মঙ্গলবার (৯ ডিসেম্বর) বিকেল সাড়ে ৫ টায় শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী নাকুগাঁও স্থলবন্দর দিয়ে তারা দেশে ফেরেন বলে জানা গেছে। এ সময় ময়মনসিংহ ব্যাটালিয়ন (৩৯) বিজিবি, ভারতীয় পুলিশ ও বাংলাদেশ ইমিগ্রেশন পুলিশ সদস্যগণ উপস্থিত ছিলেন।
কারাভোগী জেলেরা হলেন, চিলমারী উপজেলার ৪ নং রমনা মডেল ইউনিয়ন পরিষদের হরিণের বন্দ এলাকার মো. রাসেল মিয়া (৩৫), ব্যাপারী পাড়া এলাকার বিপ্লব মিয়া (৪৫), মো. মীর জাহান আলী (৪৫), বকুল মিয়া (৩২), মো. আমের আলী (৩৫), রৌমারী উপজেলার বকবাদা এলাকার মো. চাঁন মিয়া (৬০)।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৪ নভেম্বর পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত সীমান্ত ঘেঁষা জিঞ্জিরাম নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে ভুলবশত ভারতের জলসীমায় ঢুকে পড়েন জেলেরা। সে সময় সীমান্ত রক্ষার দায়িত্বে থাকা ভারতীয় বিএসএফ তাদের আটক করে এবং আদালতের নির্দেশনায় মেঘালয় আমপাতি জেলার মাহিন্দগঞ্জের ক্ষণস্থায়ী কেন্দ্রে রাখা হয়। এরপরই শুরু হয় দীর্ঘ ১৩ মাসের অনিশ্চয়তা, কষ্ট আর দেশে ফেরার অপেক্ষার সময়। কারগারে মাসের পর মাস মুক্তির জন্য দিন খুঁজতে থাকেন তাঁরা।
আটকের প্রথম মাসগুলো দেশে ফেরা নিয়ে পরিবারদের জন্য ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। কারও স্বামী, কারও বাবা আবার কারও একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তান নিখোঁজ হয়ে যায় জীবিকার সন্ধান করতে গিয়ে। এরপর পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া। একদিকে পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তিটাকে দেশে ফেরাতে স্থানীয় প্রশাসন সহ ছুটতে হয় নানান জায়গায়। অন্যদিকে নিজের এবং সন্তানের খাবার যোগাতে যেতে হয় কাজের সন্ধানে যেতে হয় এখানে সেখানে। শুরু হয় এক টিকিয়ে থাকার জীবন যুদ্ধ। এরপর নানা জল্পনা কল্পনা অবসান ঘটিয়ে দেশে ফেরানো হয় আটক থাকা জেলেদের। দেশে ফেরার সময় সীমান্তে অপেক্ষায় থাকা স্বজনদের কান্না ও আনন্দের মিশ্র অশ্রু সিক্ত আবেগ চোখে পড়ে।
স্বামী দেশে ফেরার পর কারাবরণ কারী জেলে
বকুল মিয়ার স্ত্রী আজেদা বেগম বলেন, প্রায় এক বছর ধরে আমরা প্রতিদিন পথের ধারে বসে চেয়ে থাকতাম কখন ফিরে আসবে আমার স্বামী। রাতে ঘুম হত না, দিন চলত না। একটা করে দিন আমার কাছে মনে হত একটা বছর। আজ যখন তাকে নিরাপদে দেখছি, চোখের জল আমার থামছে না। আল্লাহকে ধন্যবাদ, আমাদের প্রার্থনা সাড়া দিয়েছেন।
রমনা ব্যাপারী পাড়ার মীর জাহানের স্ত্রী মোছা. ববিতা বেগম বলেন, ‘আমার স্বামীর খোঁজ না পেলে আমরা বাঁচার আশা হারিয়ে ফেলতাম। একেক দিন যেন একেকটি অশান্তির সাগর পেরিয়ে যাচ্ছিলাম। আজ সে ফিরে এসেছে, সব কষ্ট যেন এক মুহূর্তেই দূর হয়ে গেল। স্বজনের কাছে ফিরে আসা এই আনন্দ কখনো ভুলব না।
স্থানীয় সংবাদকর্মী সাওরাত হোসেন সোহেল বলছেন, যেহেতু আইনের প্রতি আমরা সবাই শ্রদ্ধাশীল। পরবর্তীতে পার্শ্ববর্তী দেশে মাছ শিকারের জন্য গেলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের দিকে অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে। আর যেহেতু ১৩ মাস কারাভোগের পর তারা দেশে ফিরছেন স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যান কে অনুরোধ করবো তাদের পুনর্বাসনের জন্য সহযোগিতা করার।
রমনা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান গোলাম আঁশেক আঁকা বলেন, কারাগারে থাকাকালীন তাদের পরিবারকে বিভিন্ন সময় সহযোগিতা করেছি। তারা যেহেতু দেশে ফিরেছেন ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে যতটুক পারি সহযোগিতা করবো।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইউএনও সবুজ কুমার বসাক জানান, জেলেরা আটকের পর জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অবগত করা হয়। দীর্ঘ ১৩ মাস পর আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তাছাড়া গতকাল রমনা ঘাটে আমি নিজেই তাদের রিসিভ করছি। এসময় তাদের সাথে কথা হয়েছে তাদের যে সমস্যা গুলো আমরা দেখবো। আমাদের জায়গা থেকে যতটুকু পারি দেখবো সমস্যা নেই।
শেরপুর সীমান্তে জেলেদের গ্রহণে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন, সমাজকর্মী মাজু ইব্রাহিম, শাহ্ আলম, হুমায়ুন কবির ও রেজাউল করিম।