1. [email protected] : Md Hozrot Ali : Md Hozrot Ali
  2. [email protected] : Sokaler Bani : Iqbal Sumon
  3. [email protected] : Md Hozrot Ali : Md Hozrot Ali
মক্কা চুক্তি: ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের পাশাপাশি ঝুঁকিতে অন্য সমীকরণও | দৈনিক সকালের বাণী
বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ১১:১৫ পূর্বাহ্ন

মক্কা চুক্তি: ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের পাশাপাশি ঝুঁকিতে অন্য সমীকরণও

ঢাকা অফিস
  • আপলোডের সময় : বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৪ জন দেখেছেন

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি ‘মক্কা চুক্তি’ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন এক কৌশলগত প্রশ্ন সামনে এনেছে। এই চুক্তিতে বাংলাদেশকে যুক্ত করার বিষয়ে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে আমন্ত্রণের কথা জানা যাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে দেশের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত এই জোটে যুক্ত হলে এর প্রভাব শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তা নীতিতে নয়, ভারতসহ গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কেও পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামী দেশগুলোর মধ্যে কোনো নিরাপত্তা জোট গড়ে উঠলে বাংলাদেশ তাতে অংশ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের বলেছেন, এ ধরনের উদ্যোগকে ঢাকা ইতিবাচকভাবে দেখছে। তিনি জানান, বাংলাদেশের নেতৃত্ব, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এই উদ্যোগে অংশ নেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, সৌদি আরব বাংলাদেশকে মক্কা চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তবে আমন্ত্রণটি ঠিক কখন দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি। গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি না থাকায় ওই সূত্র পরিচয় প্রকাশ করতে চায়নি।

চলতি মাসে সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতার এই চুক্তিতে সই করে। চুক্তির কাঠামো অনেকটা ন্যাটোর যৌথ প্রতিরক্ষা নীতির আদলে তৈরি। অর্থাৎ কোনো সদস্য দেশের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে জোটের সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার অঙ্গীকার করা হয়েছে।

এই জোটে তিনটি দেশের সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা ভিন্ন হলেও তাদের সম্মিলিত শক্তি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। তুরস্ক ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তি, পাকিস্তান পারমাণবিক অস্ত্রধারী এবং সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ও সংঘাতের মধ্যেই এমন একটি প্রতিরক্ষা কাঠামোর আত্মপ্রকাশ আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

তুরস্কের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে অন্য দেশকে এই চুক্তির আওতায় যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের বিষয়টি কেবল দ্বিপক্ষীয় বা আঞ্চলিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক হিসাবও জড়িয়ে আছে।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট সামরিক ব্লকের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না হয়ে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক নীতি অনুসরণ করে আসছে। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারের সঙ্গে একযোগে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখাই ঢাকার অন্যতম লক্ষ্য।

এই অবস্থায় একটি সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের প্রচলিত পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের বার্তা দিতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের অর্থনীতি যখন রপ্তানি, বিদেশি বিনিয়োগ ও প্রবাসী আয়ের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, তখন কোনো সামরিক জোটে যুক্ত হওয়ার সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়াও বিবেচনায় নিতে হবে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বড় বাজার যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে কর্মরত লাখ লাখ বাংলাদেশির পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ফলে নিরাপত্তা বা প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কোনো সিদ্ধান্ত যাতে বাণিজ্য ও শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে, সেটিও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার বিষয়।

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক কল্লোল কিবরিয়ার মতে, বাংলাদেশ কোনো সামরিক জোটে যুক্ত হলে ভারতের পাশাপাশি চীন, ইরান, জাপান, কুয়েত, ওমান, কাতার, রাশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নতুন হিসাব তৈরি হতে পারে। তার মতে, এসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক তাৎক্ষণিকভাবে ভেঙে পড়বে—এমন নয়; কিন্তু বাংলাদেশ কোন পক্ষের অবস্থানে রয়েছে, সেই প্রশ্নটি তখন সামনে চলে আসবে।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়গুলোর একটি হতে পারে ভারতের প্রতিক্রিয়া। বর্তমানে দুই দেশের সম্পর্ক নানা ইস্যুতে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশে মানুষকে জোর করে পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবিও জানিয়ে আসছে ঢাকা।

শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। তার প্রত্যর্পণের বিষয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হলেও এখনো ভারতের চূড়ান্ত জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে ঢাকা। এর মধ্যে মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশ যুক্ত হলে ভারত বিষয়টিকে কীভাবে দেখবে, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই কূটনৈতিক উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের বিষয়েও এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। অন্যদিকে নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক বক্তব্যের পর তার বাংলাদেশে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিবেশ নিয়ে ঢাকার পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হয়েছে। ফলে দুই দেশের সম্পর্ক যখন এমনিতেই স্পর্শকাতর অবস্থায় রয়েছে, তখন পাকিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করে গঠিত কোনো প্রতিরক্ষা কাঠামোতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নতুন মাত্রার জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।

মক্কা চুক্তি সম্পর্কে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, নয়াদিল্লি পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তবে বাংলাদেশ এই জোটে যোগ দিলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর এর কী ধরনের প্রভাব পড়বে, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়নের অধ্যাপক আসিফ শাহানের মতে, কোনো সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারণ দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ বহুলাংশে নির্ভর করে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে স্থিতিশীল বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর।

তবে শুধু অন্য দেশ কীভাবে সিদ্ধান্তটিকে দেখবে, সেটিই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণের একমাত্র ভিত্তি হওয়া উচিত নয় বলেও তিনি মনে করেন। বাংলাদেশের নিজস্ব নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রয়োজনও সমানভাবে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা তাই বাংলাদেশের সামনে একটি জটিল ভারসাম্যের প্রশ্ন তৈরি করেছে। একদিকে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ; অন্যদিকে ভারতসহ বৃহৎ শক্তিগুলোর সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখার প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের জন্য এখন মূল প্রশ্ন শুধু মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়া বা না দেওয়া নয়; বরং এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব কি না, যার মাধ্যমে নতুন কৌশলগত অংশীদারিত্ব তৈরি হবে কিন্তু দেশের প্রচলিত ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি, বাণিজ্যিক স্বার্থ ও আঞ্চলিক সম্পর্ক বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে না। ফলে মক্কা চুক্তি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির জন্য নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক সকালের বাণী
Theme Designed BY Kh Raad ( Frilix Group )