


নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জ উপজেলার গ্রামবাংলার চারপাশের প্রকৃতিজুড়ে ছড়িয়ে আছে ভাঁটফুলের আভা যা প্রতিনিয়ত ছড়াচ্ছে মুগ্ধতা। আগের দিন গুলোতে সারা ঋতুরাজ বসন্ত জুড়ে পাড়ায় পাড়ায় বশতো মারিফতী আর মুর্শিদী গানের আসর। এখন আর কোথাও আগের মতো বাঁশির সুর না বাজলেও তবে বিভিন্ন প্রজাতির গাছে ঠিকই ফুটেছে নানা রঙ বাহারি ফুল।গাছে গাছে গান গাইছে বসন্তের কোকিলসহ নানা চেনা-অচেনা পাখির দল। ঋতুরাজ বসন্তের আগমনে প্রকৃতি আপন খেয়ালে মেতে উঠেছে নতুন রঙ আর রূপের উল্লাসে।
শীতের সতেজতা কাটিয়ে ঋতুরাজ বসন্তকে স্বাগত জানাতে চারদিকে শিমুল-পলাশ-মান্দার- পারিজাতের লালের আয়োজনের মধ্যে মেলবন্ধন গড়ে তুলে গ্রামবাংলার মাঠে-ঘাটে পথে-প্রান্তরে গ্রামের ঝোপঝাড়ে ফুটেছে মনোমুগ্ধকর বুনো ভাঁটফুল।সাদা ও হালকা বেগুনি আভায় সেজে থাকা স্নিগ্ধ এই বুনোফুল নীলফামারীর কিশোরগঞ্জের গ্রামীণ পল্লীর প্রকৃতিতে তার মিষ্টি সুবাসে সৌরভ ও অপরূপ মায়ায় এক অপার্থিব মুগ্ধতা ছড়াছে, যা প্রকৃতিপ্রেমী ও পথচারীদের নজর কাড়ছে।সেই সঙ্গে মিষ্টি সুবাসের ঘ্রাণ বসন্তের হালকা বাতাসে ভেসে এসে গ্রামবাংলার প্রকৃতিকে করে তুলেছে আরো মোহনীয়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নজুড়ে গ্রামাঞ্চলের কাঁচা-পাকা রাস্তার ধারে, ঝোপঝাড়ে, পুকুর পাড়ে, ফসলি জমির আইলে, সেচ ক্যানালের ধারে, কবর ও শ্মশান স্থানে, পরিত্যক্ত ও অনাবাদি জমিতে গুচ্ছ গুচ্ছ ভাঁটফুল সবুজ পাতা ছাপিয়ে আনমনে ঝাড়বাতির অবয়বে সৃষ্টি করেছে এক দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য। দূর থেকে দেখলে মনে হয় ভাঁটগাছের শাখা-প্রশাখা জুড়ে জোনাকির পোকার আলোয় মিটিমিটি জ্বলছে, যা গ্রামীণ প্রকৃতিকে মাতোয়ারা করে তুলেছে। আর ফুলের মনকাড়া ঘ্রাণ পৌঁচ্ছে গেছে শহর-বন্দর ও লোকালয় পর্যন্ত।স্নিগ্ধ ও কোমল ফুলের ভারে নুয়ে পড়ছে ডাল-পালা।
আর সকালে শিশি ভেজা পাপড়িতে সূর্যের আলো টিকরে পড়তেই সৃষ্টি হয় এক মায়াবি রূপের ঝিলিক তোলা সৌন্দর্য। এমন সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে মুগ্ধ হচ্ছেন প্রকৃতিপ্রেমী, পথচারীসহ নানা শ্রেণিপেশার মানুষ। কিশোরগঞ্জ সরকারি ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মোশাররফ হোসেন বাবু বলেন,পল্লি বাংলার এক অপরূপ সৌন্দর্যের প্রতীক ভাঁটফুল। শিমুল, পলাশ, মান্দার ফুল বাংলার বসন্তকে রঙিন করে তুলতে এই ভাঁটফুলের মহিমা অতুলনীয়। অনেকে আবার এই ফুলকে ঘেঁটু, বনজুঁই ফুল নামে জানেন।
এই সময় গ্রামের মাঠ-ঘাটে ভাঁটফুলের গন্ধে ম-ম করছে। ভোরবেলা কিংবা গোধূলিলগ্নে ভাঁটফুলের গন্ধ সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়। অনেকেই এই সুবাসকে শৈশবের স্মৃতির সঙ্গে তুলনা করেন। শিশুরা ফুল তুলে এনে খেলার ঘর সাজায়। অনেক কিশোরী ভাঁট ফুল তুলে এনে চুলের বেণী ও খোঁপায় গুঁজে নিজের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেন।এর স্নিগ্ধ রূপ শোভায় সুরভিত পাখি, প্রজাপতি, মৌমাছিসহ অনেক কীটপতঙ্গ। একই সঙ্গে নয়নাভিরাম ভাঁটফুলে পুলকিত হয়ে ওঠে প্রকৃতিপ্রেমীদের মন। উপজেলা সাহিত্য শিখা পরিষদের কবি-সাহিত্যিক আব্দুল মান্নান বলেন, গ্রামবাংলার মেঠোপথ ও ঝোপঝাড়ে অযত্ন-অবহেলায় ফুটে থাকা সাদা-বেগুনি রঙের অন্যতম বুনোফুল ভাঁট।
বসন্তের ঝোপঝাড়ের ফাঁকে ফাঁকে ফুটে থাকা এই ফুল জীবনান্দ দাশের বাংলার মুখ কবিতায় ‘ঘুঙুরের মতো’ বেহুলার পায়ে বেজেছে, যা গ্রামীণ রূপসী বাংলার প্রকৃতির অনন্য প্রতীক। তাইতে ভাঁটফুল পথে-প্রান্তরে অযত্ন আর অবহেলায়, সাদা বেগুনি হাসি মেখে, কে তুমি ফুটে আছ মেঠো ঝোপের ধারে, দোল খেয়ে যাও হাওয়ার নাচন দেখে। শৈশবের স্মৃতি, ধুলোমাখা পথ, বাঁশঝাড়ের ছায়াতলে ভাঁটফুলের মেলা, বুনো সুবাসে, মন মেতে ওঠে অতল অবহেলে। জীবনানন্দের চোখে তুমি তো অপরূপা, বেহুলার পায়ে ঘুঙুর হয়েছিলে, বাংলার মাঠ, নদী আর নদীয়া, তোমার রূপেই যেন সেজেছিল, আহা রূপসী! বসন্ত এলে ঝোপ-ঝাড়, অনাদরে ফুটে থাকা তুমিই মোর প্রিয় বাংলা মায়ের ভাঁটফুল।
কিশোরগঞ্জ সদর ইউনিয়নের কামার পাড়া গ্রামের প্রকৃতিপ্রেমী শাকিল ইসলাম বলেন, বসন্তকে চেনা যায় বুনো ভাঁটফুলে। আর বসন্তের গ্রামবাংলার প্রকৃতিকে দীর্ঘ সময় জীবন্ত করে রাখার অন্যতম ফুল হলো ভাঁটফুল। রাস্তার ধারে ফুটে থাকা রাশি রাশি এ ভাঁটফুল দেখে মুগ্ধ হয়ে কিছু সময় সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করি। ব্যস্ত জীবনের মাঝে ছোট ছোট প্রকৃতিক দৃশ্য মানুষের মনকে প্রশান্ত করে তোলে।
কিশোরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা নীল রতন দেব বলেন, ভাঁটফুল সৌন্দর্য ছড়ানোর পাশাপাশি ভেষজ ওষুধিগুণে ভরপুর। এর পাতা তেতো হওয়ায় এর রস গ্যাস নির্মূলসহ ছোটদের মুখে অরুচি, পেটভাঁপা ও জ্বর সারাতে কার্যকর। পাতায় থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট রক্ত নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এবং শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা সমাধানে এর পাতার রস বেশ উপকারি। গরু-ছাগলের গায়ে উকুন হলে ভাঁট পাতা বেটে দিলে উকুন মরে যায়। অনেকে কৃমি সারাতে এর পাতার রস খেয়ে থাকেন।
বিষাক্ত কিছু কামড় দিলে ফুলের রস ক্ষতস্থানে দিলে দ্রুত সেরে যায়। চর্মরোগে নিয়মিত এ ফুলের রস মালিশ করলে উপশম মেলে। বসন্ত শেষে ভাঁটগাছ কেটে অনেক নিম্ন আয়ের মানুষ জ্বালানির চাহিদা মেটায়।বর্তমানে ঝোপঝাড় কেটে ফেলা হচ্ছে। কীটনাশক প্রয়োগ করে বনজঙ্গল নিধন করা হচ্ছে। এতে প্রকৃতি থেকে উজাড় হচ্ছে ভাঁটগাছ।
উপজেলা কৃষিবীদ লোকমান আলম বলেন, গ্রামবাংলার অতি পরিচিত ভাঁটফুল। প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নিয়ে অযত্ন-অবহেলায় বেড়ে ওঠা এই বুনোফুল রাতে তীব্র সুঘ্রাণ ছড়ায় এবং বসন্তের প্রকৃতিকে সজীবতায় ভরে তোলে।জীবনানন্দ দাশের মতো কবিদের কবিতায় এই বুনোফুল বাংলার অপরূপ রূপের প্রতীক হিসেবে ফুটে উঠেছে।