


“জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় গত ৩০ বছর ধরে আমাদের যা উপহার দিচ্ছে তা বেকারত্ব ছাড়া আর কিছুই নয়,”— দেশের প্রচলিত উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার এমন কঠোর সমালোচনা করেছেন কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব ড. খ ম কবিরুল ইসলাম।
তিনি বলেছেন, দেশে প্রতি বছর যে হারে সাধারণ বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রিধারী তৈরি হচ্ছে, সেই বিপুল সংখ্যক তরুণের কর্মসংস্থানের সুযোগ অর্থনীতিতে নেই। এর একমাত্র সমাধান হিসেবে তিনি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকেই ভবিষ্যতের পথ হিসেবে উল্লেখ করেন।
ড. কবিরুল ইসলাম দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তির উদাহরণ টানতে গিয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে ‘ভিশনারি লিডার’ হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, “আমরা আজকে বাংলাদেশের অর্থনীতির যে অবস্থানে আছি, তার বীজ বুনেছিলেন তিনি। দুটো ভিত্তির ওপরে আমরা দাঁড়িয়ে আছি—রেমিট্যান্স আর গার্মেন্টস, দুটোই উনি বপন করেছিলেন।” তিনি আরও বলেন, “মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যদি বেঁচে থাকতেন, তাহলে তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়টা করতেন না। তিনি করতেন এই টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটি।”
দেশের বেকারত্ব সমস্যার চিত্র তুলে ধরে সচিব বলেন, “পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে প্রায় ৪০ লক্ষ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। প্রতি বছর এখান থেকে ৮-১০ লাখ এবং অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরও ২ লাখসহ মোট ১২ লাখ স্নাতক বের হয়। অথচ আমাদের চাকরির সুযোগ আছে মাত্র ২ লাখের। এর মানে, আমরা প্রতি বছর ১০ লাখ বেকার তৈরি করছি। কথাটা খুব কঠিন শোনালেও এটাই সমাধান আমি মনে করি।” তিনি বলেন, “আমি যদি ক্ষমতাবান হতাম, আমি সবার আগে এই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিতাম।”
তবে আশার কথা শুনিয়ে তিনি জানান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চার বছরের কোর্সের মধ্যে একটি কারিগরি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে চিন্তাভাবনা চলছে। তার মতে, “বাংলা বা পলিটিক্যাল সায়েন্সে অনার্স পড়া লক্ষ লক্ষ তরুণের আমার তো দরকার নাই। তার পরিবর্তে যদি আমি তাকে প্লাম্বিং, ইলেকট্রিক বা টাইলসের কাজ শেখাতাম, তাহলে দেশে-বিদেশে তার চাকরির সুযোগ ছিল, সে নিজেই উদ্যোক্তা হতে পারত।”
অনুষ্ঠানের শুরুতে জুলাই বিপ্লবকে স্মরণ করে তিনি নিজেকে এই বিপ্লবের একজন “প্রত্যক্ষ বেনিফিশিয়ারি” হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “গত বছর এ সময়ে আমি সিনিয়র সহকারী সচিব ছিলাম, আর আমার বস ছিলেন আমার ১৩ ব্যাচ জুনিয়র। এই একটি তথ্যই আমাদের মানসিক অবস্থা বোঝার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু কুরআনের সূরা আল-ইমরানের ২৬ নম্বর আয়াতের উপর দৃঢ় ঈমান ছিল, যে কারণে আল্লাহ তা’আলা সম্মানিত করেছেন।”
ইকো ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহম্মদ শহীদ উজ জামানের উদ্যোগের প্রশংসা করে তিনি বলেন, “জামান ঠিকই বুঝতে পেরেছে যে আগামী দিন কারিগরি শিক্ষার। সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছিল, চাইলেই শিক্ষক বা বড় রাজনীতিবিদ হতে পারত। কিন্তু সে উদ্যোক্তা হয়ে দেশের জন্য যে বড় কাজটি করতে যাচ্ছে, তা অন্য কোনো পেশায় থেকে হয়তো পারত না।”
কারিগরি শিক্ষার প্রসারে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে ড. কবিরুল ইসলাম জানান, সিঙ্গাপুরের নানইয়াং পলিটেকনিকের মডেলে দেশের কারিগরি শিক্ষাকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা চলছে। তিনি বলেন, “আমরা প্রত্যেক জেলায় একটি করে সরকারি পলিটেকনিক করতে চাই। তবে অনেক বেসরকারি পলিটেকনিকের মান জাতীয় পর্যায়েরও নয়। যারা মানোন্নয়নে ব্যর্থ হবে, নির্দিষ্ট সময় পর তাদের বন্ধ করে দেওয়া উচিত।”
এ সময় তিনি ইকো ইনস্টিটিউটের অনুমোদনের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়ে গেছে জানিয়ে বলেন, চলতি শিক্ষাবর্ষেই প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষার্থী ভর্তি করাতে পারবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ইআইইটি ও ইআইএ’র চেয়ারম্যান ড. মুহম্মদ শহীদ উজ জামান। এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রুহুল আমিন, ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. নাজমুল হক সুমন, বিশিষ্ট সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মির্জা ফয়সল আমীন এবং বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরিচালক (কারিকুলাম) প্রকৌশলী মো. আনোয়ারুল কবীর।