
সড়ক দখল, অবৈধ পার্কিং ও অটোরিকশার স্ট্যান্ড নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। পথচারীদের চলাচলে দুর্ভোগ, যানবাহনের দীর্ঘ সারি আর প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকি—সবই দৃশ্যমান। বিভিন্ন সময়ে সড়ক দখলের চিত্র সামনে এলেও পরিস্থিতির স্থায়ী পরিবর্তন নেই। প্রশ্ন উঠেছে, প্রকাশ্যেই সড়ক দখল করে দোকান বসানো ও যানবাহন পার্কিং চললেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না কেন?
সরেজমিনে দেখা যায়, ফুটপাতের সীমানা পেরিয়ে মূল সড়কের ওপর তিন থেকে চার সারিতে বসানো হয়েছে অস্থায়ী দোকানপাট। কোথাও পণ্য সাজিয়ে, কোথাও দোকানের সরঞ্জাম রেখে দখল করা হয়েছে সড়কের বড় অংশ। অন্যদিকে সড়কের এক পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে অটোরিকশা। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে ব্যক্তিগত গাড়ি ও অন্যান্য যানবাহন পার্ক করে রাখায় চলাচলের জায়গা আরও কমে গেছে।
স্থানীয়দের দাবি, ১০০ ফিট প্রশস্ততার এই সড়কের প্রায় ৯০ ফুটই কোনো না কোনোভাবে দখলে থাকছে। ফলে কোনো কোনো জায়গায় যানবাহন চলাচলের জন্য অবশিষ্ট থাকছে মাত্র ১০ ফুট। প্রশস্ত সড়ক থাকা সত্ত্বেও যানবাহনকে চলতে হচ্ছে সংকীর্ণ পথে। সামান্য চাপ বাড়লেই তৈরি হচ্ছে যানজট।
সড়কটির এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন পথচারীরা। ফুটপাত দখল হয়ে থাকায় বাধ্য হয়ে তাঁদের হাঁটতে হচ্ছে মূল সড়কের ওপর দিয়ে। পাশ দিয়ে দ্রুতগতিতে চলছে মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি ও অন্যান্য যানবাহন। এতে যেকোনো সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। নারী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য ঝুঁকি আরও বেশি। সন্ধ্যা ও রাতে মানুষের চলাচল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি হয়ে উঠছে আরও বিপজ্জনক।
যানজটও যেন এই সড়কের নিত্যদিনের সঙ্গী। সকাল, দুপুর, বিকেল কিংবা সন্ধ্যা—কোনো নির্দিষ্ট সময়েই স্বস্তি মিলছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। সড়কের একাংশ হকারদের দখলে, অন্য অংশে অটোরিকশার স্ট্যান্ড ও অবৈধ পার্কিং। ফলে স্বাভাবিক গতিতে যানবাহন চলার সুযোগ থাকছে না। স্বল্প দূরত্ব অতিক্রম করতেও যাত্রীদের ব্যয় করতে হচ্ছে অতিরিক্ত সময়।
১০০ ফিট সড়কসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা মো. সিরাজ মিয়া বলেন, ‘ফুটপাতের কারণে মানুষজন চলাফেরায় যে কষ্ট হচ্ছে, এটা তো প্রতিদিনের ভোগান্তি। সকাল নাই, সন্ধ্যা নাই, বিকাল নাই, দুপুর নাই—সব সময় যানজট লেগে থাকে শুধু ফুটপাতের কারণে আর অবৈধ অটোরিকশার স্ট্যান্ডের জন্য।’
স্থানীয়দের প্রশ্ন, একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের এত বড় অংশ দখল হয়ে থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি কোথায়? ফুটপাত ও সড়ক দখল করে দিনের পর দিন ব্যবসা পরিচালনা, সড়কের পাশে অটোরিকশা দাঁড় করিয়ে রাখা এবং যত্রতত্র পার্কিংয়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে কীভাবে? নিয়মিত তদারকি ও আইন প্রয়োগ থাকলে এমন পরিস্থিতি দীর্ঘদিন চলার কথা নয় বলে মনে করেন তাঁরা।
সড়ক দখলমুক্ত করার দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একদিকে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, অন্যদিকে অবৈধ দখল উচ্ছেদ—দুই ক্ষেত্রেই কার্যকর উদ্যোগের প্রয়োজন। শুধু যানজট নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে সড়কের মূল জায়গা দখলমুক্ত করা না গেলে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। একইভাবে একবার উচ্ছেদ করে নিয়মিত নজরদারি না থাকলে আবারও দখল ফিরে আসার আশঙ্কা থাকে।
এ বিষয়ে ডিএমপি ট্রাফিক গুলশান বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. তারেক জুবায়ের বলেন, ১০০ ফিট সড়ক দখল করে বিভিন্ন দোকান বসানোর বিষয়টি তাঁদের নজরদারিতে রয়েছে। পূজার নিরাপত্তা নিয়ে সবাই ব্যস্ত থাকায় আপাতত এ বিষয়ে কার্যক্রম নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। পূজা শেষ হলে ক্রাইম ডিভিশনের সমন্বয়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে পুরো সড়ক দখলমুক্ত করা হবে।
তবে স্থানীয়দের প্রত্যাশা, আশ্বাসের মধ্যে যেন সীমাবদ্ধ না থাকে উচ্ছেদ কার্যক্রম। সড়কটি হকার, অবৈধ পার্কিং ও অটোরিকশার দখল থেকে মুক্ত করে পথচারী ও যানবাহনের স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করা হোক। একই সঙ্গে নিয়মিত নজরদারির মাধ্যমে পুনরায় দখল ঠেকানোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
১০০ ফিট সড়কের প্রায় ৯০ ফুটই যদি দখলে থাকে, তাহলে সেই দখলমুক্ত করার দায়িত্ব কার? জনসাধারণের চলাচলের জায়গা ফিরিয়ে দিতে আর কত দিন অপেক্ষা করতে হবে? স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন—সড়কটি দখলমুক্ত করার মতো কি কেউ নেই?
Related