দিনের প্রথম অধিবেশনে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় আসে। বরগুনায় আবহাওয়া অফিস স্থাপন, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন এবং সিভিল-মিলিটারি সম্পর্কের ধারা অব্যাহত রাখার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম বলেন, আমাদের সরকার যে দায়বদ্ধতার অবস্থান থেকে সশস্ত্র বাহিনীকে জনমুখী বাহিনীতে পরিণত করার জন্য জেলা প্রশাসকদের যে অবস্থান থাকার কথা, সেই দিকনির্দেশনা আমরা দিয়েছি। সেখানে আমি উল্লেখযোগ্যভাবে বলতে চাই, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের যে দর্শন ছিল, সে বিষয় বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সেখানে আমাদের জেলা প্রশাসকদের কী ধরনের ভূমিকা থাকা উচিত সে বিষয়েও আলোচনা করেছি।
দ্বিতীয় অধিবেশন: মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ ও পরিকল্পিত নগরায়ণ
দ্বিতীয় অধিবেশনে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা উঠে আসে। তেলিয়াপাড়া চা বাগান বাংলোকে জাদুঘরে রূপান্তর, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণ, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা হালনাগাদ এবং সরকারি অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়গুলো আলোচনায় গুরুত্ব পায়।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন বলেন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের চলমান প্রকল্প ও কার্যক্রম কীভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে এবং সেগুলোর বাস্তবায়নে ডিসিদের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের অনেক সমস্যা রয়েছে। এসব সমস্যা দ্রুত নিরসন করে মন্ত্রণালয়কে জনবান্ধব করতে চাই। সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা, তাদের যথাযথ সম্মান নিশ্চিত করা এবং বীরনিবাস প্রকল্প। এসব প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং এ বিষয়ে ডিসিদের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
ভূমির অবৈধ দখল উচ্ছেদ, বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম, খেলার মাঠ, পার্ক ব্যবস্থাপনা ও জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল রক্ষণাবেক্ষণ করতে জেলা প্রশাসকদের সহযোগিতা চান গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের।
তৃতীয় অধিবেশন: প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা ও গবেষণা
তৃতীয় অধিবেশনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ডাক ও টেলিযোগাযোগ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। আধুনিক গবেষণাগার স্থাপন, ফেলোশিপ বৃদ্ধি, ক্ষতিকর ওয়েবসাইট নিয়ন্ত্রণ, পার্বত্য অঞ্চলে নেটওয়ার্ক উন্নয়ন এবং ফ্যাক্ট-চেকিং সেন্টার স্থাপনের বিষয়ে আলোচনা হয়।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, জেলা প্রশাসকরা সাইবার সিকিউরিটি নিয়ে প্রশ্ন করেছেন। সাইবার সিকিউরিটির কী অবস্থা জানতে চেয়েছেন। ডাক বিভাগের কী অবস্থা, তা নিয়েও প্রশ্ন ছিল তাদের। অনেক ক্ষেত্রে ডাক বিভাগ কিছু করছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু ডাক বিভাগ এখন অনেক কিছু করছে। নির্বাচনের সময় পোস্টাল ব্যালট পরিবহনের কাজটি ডাক বিভাগই করেছে।
তিনি বলেন, বিজ্ঞান নিয়েও তাদের প্রশ্ন ছিল। এরইমধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র আমরা চালু করেছি। এটির সেফটি ও সিকিউরিটি নিয়ে অনেকেই জানতে চেয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, ডিসিরা মাঠপর্যায়ে থাকেন, মন্ত্রণালয় থেকে আমরা যে পলিসিগুলো দেই, সেগুলো তারা বাস্তবায়ন করবে। আমরা তাদের উৎসাহ দিয়েছি।
চতুর্থ অধিবেশন: বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে টেকসই উদ্যোগ
চতুর্থ অধিবেশনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সোলার শক্তির ব্যবহার বাড়ানো, দুর্গম এলাকায় বিদ্যুৎ সুবিধা পৌঁছে দেওয়া, সেচ মৌসুমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং জ্বালানি খাতে অনিয়ম প্রতিরোধের বিষয়গুলো আলোচনায় উঠে আসে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানান, সোলার প্যানেলের মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরে ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নে আগামী তিন মাসের মধ্যে ডিসি অফিসগুলোতে সোলার প্যানেল স্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকেরা সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।
পঞ্চম অধিবেশন: অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধ ও দক্ষ জনশক্তি তৈরি
পঞ্চম অধিবেশনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় আসে। বৈধ অভিবাসন বৃদ্ধি, অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধ, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, অসচেতনতার সুযোগ নিয়ে একটি চক্র সাধারণ মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ পথে বিদেশ পাঠাচ্ছে, এতে অনেকেই বিপদে পড়ছেন, এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। তাই তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং জেলা প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমে এ ধরনের অবৈধ কার্যক্রম ঠেকাতে হবে।
তিনি বলেন, অনেক বাংলাদেশি দালালচক্রের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বিদেশে গিয়ে নানা বিপদের মুখে পড়ছেন। এটি বন্ধ করতে জেলা প্রশাসকদের নেতৃত্বে সামাজিক সচেতনতা ও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে, যাতে মানুষ এ ধরনের প্রতারণার শিকার না হন।
তিনি আরও বলেন, সরকার দক্ষ ও অর্ধদক্ষ জনশক্তি বিদেশে পাঠাতে চায়। এতে একদিকে কর্মসংস্থান বাড়বে, অন্যদিকে অবৈধ অভিবাসনও কমবে। এ লক্ষ্যে ভোকেশনাল প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোকে আরও কার্যকর করার ওপর জোর দেন তিনি। যেখানে প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান নেই, সেখানে নতুন করে স্থাপন এবং বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে জেলা প্রশাসকদের প্রতি আহ্বান জানান প্রতিমন্ত্রী।
ষষ্ঠ অধিবেশন: স্থানীয় সরকার ও তৃণমূল উন্নয়ন
ষষ্ঠ অধিবেশনে স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং সমবায় খাতকে শক্তিশালী করার বিষয়ে আলোচনা হয়।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, জেলা প্রশাসকরা আমাদের মন্ত্রণালয় সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। কিছু পরামর্শও দিয়েছেন তারা। আমরা পরামর্শগুলো গ্রহণ করেছি। কেননা স্থানীয় সরকার হচ্ছে গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় ভিত্তি। তৃণমূলের সবচেয়ে বড় শক্তিশালী একটি প্রতিষ্ঠান। আর এ প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে পারলে গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হবে।
তিনি আরও বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে জেলা প্রশাসকদের নেতৃত্ব দিতে হবে। সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়নে তাদের কাজ করতে হবে। অর্থাৎ জনগণকে সঙ্গে নিয়েই ডিসিদের কাজ করতে হবে। কারণ জনগণই হচ্ছে এই দেশের মালিক।
সপ্তম অধিবেশন: জলমহাল পুনঃখনন ও শূন্য পদে জনবল নিয়োগ
তৃতীয় দিনের শেষ (সপ্তম) অধিবেশনে ভূমি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। এতে ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রমে জটিলতা নিরসনে ‘স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইন, ২০১৭’-এর অধীন বিধিমালা প্রণয়নের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়। পাশাপাশি ভরাট হয়ে যাওয়া জলমহাল পুনঃখনন, জলমহাল ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন এবং উপজেলা ও ইউনিয়ন ভূমি অফিসগুলোতে শূন্য পদে জনবল নিয়োগের বিষয়েও আলোচনা হয়।
এ ছাড়া ভূমি সংক্রান্ত সকল সেবা সম্পর্কে জনগণকে সচেতন ও অবহিত করার লক্ষ্যে ভূমি মেলা আয়োজনের বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে। ভূমি সেবাকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব করার পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে সেবা দিতে গতি আনার ওপর অধিবেশনে গুরুত্ব দেওয়া হয়।























