1. [email protected] : Md Hozrot Ali : Md Hozrot Ali
  2. [email protected] : Sokaler Bani : Iqbal Sumon
  3. [email protected] : Md Hozrot Ali : Md Hozrot Ali
মেধাবী আবু সাঈদের স্বপ্ন কি অধরাই থেকে যাবে | দৈনিক সকালের বাণী
শনিবার, ০২ মে ২০২৬, ০৯:২৭ পূর্বাহ্ন

মেধাবী আবু সাঈদের স্বপ্ন কি অধরাই থেকে যাবে

ঠাকুরগাঁও অফিস
  • আপলোডের সময় : সোমবার, ১৯ মে, ২০২৫
  • ৩৫৮ জন দেখেছেন
দুচোখে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন পূরণের হাতছানি যখন একেবারে কাছে, তখনই আঁধার নেমে এলো ঠাকুরগাঁওয়ের এক প্রত্যন্ত গ্রামের দরিদ্র পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থী মো. আবু সাঈদের জীবনে। হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়েও অর্থাভাবে ভর্তি হওয়া এখন তার জন্য প্রায় অসম্ভব। ভর্তির শেষ তারিখ আর মাত্র দুদিন। এই কটা দিন যেন তার কাছে একেকটি দীর্ঘশ্বাস।
ঠাকুরগাঁও জেলার রানীশংকৈল উপজেলার নেকমরদ ইউনিয়নের চন্দনচহট ধকরাপট্টির বাসিন্দা আবু সাঈদ। বাবা মো. নাজিম উদ্দিন একজন দিনমজুর। মা মোছা. আনোয়ারা বেগম গৃহিণী। তিন শতকের বসতভিটা ছাড়া আর কিছুই নেই তাদের। খেয়ে না খেয়ে দিন কাটে পরিবারের। এমন অভাবের সংসারেও ছোটবেলা থেকেই আবু সাঈদকে পড়াশোনা করানোর স্বপ্ন দেখতেন তার বাবা-মা।
আবু সাঈদের শিক্ষাজীবন শুরু হয় চন্দনচহট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখানে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে ভর্তি হয় নেকমরদ আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে। এই বিদ্যালয় থেকে সে কৃতিত্বের সাথে মাধ্যমিক (এসএসসি) পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে এবং জিপিএ ৫.০০ অর্জন করে। এরপর উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের পড়াশোনার জন্য ভর্তি হয় ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে। সেখান থেকেও সাফল্যের ধারা অব্যাহত রেখে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় আবু সাঈদ।
দারিদ্র্য যেন ছিল আবু সাঈদের নিত্যসঙ্গী। অভাবের তাড়নায় বাবার সাথে জমিতে কাজও করতে হয়েছে তাকে। তবুও স্কুলের প্রতি তার ছিল অগাধ টান। বাবার সামান্য রোজগার আর মায়ের অক্লান্ত চেষ্টায় নিয়মিত স্কুলে যেত সে।
এসএসসি পরীক্ষার আগে পরিবারের আর্থিক সংকট চরম আকার ধারণ করে। অন্নের সন্ধানে পুরো পরিবার পাড়ি জমায় ঢাকায়। সেখানে একটি স্পিনিং মিলে কাজ করতে শুরু করে আবু সাঈদও। এরই মাঝে ঘোষণা হয় এসএসসি পরীক্ষার সময়সূচি। স্বপ্ন পূরণের আশায় ফের গ্রামে ফিরে আসে সে। শত কষ্টের মাঝেও এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫.০০ অর্জন করে আবু সাঈদ।
ছেলের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সামান্য বসতভিটার চার শতক জমির মধ্যে এক শতক বিক্রি করে দেন বাবা নাজিম উদ্দিন। এইচএসসিতে ভর্তির পর যখন অর্থের অভাব দেখা দেয়, তখন সংসারের হাল ধরতে বাবার সাথে কাজে যোগ দেয় ছোট ভাই ইসমাইলও।
এইচএসসি পরীক্ষার পর ভালো কোথাও ভর্তির জন্য কোচিং করার স্বপ্ন থাকলেও, আর্থিক অভাবে তাকে সেই সুযোগ দেয়নি। নিজের খরচ জোগাতে একটি কোচিং সেন্টারে ক্লাস নিতে শুরু করে আবু সাঈদ। তবে টাকার টানাটানিতে বেশিদিন শহরে থাকতে পারেনি। বাধ্য হয়ে গ্রামেই ফিরে আসে এবং ফের বাবার সাথে দিনমজুরের কাজ শুরু করে।
এই কঠিন পরিস্থিতিতেও দমেনি আবু সাঈদের স্বপ্ন। দিনের বেলায় মাঠে কাজ করত আর রাতের নিস্তব্ধতায় বই নিয়ে বসত। প্রবল ইচ্ছাশক্তির জোরেই হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ‘ডি’ ইউনিটে ৩৯তম স্থান অর্জন করে সে।
স্বপ্ন এখন হাতের মুঠোয়। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থ। ভর্তির জন্য প্রয়োজনীয় টাকা জোগাড় করা তার পরিবারের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব। দিনমজুর বাবার সামান্য রোজগার দিয়ে সংসার চালানোই কঠিন, সেখানে ভর্তির খরচ বহন করা যেন আকাশ কুসুম কল্পনা।
আবেগাপ্লুত বাবা মো. নাজিম উদ্দিন বলেন, “হামি দিন আনি দিন খাই। জমি জমা যা আছিল, পোলাডার পড়ালেখার জন্য বেচে দিছি। এহন আর কিছু নাই বাহে। । কিন্তু ভর্তির টাকা কোটে পামো, সেই চিন্তায় ঘুম আসে না।”
আবু সাঈদের প্রতিবেশী মো. রহমান জানান, “আবু সাঈদ খুব শান্ত ও মেধাবী ছেলে। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় খুব মনযোগী ছিল। ওর এই সাফল্যে আমরা সবাই খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু এখন শুনছি টাকার অভাবে ভর্তি হতে পারবে না। এটা খুবই দুঃখজনক। সমাজের বিত্তবানদের উচিত ছেলেটির পাশে দাঁড়ানো।”
নেকমরদ আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ শাহজালাল জুয়েল বলেন, “আবু সাঈদ আমাদের স্কুলের একজন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিল। সে শুধু পড়াশোনায় ভালো ছিল না, বরং তার আচরণও ছিল অনুকরণীয়। এসএসসি পরীক্ষায় সে অসাধারণ ফল করেছে। আমরা তার এই সাফল্যে গর্বিত। তবে তার ভর্তির জন্য অর্থের অভাবের কথা শুনে আমরা মর্মাহত। আমরা বিশ্বাস করি, সমাজের সহৃদয় ব্যক্তিরা এগিয়ে এসে তার উচ্চশিক্ষার স্বপ্নকে সত্যি করবেন।”
আবু সাঈদের মা আনোয়ারা বেগম চোখের জল মুছতে মুছতে বলেন, “ছোটবেলা থাইকাই পোলাডার খুব শখ পড়ালেখার। হামরা গরিব মানুষ, খাইতো পাই না ঠিকমতো, তাইলে ভর্তির টাকা কোটে পামো বাহে?”
আবু সাঈদ জানায়, চান্স পাওয়ার পর তার মনে যে আনন্দ জেগেছিল, তা এখন ফিকে হয়ে যাচ্ছে অর্থাভাবের চিন্তায়। “বাবা দিনমজুর। উনার পক্ষে এত টাকা জোগাড় করা সম্ভব না। আমার খুব ইচ্ছে ছিল ভালো একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। এখন মনে হচ্ছে, শুধু টাকার অভাবে আমার সেই স্বপ্ন ভেঙে যাবে।” হতাশার সুর তার কণ্ঠে।
এমতাবস্থায়, মেধাবী আবু সাঈদের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। সমাজের হৃদয়বান ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিরা এগিয়ে এলে হয়তো একটি দরিদ্র পরিবারের স্বপ্ন পূরণ হতে পারে। হয়তো আবু সাঈদের হাতেই রচিত হতে পারে নতুন কোনো সাফল্যের গল্প।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক সকালের বাণী
Theme Designed BY Kh Raad ( Frilix Group )