


রংপুরে হৃদযন্ত্রে রিং পরানোর সময় ভুল চিকিৎসায় এক রোগীর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিরুদ্ধে। মৃত্যুর পর ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে গেলে স্বজনরা প্রতিবাদ জানালে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। এমনকি সাংবাদিকদেরও ঘুষ দিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
নিহত মোকছেদুল ইসলাম (৫২) নীলফামারীর ডোমার উপজেলার বাসিন্দা। তিনি বৃহস্পতিবার সকালে বুকে ব্যথা অনুভব করলে কার্ডিওলজিস্ট ডা. আবু জাহিদ বসুনিয়ার পরামর্শে রংপুর কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। দুপুরের দিকে চিকিৎসক তার এনজিওগ্রাম করেন এবং দ্রুত রিং পরানোর পরামর্শ দেন। পরিবারের দাবি, চিকিৎসক পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যদের না জানিয়ে, কেবল অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলের স্বাক্ষর নিয়ে তড়িঘড়ি করে রিং পরানোর সিদ্ধান্ত নেন। পরে অপারেশনের সময়েই রোগীর মৃত্যু হয়। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গোপন রেখে আইসিইউতে তাকে ‘জীবিত’ দেখানোর চেষ্টা করে।
রোগীর ছেলে জানান, আমি বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলাম, হঠাৎ বাবার চিৎকার শুনে ভেতরে যাই। তখনই আমাকে এক কাগজে সই করতে বলে। আমি সই করার পর বাবাকে আইসিইউতে নিয়ে যায় তারা। কিছু সময় পর বলে অবস্থা ভালো না, কিন্তু আসলে তখনই বাবা মারা গেছেন। এদিকে, ঘটনার পর মোকছেদুল ইসলামের শ্যালক হুমায়ুন কবির ফেসবুক লাইভে এসে প্রতিবাদ জানাতে গেলে হাসপাতালের কর্মচারী ও তাদের সহযোগীরা তার ওপর হামলা চালায়, ফোন কেড়ে নেয় এবং টেনে-হিঁচড়ে নিচে নিয়ে গিয়ে বেধড়ক মারধর করে। হুমায়ুন কবির বলেন, দুলাভাই মারা গেছেন শুনে আমি লাইভে প্রতিবাদ জানাতে গেলে তারা প্রথমে বাঁধা দেয়। কিছুক্ষণ পর কয়েকজন এসে আমার ফোন কেড়ে নেয়, পরে টেনে নিচে নিয়ে প্রচণ্ড মারধর করে। আমি তখন কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না।
এ সময় হাসপাতালের সামনে বিক্ষোভে যোগ দিতে আসা রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থীরাও হামলার শিকার হন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। খবর পেয়ে কোতোয়ালি থানা পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। নিহতের এক নিকটাত্মীয় অভিযোগ করে বলেন, চিকিৎসকের অবহেলা না হলে আমার ভাইয়ের মৃত্যু হতো না। তারা আমাদের কিছু না জানিয়ে রিং পরানোর সিদ্ধান্ত নেয়, পরে মৃত্যুর পরও সেটি গোপন রাখতে চেয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ঘটনার পর সাংবাদিকরা হাসপাতালে গিয়ে জানতে চাইলে একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা মেরাজ মহসিন প্রথমে কোনো বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান। পরে সাংবাদিকদের একটি কক্ষে নিয়ে প্রায় ২০ মিনিট বসিয়ে রাখেন। এরপর নিজের ওয়ালেট থেকে ২৫ হাজার টাকা বের করে অন্য এক কর্মকর্তার হাতে দিয়ে সাংবাদিকদের দিতে বলেন, যাতে তারা খবরটি প্রকাশ না করে। উপস্থিত সাংবাদিকরা সঙ্গে সঙ্গে এর প্রতিবাদ জানিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে আসেন।
রাত গভীরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একটি প্রেস ব্রিফিং ডেকে নিজেদের দায় অস্বীকার করে জানায়, চিকিৎসায় কোনো ত্রুটি ছিল না, সব নিয়ম মেনেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। তবে তদন্ত কমিটি গঠন বা প্রশাসনের অবহেলা বিষয়ে জানতে চাইলে তারা শুধু বলেন, আমরা ডেথ রেকর্ড তৈরি করবো। এদিকে, মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেটিজেনদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। অনেকে এটিকে “চিকিৎসার নামে হত্যাকাণ্ড” হিসেবে উল্লেখ করে নিন্দা জানান। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থীরাও দ্রুত ঘটনার তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক এবং হাসপাতাল কতৃপক্ষের বিচারের দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজ বলছে, এ ধরনের ঘটনা শুধু চিকিৎসা ক্ষেত্রের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করে না বরং হাসপাতালের প্রশাসনিক ত্রুটি ও মনিটরিং ব্যবস্থার দুর্বলতাকেও সামনে আনে। তারা বলেন, প্রতিটি প্রাইভেট হাসপাতাল যেন রোগী নয়, মুনাফার কেন্দ্র হয়ে উঠছে- এ ঘটনার মধ্য দিয়ে সেটিই আবারও প্রমাণিত হলো।