


ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বিতর্কিত নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস ও শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ব্যানারে চলমান উত্তাল ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে এবার এসে পড়েছেন এক গ্ল্যামারাস ও প্রভাবশালী নারী পুলিশ কর্মকর্তা! দাঙ্গা ও জনতা নিয়ন্ত্রণের বিশেষায়িত বাহিনী র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের (RAF) অ্যাসিস্ট্যান্ট কমান্ড্যান্ট সোনিয়া সহরাওয়াতকে নিয়ে এখন সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে প্রশাসনিক মহলে জোর বিতর্ক ও চর্চা চলছে।
ইন্টারনেটের ভাষায় হরিয়ানার এই পুলিশ কর্মকর্তা এরই মধ্যে এক বিরাট ‘ভাইরাল স্টার’। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ইনস্টাগ্রামে তার অনুসারীর সংখ্যা ৬ লাখেরও বেশি। তবে চলতি সপ্তাহে নিট প্রশ্নফাঁস নিয়ে শিক্ষার্থীদের ‘সংসদ চলো’ পদযাত্রায় পুলিশি ক্র্যাকডাউনের পর এক বিতর্কিত পোস্ট দিয়ে তিনি এক লহমায় পুরো ভারতের জাতীয় শিরোনামে চলে এসেছেন।
চলতি ‘বাদল’ অধিবেশনের উদ্বোধনী দিনে ভারতের পার্লামেন্ট অভিমুখে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর মিছিলে টিয়ারগ্যাস ও লাঠিচার্জের ঘটনা ঘটে, যা পরবর্তী সময়ে বিশাল রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে রূপ নেয়। দাঙ্গা দমন দলের অংশ হিসেবে ঘটনাস্থলে নিয়োজিত ছিলেন আরএএফ (RAF)-এর এই অ্যাসিস্ট্যান্ট কমান্ড্যান্ট। কিন্তু ডিউটিতে থাকাকালীন তিনি নিজের ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্য করে এক বিতর্কিত প্রতিক্রিয়া জানান।
একটি মৃত তেলাপোকার ছবি শেয়ার করে ক্যাপশনে সোনিয়া লেখেন, নিজেরা নিজেদের ঠিক করতে পারে না, আর এসেছে দেশ ঠিক করতে!
তার এই পোস্ট প্রকাশ্যে আসতেই নেটপাড়ায় তীব্র ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। চতুর্দিক থেকে সমালোচনা ও তোপের মুখে পড়ে শেষমেশ স্টোরিটি ডিলিট করতে বাধ্য হন এই নারী অফিসার।
সোনিয়া সহরাওয়াতের এই কটাক্ষের কড়া জবাব দিয়ে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) সামাজিক মাধ্যম এক্স (পূর্বে টুইটার)-এ লেখে, অত্যন্ত মর্মান্তিক ও লজ্জাজনক! এই আরএএফ কর্মকর্তা আসলে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের তেলাপোকা হিসেবে দেখছেন এবং মনে করছেন যে পুলিশের এই বর্বরতা ও নৃশংসতা সম্পূর্ণ যুক্তিসঙ্গত। এর পরপরই ব্যাঙ্গাত্মক সুর চড়িয়ে সিজেপি আরও যোগ করে, তবে শুনে রাখুন, আমরা কিন্তু তেলাপোকা! আর তেলাপোকাদের সহজে মার ফেলা যায় না, তারা কখনো ধ্বংস হয়ে যায় না!
সোনিয়ার বিরুদ্ধে সরকারি চাকরির নিয়ম লঙ্ঘন ও ড্রেসকোড বিতর্ক
আইন ও চাকরিবিধি অনুসারে, একজন সরকারি কর্মকর্তার জন্য জাতিগত বিদ্বেষ ছড়ানো, ব্যক্তিগত অপমানজনক মন্তব্য করা, অশ্লীলতা প্রদর্শন কিংবা সরকারি কর্মচারীর জন্য অগ্রহণযোগ্য কোনো আচরণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সোনিয়া সহরাওয়াতের এই কট্টর রাজনৈতিক মন্তব্য সার্ভিস রুলসের স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মনে করা হচ্ছে।
ডিজিটাল নিউজ প্ল্যাটফর্ম দ্য প্রিন্ট-কে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে হলেও ডিউটিতে নিয়োজিত অবস্থায় এমন রাজনৈতিক মন্তব্য করা একটি গুরুতর শৃঙ্খলাভঙ্গের শামিল। দেখা যাক, বাহিনীর শীর্ষ মহল এই বিষয়টি আমলে নিয়ে তার বিরুদ্ধে কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেয় কি না।
শুধু তা-ই নয়, অফিশিয়াল সার্ভিস রুলস অনুযায়ী ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপের মতো ব্যক্তিগত প্ল্যাটফর্মে ইউনিফর্ম পরা প্রোফাইল পিকচার ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করা হয়। অথচ সোনিয়া সহরাওয়াতের ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেলের নাম ‘3star_Sonia’, যেখানে তার প্রোফাইল পিকচারে সরকারি ইউনিফর্ম পরা ছবি শোভা পাচ্ছে।
আবেদনময়ী রূপ ও ইনস্টাগ্রামের গ্ল্যামারাস জীবন
ঘটনাবহুল এই বিতর্কের মধ্যেই তার সাম্প্রতিকতম পোস্ট আসে প্রায় ২৩ ঘণ্টা আগে। কালো রঙের ক্রপ টপ ও ক্যানারি ইয়োলো স্কার্ট পরে একটি নজরকাড়া পোজের ছবির ক্যাপশনে তিনি লেখেন ‘সীরাত’ (Seerat), যার সরল অর্থ- ‘ভেতরের সৌন্দর্য’।
তার ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইলে একটু চোখ বুলালেই তাকে নানান রূপে দেখা যায়। কখনো মন্দির দর্শন, কখনো রেট্রো রোমান্টিক স্টাইলে, কখনো আকর্ষণীয় শাড়িতে, আবার কখনো রোদ চশমা চেপে বাইক রাইডিং, ব্যায়াম করা কিংবা ছোট ছোট ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে দেখা করার নানান মুহূর্ত।
অন্য একটি জনপ্রিয় পোস্টে, মিডনাইট নেভি রঙের ট্যাঙ্ক টপ ও কালো ডেনিম জিন্স পরে সমুদ্র সৈকতে হাওয়ায় দুলতে দেখা গেছে তাকে। ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছিল শাহরুখ খানের ‘রইস’ সিনেমার জনপ্রিয় গান ‘লায়লা’। গত ১৬ জুলাই সেই পোস্টের ক্যাপশনে সোনিয়া লিখেছিলেন, ‘এই স্বাধীনতার দাম অনেক বেশি, কিন্তু এই হাসি অমূল্য। তাই চোখের জল মুছে ফেলুন আর আনন্দ ছড়িয়ে দিন।’
এর আগে ১৪ জুলাইয়ের অন্য একটি পোস্টে তাকে একটি স্থানীয় বাজারে হেঁটে যাওয়ার সময় বলতে শোনা যায়, দোকানদাররা নাকি তাকে ‘বিদেশি পর্যটক’ ভেবে ভুল করছেন। অন্য এক পোস্টে তার খোলামেলা বার্তা, নিজের মনোভাবকে গর্বের সঙ্গে পরায়ন করুন, এটাকে লোডেড মেসেজের মতো নিজের করে নিন।’ এর বাইরে কলিযুগ, সত্যযুগ ও ভগবান শিবকে নিয়েও তার অ্যাকাউন্টে একাধিক ধর্মীয় পোস্ট রয়েছে।
বাহিনীতে অস্বস্তি ও সোনিয়ার পাল্টা অভিযোগ
সোনিয়া সহরাওয়াতের এই গ্ল্যামারাস উপস্থিতি ও সাম্প্রতিক বিতর্কিত পোস্ট নিয়ে সিআরপিএফ (CRPF) এবং আরএএফ (RAF)-এর অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তা ও জোয়ানদের মধ্যেও ব্যাপক গুঞ্জন ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
দ্য প্রিন্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এক সিআরপিএফ কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এই ধরনের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট বাহিনীর ভাবমূর্তি ভীষণভাবে ক্ষুণ্ন করছে। আমরা একটি পেশাদার ইউনিট, আর আমাদের মূল দায়িত্ব হলো জনতা নিয়ন্ত্রণ করা ও দাঙ্গার মতো বিপজ্জনক পরিস্থিতি সামাল দেওয়া।
এদিকে, নিজের গ্ল্যামারাস ইমেজের পেছনে থাকা এক লড়াকু গল্প তুলে ধরেছেন সোনিয়া। ‘উইন লাইফ লাইক এ ওয়ারিয়র’ পডকাস্টে কথা বলার সময় তিনি জানান যে, প্রশিক্ষণ চলাকালীন তিনি মারাত্মক চোট পেয়েছিলেন ও তার শরীরে ৫২টি সেলাই দিতে হয়েছিল। সেই ভয়াবহ চোট কাটিয়ে উঠে তিনি ট্রেনিং সম্পন্ন করেন, যাকে তিনি নিজের ক্যারিয়ারের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত বলে দাবি করেন।
অন্যদিকে, যন্তর মন্তরের সংঘর্ষের ঘটনা নিয়ে এনডিটিভি-কে দেওয়া এক এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে নিজের অবস্থান সাফাই করেছেন এই নারী অফিসার। আন্দোলনে ‘উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তি’ ও ‘সমাজবিরোধী উপাদান’ ঢুকে পড়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।
হাতে প্লাস্টার পরা অবস্থায় এনডিটিভি-কে সোনিয়া বলেন, সেখানে সাধারণ শিক্ষার্থী ও আন্দোলনকারীদের বিশাল সমাবেশ ছিল ঠিকই, কিন্তু তাদের আড়ালে লুকিয়ে ছিল একদল উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তি ও একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সদস্যরা। সমাজবিরোধী উপাদানে পরিণত হওয়া ওই ব্যক্তিরা আমাদের লক্ষ্য করে পাথর, জুতো ও কাঁচের বোতল ছুঁড়ে মেরেছেন।
ঘাড়ে নখের আঁচড়ের দাগ দেখিয়ে তিনি অভিযোগ করেন, বিক্ষোভকারীরা আমাদের ওপর নখ দিয়ে আঁচড়ে পর্যন্ত দিয়েছে। হাত ভেঙে যাওয়ার ব্যাখা দিয়ে তিনি জানান, আন্দোলনের মধ্যে থাকা সাধারণ নারী বিক্ষোভকারীদের বাঁচাতে গিয়েই আমি হাতে মারাত্মক আঘাত পেয়েছি।