হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (হাবিপ্রবি) ভারত, নেপাল, ভূটান, নাইজেরিয়া, সোমালিয়া, জিবুতি থেকে প্রতিছরই অসংখ্য শিক্ষার্থী বিভিন্ন বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে ভর্তি হয়। একসময় দেশের সবচেয়ে বেশি বিদেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করতো এই বিশ্ববিদ্যালয়েই। তবে বিশ্ববিদ্যালয়টির অভ্যন্তরীন নানা সংকট এবং দেশের রাজনৈতিক জটিলতায় এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসার আগ্রহ হারাচ্ছেন বিদেশি শিক্ষার্থীরা।
দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে গত এক দশকে সর্বোচ্চসংখ্যক বিদেশি গ্রাজুয়েট তৈরী করেছে হাবিপ্রবি। হাবিপ্রবিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে ২০১৪ সালে ভর্তি হয় মোট ২২ জন, ২০১৫ সালে ৪২ জন, ২০১৬ সালে ৫৯ জন, ২০১৭ সালে ৬১ জন, ২০১৮ সালে ৬১ জন, ২০১৯ সালে ২৫ জন এবং ২০২০ সালে ৪ জন বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিলেন বলে জানা যায়। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বিভিন্ন বর্ষে অধ্যয়নরত মোট বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৯৮ জন। তন্মধ্যে ছেলে শিক্ষার্থী ৭৭ জন, মেয়ে শিক্ষার্থী ২১ জন। বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা আবাসিক হলের ব্যবস্থা না থাকায় ছেলেরা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হলে এবং মেয়েরা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলে অবস্থান করেন।
বিদেশি কয়েকজন শিক্ষার্থীর সাথে কথা বলে জানা যায়, অতিরিক্ত আবাসন ফি, সেশনজট, দীর্ঘ সময়ের স্নাতক কোর্স, ভিসা জটিলতা এবং দেশের রাজনৈতিক নানা বিশৃঙ্খলার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতি বিদেশি শিক্ষার্থীদের আগ্রহের পারদ ক্রমশই নিচের দিকে নামছে। অন্য সুত্রে জানা গেছে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রাক্তন এবং বর্তমান শিক্ষার্থীরা তাদের দেশের শিক্ষার্থীদেরকে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতে অনাগ্রহ সৃষ্টি করে। যেকারণে এবছরও অল্প সংখ্যক বিদেশি শিক্ষার্থী স্নাতক ডিগ্রিতে ভর্তি হয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিদেশি শিক্ষার্থী বলেন, হাবিপ্রবিতে বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে। সেশন জট, অতিরিক্ত আবাসিক ফি (মাসিক ১০০০ টাকা), সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি না পাওয়ায় কমে যাচ্ছে বিদেশি শিক্ষার্থীদের সংখ্যা। দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করলেও এতোদিনেও আন্তর্জাতিক মানের ক্যাম্পাস হয়ে উঠতে পারেনি হাবিপ্রবি। এমনটাই মনে করেন শিক্ষার্থীরা। তারা বলছেন, শিক্ষার পরিবেশ ও মানের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে। আগে যেসব দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা পড়তে আসতেন, সেসব দেশই এখন উচ্চশিক্ষায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হচ্ছে তাই বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে শিক্ষার্থীরা।
এ সংকট কাটাতে বিশ্ববিদ্যালয়েরই এগিয়ে আসা উচিত বলে মনে করছেন ইন্টারন্যাশনাল হলের হল সুপার অধ্যাপক ড. আদনান আল বাচ্চু। তিনি বলেন, বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে উঠতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, একাডেমিক কাউন্সিল এবং হল প্রশাসনের সমন্বয় দরকার। পাশাপাশি তাদের জন্য স্বতন্ত্র হল তৈরি করাও জরুরি। বিদেশি শিক্ষার্থীদের এ বিশ্ববিদ্যালয়ের আসার জন্য আগ্রহী করতে বিভিন্ন দূতাবাসের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে বলে জানান ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স সেকশন শাখার পরিচালক অধ্যাপক ড. মোঃ হাসানুজ্জামান। তিনি বলেন, শিক্ষার্থী আনার জন্য বিভিন্ন দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা চলছে। তবে আফ্রিকান নাগরিকদের অপরাধ প্রবণতার জন্য সরকার তাদের যাচাই বাছাই করে এদেশে আসার অনুমতি দেন। এতে জটিলতার সৃষ্টি হয় এবং ওই অঞ্চল থেকে খুব বেশি শিক্ষার্থী পাওয়া যায় না।
তিনি আরো জানান, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স সেকশনের নির্দিষ্ট অফিস এবং জনবল না থাকায় দ্রুত সময়ের মধ্যে বিদেশি শিক্ষার্থীদেরকে সেবা প্রদান করা সম্ভব হয়না। ফলে তারা বিভিন্ন অসুবিধায় পড়েন। বর্তমান শিক্ষার্থীদেরকে প্রাথমিকভাবে মোটিভেট করা হচ্ছে যেন তাদের মাধ্যমেও এখানে বিদেশি শিক্ষার্থীরা আসে।
এ বিষয়ে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ শফিকুল ইসলাম সিকদার বলেন, বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা জটিলতা সহ বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে। সেসব খুঁজে বের করে সমাধান করার চেষ্টা করছে বিশ্ববিদ্যালয়। উল্লেখ্য, ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য গত ২৬ জানুয়ারি ভর্তি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে হাবিপ্রবি। এতে বিভিন্ন বিভাগে বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য রাখা হয়েছে ৮০ টি আসন।