
দিনাজপুর জেলার বোচাগঞ্জ উপজেলার ২নং ইশানিয়া ইউনিয়নের রামপুর গ্রামে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ। একই পরিবারের জমজ দুই বোন একসঙ্গে সরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পাওয়ায় পরিবার ছাড়াও পুরো গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে আনন্দ ও গর্বের অনুভূতি।
২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে রামপুর গ্রামের মাখনুন আক্তার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ এবং তার জমজ বোন মুসফিকা নাজনিন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। মাখনুন আক্তার রোল নম্বর ২০০২০৮০ নিয়ে ৮২ দশমিক ৫ নম্বর এবং মুসফিকা নাজনিন রোল নম্বর ২০০১৮৩৫ নিয়ে ৮০ দশমিক ৫ নম্বর অর্জন করেন। তারা দুজনই একই কেন্দ্রে পরীক্ষায় অংশ নেন।
জমজ দুই বোন মশিউর রহমান ও নাজমুন নাহারের সন্তান। মশিউর রহমান মুরারিপুর উচ্চবিদ্যালয়ে অফিস সহকারী হিসেবে কর্মরত। তিন কন্যাসন্তানের জনক হলেও তিনি কখনো মেয়েসন্তান হওয়াকে সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখেননি। বরং শুরু থেকেই মেয়েদের শিক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন।
মাখনুন আক্তার ও মুসফিকা নাজনিন রামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন। পরে তারা সেতাবগঞ্জ সরকারি পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং দিনাজপুর সরকারি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় জিপিএ–৫ অর্জন করেন।
সাফল্যের অনুভূতি প্রকাশ করে মাখনুন আক্তার বলেন, প্রথমেই আল্লাহ তাআলার কাছে শুকরিয়া আদায় করছি। মা–বাবার সহযোগিতা ছাড়া এই সাফল্য সম্ভব হতো না। বড় বোন সবসময় আমাদের পাশে ছিল। ছোটবেলা থেকেই আমার ইচ্ছা ছিল ডাক্তার হওয়ার। ভবিষ্যতে আমি আমাদের গ্রামের মানুষের সেবা করতে চাই।
তার জমজ বোন মুসফিকা নাজনিন বলেন, একসঙ্গে দু’জন মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পাওয়া আমাদের জন্য অনেক আনন্দের। আমরা যেন ভালো ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করতে পারি—এই দোয়া চাই।
তাদের বড় বোন মাইমুনা আক্তার মিম বলেন, আমার ছোট দুই বোন মেডিকেলে চান্স পেয়েছে—এটা আমাদের পরিবারের জন্য অনেক বড় আনন্দের বিষয়। আল্লাহ যেন তাদের দিয়ে দেশ ও সমাজের কল্যাণমূলক কাজ করান।
জমজ বোনের চাচাতো ভাই ফরহাদ হোসেন বলেন, একই পরিবারের দু’জন মেডিকেলে সুযোগ পেয়েছে—এই খবর শুনে আবেগ ধরে রাখতে পারিনি। সত্যিই এটা আমাদের পরিবারের জন্য গর্বের বিষয়।
স্থানীয় সমাজসেবক আব্দুল বাতেন বলেন, এই সাফল্যে আমরা গ্রামবাসী গর্বিত। তারা যেন আরও বড় সফলতা অর্জন করে—এই কামনা করি।
মা নাজমুন নাহার বলেন, আমার দুই মেয়ে মেডিকেলে চান্স পেয়েছে—এতে আমি অত্যন্ত আনন্দিত।
পিতা মশিউর রহমান বলেন, আমার তিনটি মেয়ে—কোনো ছেলে নেই। কিন্তু আমি কখনো আক্ষেপ করিনি। আমি বিশ্বাস করি, সন্তান ছেলে হোক বা মেয়ে—শিক্ষাই আসল পরিচয়। আল্লাহ তাআলা আমার ইচ্ছা পূরণ করেছেন। তারা যেন ভালো ডাক্তার হয়ে দেশ ও মানুষের সেবা করতে পারে—এই দোয়া চাই।
রামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রোখসানা বেগম বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই তারা অত্যন্ত নিয়মিত ও মনোযোগী ছিল। কখনো ক্লাস ফাঁকি দিত না। তখনই বুঝেছিলাম—ওরা একদিন বড় কিছু করবে।
এক সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে জমজ দুই বোনের এই সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত কৃতিত্ব নয়, বরং গ্রামীণ সমাজে মেয়েদের শিক্ষায় অগ্রযাত্রার একটি অনুপ্রেরণামূলক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
Related