


পবিত্র কাবা শরিফের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে রূপালি ফ্রেমে স্থাপিত পবিত্র পাথরকে বলা হয় ‘হাজরে আসওয়াদ’ বা কালো পাথর। কাবা তাওয়াফ শুরু ও শেষ হয় এই পাথরকে কেন্দ্র করেই। বর্তমানে এটি কুচকুচে কালো রঙের হলেও ইসলামি বর্ণনায় এর আদি রূপ ছিল অত্যন্ত উজ্জ্বল ও ধবধবে সাদা।
দুধের চেয়েও সাদা ছিল যে পাথর
হাদিস শরিফে এই পাথরের আদি রঙ সম্পর্কে স্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায়। রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন- ‘হাজরে আসওয়াদ যখন জান্নাত থেকে অবতীর্ণ হয়, তখন এটি দুধের চেয়েও বেশি সাদা ছিল। পরে বনি আদমের (মানুষের) পাপরাশি একে কালো করে দিয়েছে।’ (সুনানে তিরমিজি: ৮৭৭)
ইসলামি ব্যাখ্যায় এই বর্ণনাকে একটি আধ্যাত্মিক নিদর্শন হিসেবে দেখা হয়। এর রঙ পরিবর্তন মানবজাতির গুনাহ ও আত্মিক কলুষতার একটি প্রতীকী বহিঃপ্রকাশ।
পাথরটি কি ভেতরে এখনও সাদা?
একটি অত্যন্ত বিস্ময়কর তথ্য হলো, হাজরে আসওয়াদ উপর দিয়ে কালো দেখালেও এর ভেতরের অংশ কিন্তু এখনও সাদা। মক্কার প্রখ্যাত ঐতিহাসিক আল-আজরাকি তাঁর ‘আখবারু মক্কা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.)-এর সময় যখন কাবা মেরামত করা হয়, তখন হাজরে আসওয়াদের কিছু অংশ ভেঙে গিয়েছিল। তখন দেখা যায়, পাথরটির বাইরের দিক কালো হলেও এর ভেতরের অংশটি জান্নাতি সেই আদি রঙের মতোই ধবধবে সাদা রয়ে গেছে। মূলত মানুষের স্পর্শ লাগা বাইরের অংশগুলোই কেবল রঙ পরিবর্তন করেছে।
জান্নাতি ইয়াকুত ও আলো নিভে যাওয়া
আরেকটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স.) হাজরে আসওয়াদের মহিমা বর্ণনা করে বলেছেন- ‘হাজরে আসওয়াদ ও মাকামে ইবরাহিম জান্নাতের ইয়াকুত পাথরসমূহের মধ্য থেকে দুটি ইয়াকুত। আল্লাহ তাআলা তাদের আলো নিস্তেজ করে দিয়েছেন। যদি তা না করা হতো, তবে এই দুটির আলোতে পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যবর্তী সবকিছু আলোকিত হয়ে যেত।’ (তিরমিজি: ৮৭৮)
পাপের স্পর্শে যা হারিয়েছে
হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে একটি বর্ণিত আছে যে, যদি জাহেলি যুগের মানুষের পাপ ও মূর্তিপূজারীদের স্পর্শ এই পাথরে না লাগত, তবে এর অলৌকিক বরকতে যেকোনো অসুস্থ ব্যক্তি এটি স্পর্শ করলেই সুস্থ হয়ে যেত। মানুষের গুনাহ যেমন এর রঙ বদলে দিয়েছে, তেমনি এর অলৌকিক নিরাময় ক্ষমতাকেও আল্লাহ তাআলা সীমিত করে দিয়েছেন। (আখবারু মক্কা: ১/৩৪০)
আদম (আ.) থেকে ইবরাহিম (আ.): সংরক্ষণের ইতিহাস
ইসলামি ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, হজরত আদম (আ.)-এর সময় জান্নাত থেকে এই পাথর পৃথিবীতে আগমন করে এবং কাবার প্রাচীন কাঠামোর সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। পরবর্তীতে হজরত নূহ (আ.)-এর সময় মহাপ্লাবনে কাবার কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পাথরটি অলৌকিকভাবে সংরক্ষিত থাকে। বর্ণনা অনুযায়ী, আল্লাহর নির্দেশে জিবরাইল (আ.) এটি মক্কার ‘জাবালে আবু কুবাইস’ পাহাড়ে লুকিয়ে রাখেন। পরে হজরত ইবরাহিম (আ.) ও হজরত ইসমাইল (আ.) কাবা পুনর্নির্মাণের সময় জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে এটি পুনরায় লাভ করেন এবং কাবার দেয়ালে স্থাপন করেন।
তাওয়াফের সূচনা ও সুন্নতের অনুসরণ
হাজরে আসওয়াদ কাবার সেই কোণে অবস্থিত, যা ‘রুকনুল হাজার আল-আসওয়াদ’ নামে পরিচিত। এখান থেকেই তাওয়াফ শুরু ও শেষ হয়। এটি স্পর্শ বা চুম্বন করা সুন্নত। হজরত ওমর (রা.) বলেন- ‘আমি জানি তুমি একটি পাথর মাত্র; তুমি উপকার বা ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখো না। যদি আমি রাসুলুল্লাহ (স.)-কে তোমাকে চুম্বন করতে না দেখতাম, তবে আমি তোমাকে চুম্বন করতাম না।’
এটি রাসুলুল্লাহ (স.)-এর অনুসরণের প্রতি সাহাবিদের গভীর আনুগত্য ও ভালোবাসার অনন্য দৃষ্টান্ত।
হাজরে আসওয়াদ এমন পাথর, যা কাবার ইতিহাস, ইবাদতের কেন্দ্রবিন্দু এবং জান্নাতি স্মৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। এর সাদা থেকে কালোতে রূপান্তরের ইতিহাস মুসলিমদের মনে আত্মশুদ্ধি ও গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার তাগিদ জাগিয়ে তোলে। এটি আল্লাহর ঘরের প্রতি ভালোবাসা এবং সুন্নতের প্রতি আনুগত্যকে আরও গভীরভাবে জাগ্রত করার এক আধ্যাত্মিক মাধ্যম।