1. [email protected] : Md Hozrot Ali : Md Hozrot Ali
  2. [email protected] : Sokaler Bani : Iqbal Sumon
  3. [email protected] : Md Hozrot Ali : Md Hozrot Ali
স্বপ্ন যেন ছিটকে না যায় | দৈনিক সকালের বাণী
বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ১২:৫০ পূর্বাহ্ন

স্বপ্ন যেন ছিটকে না যায়

স্বপন চৌধুরী
  • আপলোডের সময় : মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬
  • ২৫ জন দেখেছেন

বাংলাদেশে বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক ও ভৌগোলিক কারণে মাধ্যমিকের গন্ডি পেরুতে না পারা শিক্ষার্থীর সংখ্যা এখনো উল্লেখযোগ্য। চর অঞ্চল, হাওর এলাকা বা গ্রামীণ জনপদে দারিদ্র্য, বাল্যবিবাহ এবং ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাব এর মূল কারণ। বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদে নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেরা আর্থিক সংকটের কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। অনেক ক্ষেত্রে তারা সংসারের হাল ধরতে অভাবের তাড়নায় অল্প বয়সেই অন্য কোনো কাজে যোগ দেয়। আর বাল্য বিবাহের কারণে দরিদ্র পরিবারের মেয়ে লেখাপড়া থেকে ঝরে পড়ে। যদিও শুরুতে তাদেরও স্বপ্ন থাকে পড়াশোনা করে একদিন বড় হবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায় পারিপার্শ্বিক নানা সংকটে।

এরই মধ্যে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ও স্কুল থেকে শিশু ঝরে পড়ামুক্ত উপজেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। বিষয়টি নি:সন্দেহে আলোচনায় আসার মতো। কিন্তু বাস্তবে ঘোষণা দিয়েই কী সেটির সফলতা আশা করা যায়! এজন্য এখনো অনেক কাজ বাকি। সরকারসহ সর্বস্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ এর গঙ্গাচড়া এরিয়া প্রোগ্রামের সহযোগিতায় মঙ্গলবার সকালে গঙ্গাচড়া উপজেলা মাল্টিপারপাস কনফারেন্স হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. রায়হান সিরাজী। এসময় তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন, একটি শিক্ষিত ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

গঙ্গাচড়াকে শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহ মুক্ত ঘোষণা করা শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি আগামীর সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার অঙ্গীকার। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন আক্তারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের ন্যাশনাল ডিরেক্টর সুরেশ বার্টলেট, সিনিয়র অপারেশন ডিরেক্টর চন্দন জেড গোমেজ। ইউএনও কথা দেন, উপজেলায় কোনো শিশু যাতে শ্রমে জড়িত না হয় এবং স্কুল থেকে ঝরে না পড়ে, সে বিষয়ে প্রশাসনের নজরদারি অব্যাহত থাকবে। তিনি জনপ্রতিনিধি, অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকদের সক্রিয় সহযোগিতা কামনা করেন। ওয়ার্ল্ড ভিশনের সুরেশ বার্টলেট জানান, শিশুদের নিরাপদ শৈশব, শিক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার, পরিবার এবং সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

গঙ্গাচড়াকে বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ও শিশু ঝরে পড়ামুক্ত ঘোষণা একটি অনুকরণীয় উদ্যোগ, যা দেশের অন্যান্য উপজেলাকেও অনুপ্রাণিত করবে। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। শেষে উপস্থিত সবাই বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ও শিশু ঝরে পড়ামুক্ত আদর্শ উপজেলা গড়ার শপথ পাঠ করেন। এতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবকরা অংশ নেন। তারপরও বিষয়টিকে সাধুবাদ জানাই, অন্তত চেষ্টা করা হয়েছে। কী হবে-এমনটা না ভেবে শেষ পর্যন্ত সারাদেশেই এমন উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ, অনেক স্বপ্ন নিয়ে বাবা-মায়েরা সন্তানদের স্কুলে ভর্তি করান। তারপরও ঝরে পড়ার হার কোনোভাবেই কমছে না।

হাজারো স্বপ্ন নিয়ে শুরুটা হলেও শেষটা মাধ্যমিকের গন্ডি পেরুতে পারছেনা অনেকেই। রংপুর অঞ্চলে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর হার বেড়েই চলছে আশঙ্কাজনক হারে। তবে শহরের তুলনায় গ্রামে শিক্ষার্থীদের এই ঝরে পড়ার প্রবণতা বেশি। মাধ্যমিকে পাঁচ বছর ক্লাস করার পরও অনেকেই পরীক্ষার হলে বসার আগে জীবন চালানোর পরীক্ষা দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। অর্থনৈতিক মন্দার কারণে দরিদ্র ঘরের সন্তানদের অল্প বয়সে সংসারের হাল ধরতে হয়। ফলে অনেকের শিক্ষা জীবন বেশিদূর এগোয় না। অভিভাবকদের অসচেতনতার কারণে বাল্য বিয়ের শিকার হচ্ছে স্কুলপড়ুয়া মেয়েরা। পরীক্ষার প্রস্ততি ভালো না হওয়ায় কেউ কেউ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকছে।

দেশে এবারে এসএসসি পরীক্ষা শুরু হয়েছে গত ২১ এপ্রিল। দিনাজপুর শিক্ষাবোর্ডের আওতায় রংপুর বিভাগে প্রথম দিন বাংলা প্রথমপত্রের পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকে এক হাজার ১৭৮ জন পরীক্ষার্থী। পরের পরীক্ষাগুলোতে অনুপস্থিতির সংখ্যা ক্রমান্বয়ে আরো বেড়েই চলছে। প্রথম পরীক্ষায় অংশ নিলেও ২৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিত বাংলা দ্বিতীয়পত্রের পরীক্ষায় আরো ১২৩ জন পরীক্ষার কেন্দ্রে আসেনি। ২৬ এপ্রিলের ইংরেজি প্রথমপত্রের পরীক্ষায় নতুন করে অনুপস্থিত থাকে আরো ২৮৬ জন। ২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ইংরেজি দ্বিতীয়পত্রের পরীক্ষায় অনুপন্থিত পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ৩৯ জন। ১২ মে পর্যন্ত ১১টি বিষয়ের পরীক্ষায় অনুপস্থিতির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৭০০ জনের মতো।

দিনাজপুর শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর বোরহান উদ্দিন সাক্ষরিত এসএসসি পরীক্ষার দৈনন্দিন তথ্যে অনুপস্থিতির এই পসিংখ্যান জানা যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দিনাজপুর শিক্ষাবোর্ডের অধীনে চলতি এসএসসি পরীক্ষায় রংপুর বিভাগের আট জেলায় মোট এক লাখ ৪১ হাজার ২২০ জন পরীক্ষার্থী। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত টিকে আছে এক হাজার ৭০০ জনের মতো ঝরে পড়েছে। বিভাগে মোট ২৮৩টি কেন্দ্রে এবার এসএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রথম দিনে অনুপস্থিতির হার শুন্য দশমিক ৮৩ শতাংশ হলেও দ্বিতীয় দিনে তা বেড়ে দাঁড়ায় শুন্য দশমিক ৯২ শতাংশে। তৃতীয় দিনের পরীক্ষায় অনুপস্থিতির হার ১ দশমিক ০৫ শতাংশ এবং ১২ মে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় অনুপস্থিতির হার বেড়ে দাঁড়ায় ১ দশমিক ১৪ শতাংশ।

শেষ হওয়া পরীক্ষাগুলোতে অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীর মধ্যে রয়েছে রংপুরে ১৯৪, গাইবান্ধায় ২১৮, নীলফামারীতে ১২৩, কুড়িগ্রামে ১২০, লালমনিরহাটে ১১২, দিনাজপুরে ২৫৫, ঠাকুরগাঁওয়ে ১২০ ও পঞ্চগড়ে ৯৭ জন। যদিও গত বছর প্রথম দিনের এসএসসি পরীক্ষায় অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল এক হাজার ৩৪১ জন। সূত্র আরও জানায়, এর আগে ২০২৪ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল ২০০৪৪৪ জন। এর মধ্যে অনুপস্থিত থাকে দুই হাজ্রা ২৬০ জন। ২০২৩ সালে পরীক্ষার্থী ছিল ২০২৪৬২ জন। অনুপস্থিত থাকে দুই হাজার ৯৭১ জন। ২০২২ সালে মোট ১৭৬৮৪৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে অনুপস্থিত থাকে দুই হাজার ২৬৯ জন।
দিনাজপুর শিক্ষাবোর্ডের একটি সূত্র জানায়, প্রত্যেক পরিবারে বাবা-মায়ের স্বপ্ন থাকে তাদের সন্তানকে উচ্চশিক্ষা করানোর।

কিন্তু নানা প্রতবন্ধকতার কারণে শেষ পর্যন্ত তা হয়ে ওঠেনা। অনেকের স্বপ্ন গিয়ে ঠেকছে মাধ্যমিক পর্যন্তই। ঝরে পড়ার হার আগের চেয়ে কমে এসেছে উল্লেখ করে সূত্রের দাবি, প্রতি বছর এই বোর্ড থেকে রংপুর বিভাগের আট জেলার প্রায় দেড় লাখ পরীক্ষার্থী এসএসসি পাশ করে। কিন্তু দুই বছর ক্লাশ করার পরও এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনা ৫০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী। নানা কারণে মাধ্যমিকের গন্ডি পেরুতে পারছেনা তারা। তবে পরীক্ষার্থী ঝরে পড়ার পেছনে বাল্য বিয়ে, দারিদ্রতা ও প্রস্তুতিমুলক পরীক্ষার খারাপ ফলসহ অভিভাবকদের দায়িত্বহীনতাকে দায়ি করছেন সচেতনমহল।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, রংপুর নগরীর বুড়িরহাট উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে পাশ্ববর্তী সাতটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়মিত তিন শতাধিক পরীক্ষার্থীর মধ্যে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অনুপন্থিত রয়েছে চারজন। এর মধ্যে
গুলালবুদাই উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন ছাত্রী রয়েছে। ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাখাওয়াত হোসেন জানান, ১০০ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ওই ছাত্রীর বিয়ে হয়েছে। তার পরও তাকে পরীক্ষা দিতে বলা হয়েছিল, দেয়নি। পরীক্ষা না দেওয়া তালুক হাবু উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী রুবেল মিয়ার বাড়িতে গেলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার বাবা একরামুল হক বলেন, ‘অভাবের সংসারোত আর কুলান যাওচে না, পড়াশনা করাইম কী দিয়া! বেটায় (ছেলে) কামাই কইরবার ঢাকাত গেইচে।’ বিষয়টি নিশ্চিত করে ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষক জানান, ফরম পূরণ করেছিল রুবেল মিয়া, কিন্তু পরীক্ষা দিচ্ছেনা। পরীক্ষা শুরুর আগে যোগাযোগ করেও বাড়িতে তাকে পাওয়া যায়নি।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কলেজে বা উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হওয়ার পর অনেক পরিবারই ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখার খরচ যোগান দিতে পারে না। কখনো আবার অমনোযোগী শিক্ষার্থীরা নিজে থেকেই পড়ালেখা বন্ধ করে দেয়। প্রধানত আর্থসামাজিক কারণে এসএসসি পরীক্ষার্থী কমে যাচ্ছে। অভিভাবকরা মেয়ে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত থাকেন এবং পরীক্ষার আগেই বিয়ে দেন। পারিবারিক দুর্যোগের কারণে ছেলে শিক্ষার্থীরা অনেক সময় কাজ করতে বাধ্য হয়। তাদের কাছে পড়াশোনার চেয়ে সংসার চালানোই জরুরি হয়ে পড়ে। এ সমস্যার সমাধানে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।

দিনাজপুর শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর বোরহান উদ্দিন নিশ্চিত করেন, প্রত্যেক বিষয়ের পরীক্ষায় অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। চলতি এসএসসি পরীক্ষার প্রথম দিনে অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীর সংখ্যা এক হাজার ১৭৮ জন। যেখানে গত বছরের এই পরীক্ষায় অনুপস্থিত ছিল এক হাজার ৩৪১ জন। এসএসসি পাসের পর সব শিক্ষার্থীই এই বোর্ডের আওতায় ভর্তি হয়না। তাছাড়া অনেকে নানা কারণে লেখাপড়া না করে কর্মজীবনে প্রবেশ করে। তবে আগের চেয়ে ঝরে পড়ার হার অনেকটা কমে এসেছে। এরপরও বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে বলে জানান তিনি।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক সকালের বাণী
Theme Designed BY Kh Raad ( Frilix Group )