


রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীদের খাবারের মান আর স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে অনিয়ম যেনো দিন দিন নিয়মে পরিণত হচ্ছে। উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নের জনসাধারণের চিকিৎসাসেবার বাতিঘর এই হাসপাতাল। অথচ হাসপাতালটি নানান সমস্যা আর অনিয়মে জর্জরিত। নিস্নমানের খাবার, চিকিৎসক সংকট, যত্রতত্র ময়লার ভাগাড়, আর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা স্বাস্থ্য ঝুকির পাশাপাশি ভোগেন পুষ্টিহীনতায়। এছাড়াও নোংরা শৌচাগার, পরিচ্ছন্নতার অভাব, জমে থাকা নোংরা পানির দুর্গন্ধে রোগী ও স্বজনরা অতিষ্ট।
কথা হয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মমিন মিয়ার সাথে। তিনি জানান, ৫ দিন ধরে চিকিৎসা নিচ্ছেন। খাবারের মান খারাপ হওয়ায় খেতে পারছেন না। তিনি মনে করেন, সবচেয়ে নিম্নমানের খাবার দেওয়া হয় এই হাসপাতালে। মিরকে মাছকে রুই মাছ, আর ব্রয়লার মুরগির মাংস দেশী মুরগী বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। এমন খাবারে কপালে চিন্তার ভাঁজ তার। সামর্থ্য না থাকায় প্রতিদিনের মত আজও তাকে থাকতে হবে আধপেটা।
সরেজমিনে জানা গেছে, মিঠাপুকুর ৫০ শয্যা হাসপাতালে রোগীদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি খাবার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই চলছে অনিয়ম-দুর্নীতি। বড় মাছের পরিবর্তে ছোট কার্প জাতীয় সস্তা মাছ, মাংসের আকার বরাদ্দের তিন ভাগের একভাগ, নিম্ন মানের চালের ভাত দেয়া হয় রোগীদের। এছাড়া হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চোখে ধুলা দিয়ে অতিরিক্ত রোগী দেখিয়ে কৌশলে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রতিদিন সকালে ভর্তি রোগীদের বিপরীতে খাদ্য তালিকা দেয়া হয়। ওয়ার্ডে যেসব নতুন রোগী ভর্তি হন ডায়েটে পরদিন নাম ওঠে তাদের। ফলে ভর্তির দিন রোগী খাবার পান না। আবার ছাড়পত্র পাওয়া রোগী দুপুর ও রাতের খাবার পান না। শুভঙ্করের ফাঁকি এখানেই। দুপুরের আগে চলে যাওয়া রোগীদের খাবারের পুরো অর্থই চলে যায় সিন্ডিকেটের পকেটে।
অথচ সিদ্দিকা নামে রেজিস্টারকৃত এক রোগী দুদিন হলো হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন কিন্তু তিনি খাবার পায়নি। একই অভিযোগ গোলাপি বেগম নামে আরেক রোগীর। তিনি জানান, সকালে ভর্তি হয়েছে কিন্তু দুপুর ও রাতে তাকে খাবার দেওয়া হয়নি। রাতেও খাবার পাবেন কিনা নিশ্চিত নয় তিনি। আরেক রোগী রেহেনা বেগম হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ৩ দিন অতিবাহিত হলেও কোন খাবার পায়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের এক কর্মচারী বলেন, নিয়ম হলো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রোগীর প্রতিদিনের খাবার বুঝে নেবে। কিন্তু এই হাসপাতালে তা হয় না। কোনো নজরদারি নেই। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাদের ইচ্ছামাফিক খাবার সরবরাহ করে।
হাসপাতালে খাবার সরবরাহকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মের্সার্স বাঁধন ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী শাহাজাহান আলী বলেন, এমনটা হওয়ার কথা নয়। রোগীদের খাবার ঠিকঠাকভাবে দেওয়া হয়। তবে আরও ভালো খাবার দেওয়ার চেষ্টা করবো।
আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাঃ মিজানুর রহমান বলেন, হাসপাতালের খাবারের বিষয়ে আমি নিজেও সন্তুষ্ট ছিলাম না। ঠিকাদারের সাথে যোগাযোগ করে বিষয়টা অবগত করেছি। আমাদের ৫০ শয্যার হাসপাতাল। অনেক বড় উপজেলা সবসময় ৬০ থেকে ৭০ জন রোগী ভর্তি থাকে। ৫০ জন রোগী রেজিস্টারকৃত খাবার পাবে। এছাড়াও অতিরিক্ত আরও ৫ জন খাবার পাওয়ার কথা। এরচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি থাকলেও খাবার পাবে কিনা আমার জানা নেই।
মিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ রাশেবুল হোসেন বলেন, মিঠাপুকুর অনেক বড় উপজেলা। অন্যান্য উপজেলার তুলনায় এখানে চিকিৎসক সংকট রয়েছে। পরিচ্ছন্নতা কর্মী আছে মাত্র এক জন। যেখানে চারজন থাকার কথা। এক জন দিয়ে যতটুকু সম্ভব সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। খাবারের মান আমি নিজেও যাচাই করেছি। ভাতের চাল নিয়ে একটু সমস্যা রয়েছে। সেটা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বলা হয়েছে।