জানা গেছে, পুরান ঢাকায় গুলির ঘটনায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের লালবাগ বিভাগের একটি চৌকস দল ‘পেন গান’সহ সোহেল ওরফে কাল্লু ও সায়মন নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। এখন পেন গান নামের ক্ষুদ্র অস্ত্রটির উৎস খুঁজছেন গোয়েন্দারা।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার (দক্ষিণ) মো. নাসিরুল ইসলাম বলেন, ‘যুবদল নেতাকে গুলির ঘটনায় জড়িতরা সবাই তার ঘনিষ্ঠ হওয়ায় আসামিদের নাম-পরিচয় পেতে সমস্যা হয়নি। ঘটনার পর থেকে আমরা ছায়া তদন্ত করছিলাম। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় যাত্রাবাড়ী এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রথমে সায়মনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কেরানীগঞ্জে অভিযান চালিয়ে সোহেল ওরফে কাল্লুকে গ্রেপ্তার করা হয়। কাল্লুর কাছ থেকে রাসেলকে গুলি করার সময় ব্যবহৃত অস্ত্রটি উদ্ধার করা হয়।’
আড্ডায় বসেই গুলি, ব্যবহৃত হয় পেন গান
গত ৩ এপ্রিল রাজধানীর পুরান ঢাকার নয়াবাজারে যুবদল নেতা রাসেলকে গুলি করা হয়। দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধুরাই পরিকল্পিতভাবে রাসেলকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা চালায়। তবে বিস্ময়কর বিষয় হলো, গুলি করার পর রাসেলের মৃত্যু না হওয়ায় ঘাতক বন্ধুরাই তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ধানমন্ডির একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করে। সেখানে এখনো গুলিবিদ্ধ রাসেলের চিকিৎসা চলছে।
মামলার বাদী ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ৩ এপ্রিল বিকেলে রাসেলকে মোবাইল ফোনে সায়মনের বাসায় ডেকে নেন রিপন মণ্ডল। সেখানেই রাসেলকে গুলি করেন সায়মন। এরপর আহত অবস্থায় তারাই আবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালে গুলির বিষয়টি জানাজানি হলে অবস্থা বেগতিক দেখে তারা রাসেলকে সায়েন্স ল্যাব এলাকায় একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান।
মামলার বাদী রাসেলের ভাই ফয়সাল হোসেন বলেন, ‘আমার ভাইকে গুলির ঘটনা সায়মনের বাসায় হয়। তার আগে মোবাইল ফোনে ডেকে নেয় রিপন। গুলি করে আমার ভাইকে আহত অবস্থায় তারাই প্রথম হাসপাতালে নিয়ে যায়। প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে সেখানে চিকিৎসার আগে পুলিশকে জানানোর বিষয়টি বুঝতে পেরে তারা পপুলার হাসপাতালে নিয়ে যায়। তারা একটি মোটরসাইকেলে করে নিয়ে যায়। সেই মোটরসাইকেলটি চালায় সায়মন আর আমার ভাইকে নিয়ে পেছনে বসে রিপন। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে গিয়ে আমার ভাইয়ের পাশে রিপনকে দেখতে পাই। সে রাত ১১টা পর্যন্ত আমার সঙ্গে হাসপাতালে ছিল। কিন্তু তখন পর্যন্ত আমরা জানতাম না যে এই ঘটনা তারাই ঘটিয়েছে। পরে আমার ভাই আমাকে বলেছে কে তাকে গুলি করেছে।’
অভিযানে গিয়ে গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তা দেখতে পান, রাসেলকে গুলি করতে ব্যবহৃত হওয়া অস্ত্রটি একটি সিগারেটের প্যাকেটে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। বিষয়টি তাদের অবাক করলেও পরে যন্ত্রাংশ জোড়া দিয়ে দেখতে পান, এটি একটি অত্যাধুনিক ক্ষুদ্রাস্ত্র, যা ‘পেন গান’ নামে পরিচিত। এটি দেখতে হুবহু একটি কলমের মতো। আদতে এটি একটি ঘাতক অস্ত্র। দেশে অপ্রচলিত এই অস্ত্র বহনকারীরা কোথায় পেল তা এখন জানার চেষ্টা করছেন গোয়েন্দারা।
পেন গান কেনা হয় ৮০ হাজার টাকায়
ডিবির একটি সূত্র থেকে জানা যায়, জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার সোহেল ওরফে কাল্লু জানায়, এই ‘পেন গান’ ৮০ হাজার টাকায় একজনের কাছ থেকে কেনা হয়। পরে রাসেলের কাছে ২০ হাজার টাকা বেশি লাভে বিক্রি করতে চেয়েছিলেন সায়মন। ঘটনার দিন সোহেল ওরফে কাল্লু, সায়মন, রিপন দাস ও রাসেল একত্রে ইয়াবা সেবন করছিলেন। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়। তখন ‘পেন গান’ দিয়ে রাসেলকে গুলি করা হয়।
বিশেষ এই অস্ত্রের উপস্থিতির তথ্য পাওয়ায় উদ্বেগ দেখা দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে। যদিও সংখ্যায় এখনো সীমিত, তবে অপরাধে ব্যবহারের সম্ভাবনা এবং এর গোপনীয়তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক করে তুলেছে।
কী এই ‘পেন গান’
‘পেন গান’ মূলত একটি ছদ্মবেশী আগ্নেয়াস্ত্র, যা দেখতে সাধারণ কলমের মতো হলেও এর ভেতরে থাকে ছোট আকারের ফায়ারিং মেকানিজম। সাধারণত স্বল্প দূরত্বে গুলি ছোড়ার জন্য এটি ব্যবহৃত হয়। আকারে ছোট হওয়ায় এটি সহজেই পকেট বা ব্যাগে রাখা যায় এবং তল্লাশির সময় অনেক ক্ষেত্রে চোখ এড়িয়ে যেতে পারে।
ঢাকায় এল কীভাবে
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রাথমিক ধারণা, এ ধরনের অস্ত্র বিদেশ থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে দেশে প্রবেশ করেছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকা বা অনলাইন ব্ল্যাক মার্কেটের মাধ্যমে আসতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে যন্ত্রাংশ আলাদাভাবে এনে দেশে সংযোজন করাও হতে পারে। এ বিষয়ে পুলিশ কাজ করছে, হয়ত আরও তথ্য বেরিয়ে আসবে।
























