শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) দুপুরে রংপুর নগরীর সুমি কমিউনিটি সেন্টারে আয়োজিত ‘হরমুজ প্রণালীর অস্থিরতায় বাংলাদেশে জ্বালানি ঝুঁকি তীব্র: রংপুরে সবুজ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তর’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান ডপস’র নির্বাহী পরিচালক উজ্জ্বল চক্রবর্তী।
পরিবেশ ও উন্নয়নমূলক বেসরকারি সংস্থা ডপস’র নির্বাহী পরিচালক উজ্জ্বল চক্রবর্তী বলেন, বাংলাদেশে ৪ কোটি ২ লক্ষ ৬০ হাজার পরিবার রয়েছে, যে খাতে জাতীয় গ্রিডের ৫৭ শতাংশ বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয়। এই পরিবারগুলোর ৪১ শতাংশ অন্তত এক কিলোওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করতে পারে। এতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা বিস্ময়করভাবে ১৬,৩৬১ মেগাওয়াট পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। যা বার্ষিক ২৬,৫১৪ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম।
তিনি আরও বলেন, ফার্নেস অয়েল বা অপরিশোধিত খনিজ তেল থেকে এই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে শুধু জ্বালানি খরচ বাবদই ৪৮,৮১৩ কোটি টাকা লাগবে। প্রতি মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে প্রতি বছর ২.৯৮ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হতে পারে। ছাদে সৌর প্যানেলের ব্যাপক ব্যবহার করলে সবচেয়ে গরিব জনগোষ্ঠী ভবিষ্যতে বিদ্যুতের দাম বাড়লেও সুরক্ষিত থাকবে
এবং বিদ্যুতের একটি স্থিতিশীল উৎস তাদের হাতে থাকবে।
সংবাদ সম্মেলন থেকে জ্বালানির জ্বলন্ত চুল্লি থেকে মুক্তি ও জীবাশ্ম জ্বালানির চাহিদা কমাতে সরকারকে নিজস্ব ভবনগুলো ব্যবহারে যথাযথ উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানান ফোরাম অন ইকোলজি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট রংপুরের সভাপতি এস এম পিয়াল।
তিনি বলেন, ২০২৫ সালের আগস্টে নেয়া ৩ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুতের কর্মসূচিটি এক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারে। এছাড়া দেশের ১ লাখ ২২ হাজার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১ হাজার ১৩৭টি কলেজ ও কারিগরি প্রতিষ্ঠান এবং ১৭০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে কমপক্ষে ২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা সম্ভব। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে সরকার জ্বালানি আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারবে। বিদ্যুৎখাতে গ্যাসের ব্যবহার কমালে তা শিল্প খাতে বরাদ্দ করা যাবে। এটি সম্ভব হলে কারখানার কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্নভাবে চালু থাকার মাধ্যমে রপ্তানি আয় বদ্ধিৃ পাবে।
এস এম পিয়াল বলেন, ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল অন্যতম প্রধান খাত কৃষি।বর্তমানে বাংলাদেশে ১২.২ লক্ষ ডিজেলচালিত সেচপাম্প রয়েছে। এর তুলনায়, বিদ্যুতায়িত সেচপাম্পের সংখ্যা মাত্র ৫.১ লক্ষ এবং সৌরচালিত সেচপাম্প মাত্র ৩ হাজার ৬০২টি। ডিজেলচালিত পাম্পগুলোকে সৌরশক্তিতে রূপান্তর করা গেলে সরকার বছরে ১০,৯১৪ কোটি টাকার (৮৮৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) ডিজেল আমদানি কমাতে পারবে। নির্দিষ্ট ফি-এর বিনিময়ে সৌরসেচ-ব্যবস্থা ইতোমধ্যেই
ভূগর্ভস্থ পানি সংরক্ষণে সফল হয়েছে।
বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি ঝুঁকি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে ফোরামের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদুজ্জামান ফারুক বলেন, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ও সৌরচালিত সেচপাম্প ছাড়াও কৃষিবিদ্যুৎ, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ, খালের উপর ও নদীর পাড়ের সৌরবিদ্যুতের মতো অন্যান্য উৎসগুলো জ্বালানি আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে কমাতে পারে। দেশজুড়ে ৩২ হাজার ৩১৫টি জলাশয়ে কমপক্ষে ১১ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা যায়। দেশের ১,৫০০ বর্গ কি.মি.
পুকুরের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ব্যবহার করে ১৫ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা অর্জন করা সম্ভব। এই উদ্ভাবনী প্রযুক্তিগুলো জমির স্বল্পতার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার পাশাপাশি সবজু জ্বালানি সরবরাহ করবে।
এর আগে সকাল একই স্থানে ‘জ্বালানির জ্বলন্ত চুল্লি থেকে মুক্তি এবং বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান’ শীর্ষক এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ডেভেলপমেন্ট অব পুওর সোসাইটি (ডপস), ফোরাম অন ইকোলজি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এফইডি) রংপুর, উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট (ক্লিন) ও বাংলাদেশ পরিবেশ ও উন্নয়ন ওয়ার্কিং গ্রুপ (বিডব্লিউজিইডি) যৌথভাবে এর আয়োজন করে।
এতে দৈনিক আগামীর সন্ধানে’র সম্পাদক বিশিষ্ট সাংবাদিক মোনাব্বর হোসেন মনার সভাপতিত্বে অন্যান্যের মধ্যে সাংবাদিক জয়নাল আবেদীন, সিদ্দিকুর রহমান, আবেদুল হাফিজ, আব্দুর রহমান মিন্টু, এহসানুল হক সুমন, বর্নালী জামান, আব্দুল্লাহ আল-আমিন, আলোকচিত্রী রনজিৎ দাস, ইমরোজ ইমু ও মানবাধিকার কর্মী মো. কবির মিয়া বক্তব্য রাখেন।
আলোচনা সভায় বর্তমান জ্বালানি সংকট থেকে উদ্ভূত চলমান হুমকি কার্যকরভাবে মোকাবেলা করার জন্য সরকারের কাছে ১৩টি সুপারিশ তুলে ধরা হয়।
সুপারিশগুলো হলো- জ্বালানি বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য, জীবাশ্ম জ্বালানির ঋণচক্র থেকে দূরে থাকা, নবায়নযোগ্য শক্তির জন্য আর্থিক প্রণোদনা, জাতীয় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ কর্মসূচি, সৌর পার্ক দ্রুত অনুমোদন ও বাস্তবায়ন, সৌর সেচ ব্যবস্থাপনার সম্প্রসারণ, পরিবহন খাতে জ্বালানি ব্যবহার কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দক্ষতা উন্নয়ন, স্বল্প-সুদের নবায়নযোগ্য জ্বালানি তহবিল গঠন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ, পরিচালন দক্ষতা এবং মেধাক্রম, পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার ও টেকসই জ্বালানির জন্য ভর্তুকি সংস্কার।