


মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তপ্ত পরিস্থিতির কেন্দ্রে এখন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ ‘হরমুজ প্রণালি’। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—উভয় পক্ষই এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে। প্রায় দুই মাস ধরে চলা এই সংঘাতের পর এখন প্রশ্ন উঠেছে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই শেষ পর্যন্ত এই অঞ্চলের শান্তির সম্ভাবনাকে পুরোপুরি ডুবিয়ে দেবে কি না। বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরু হওয়ার আগে এই প্রণালি নিয়ে তেহরানের কোনো বিশেষ দাবি ছিল না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরান এই পথে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়। ইরানের ড্রোন ও টহল বোটের হামলার ভয়ে অধিকাংশ জাহাজ কোম্পানি বর্তমানে এই রুট এড়িয়ে চলছে। ইরানের পরিকল্পনা ও ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি
গত মার্চের মাঝামাঝি ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার যে কৌশলগত সুবিধা তেহরান পেয়েছে, তা অবশ্যই অব্যাহত রাখতে হবে।’ এরপর থেকেই ইরানি কর্মকর্তারা এই জলপথের জন্য নতুন একটি শাসনব্যবস্থার কথা বলছেন, যা কার্যত এই আন্তর্জাতিক জলপথের ওপর ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত ‘ট্রানজিট প্যাসেজ’-এর অধিকার লঙ্ঘন করে এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা বড় ধরনের কূটনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে।
ইরানের এই পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কঠোর পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। তিনি ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ-অবরোধের নির্দেশ দিয়েছেন। গত শনিবার মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, গত ২০ দিনে তারা ৪৮টি জাহাজ আটকে দিয়ে সেগুলোকে ফিরে যেতে বাধ্য করেছে।
তবে মার্কিন এই কঠোর অবরোধের মধ্যেও ইরানের কিছু জাহাজ গন্তব্যে পৌঁছাতে সক্ষম হচ্ছে। ট্র্যাকিং গ্রুপ ‘ট্যাকার ট্র্যাকার্স’ রোববার জানিয়েছে, ১৯ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল নিয়ে একটি ইরানি ট্যাংকার মার্কিন নৌবাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে দূরপ্রাচ্যের একটি দেশে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে। এই তেলের আনুমানিক বাজারমূল্য ২২ কোটি ডলার।
প্রস্তাবিত নতুন আইন ও প্রভাব
ইরানের পার্লামেন্টে একটি আইন অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে, যার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিতে চলাচলের ওপর নতুন নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হতে পারে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্যমতে, প্রস্তাবিত এই পরিকল্পনায় ইসরায়েল-সম্পর্কিত জাহাজকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা এবং ‘শত্রু দেশ’-এর জাহাজের জন্য বিশেষ অনুমতি ও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার শর্ত আরোপের কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া অন্য সব জাহাজকেও ইরানের অনুমতি নিয়ে প্রণালি পার হতে হবে—এমন বিধানও থাকতে পারে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরান যদি এই আইন কার্যকর করে এবং যুক্তরাষ্ট্র যদি তার শক্তিতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখে, তবে হরমুজ প্রণালি ঘিরেই মধ্যপ্রাচ্যে এক দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়তে পারে।