
রংপুরের গঙ্গাচড়ায় তিস্তা নদীর ভাঙ্গনে প্রতি বছর নিঃস্ব হয়ে যায় শত শত পরিবার। উপজেলার নোহালী ইউনিয়নের মিনার বাজার থেকে শুরু করে লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের মহিপুর পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটারজুড়ে নদীতীরবর্তী এলাকাগুলো ভাঙ্গন ও বন্যার ভয়াবহ ঝুঁকিতে রয়েছে।
উপজেলার চরাঞ্চলের আনন্দ বাজার, মিনার বাজার, বাগডহরা , মটুকপুর , বিনবিনা, ইচলি সংকরদহ,কাশিয়াবাড়ি চরের গ্রামগুলো প্রতিবছর বর্ষায় নদীর পানিতে তলিয়ে যায়। ফলে নষ্ট হয় হাজার হাজার হেক্টর ফসল, চলাচলের রাস্তা, নদী ভাঙ্গনে বিলিন হয় ঘরবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ। লক্ষাধীক মানুষ প্রতিনিয়তই যোগাযোগ ব্যবস্থা , শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আইনশৃংখলার মতো মৌলিক অধিকারগুলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে একটি বিশাল জনগোষ্ঠী আধুনিকতার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
নোহালী চর আনন্দ বাজার এলাকার স্নাতক পড়ুয়া আল আমিন বলেন, আমরা চরে বসবাসকারী মানুষ সংগ্রামী জীবন যাপন করি। প্রতিদিন নৌকায় করে নদী পার হয়ে শিক্ষা লাভের আশায় গঙ্গাচড়া হয়ে রংপুরে যেতে হয়ে। অনেকদিন নৌকায় নদী পার হতে গিয়ে সময় মতো ক্লাস করতে পারি নাই। তাই মিনার বাজার থেকে মটুকপুর হয়ে বিনবিনাকে সংযোগ করে নদীর তীরবর্তী একটি বাঁধ নির্মাণ হলে সোটা যেমন চারটি চরে বসবাসকারী লক্ষাধীক মানুষের যোগাযোগ ব্যাবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনবে তেমনি বন্যার কবল থেকেও রক্ষা করতে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে।
মিনার বাজারের স্থানীয় আব্দুল মান্নান জানান , একটি সুরক্ষিত বাঁধ নির্মাণই পারে এই জনপদকে বাঁচাতে। এখানকার মানুষ মূলত কৃষি, গরু-ছাগল পালন এবং দিনমজুরির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। কিন্তু নদীভাঙন তাদের জীবনকে করে তুলেছে দুর্বিষহ। আমরা পরিশ্রম করতে জানি, আমাদের ত্রাণের দরকার নাই, সরকার আমাদেরকে বাঁধ নির্মাণ করে দিলেই আমরা চরের মানুষ ধন্য হব।
আউলীয়ার হাট এলাকার বাসিন্দা শফিকুল বলেন, মুই (আমি) ৪৫ বছরের জীবনে মোর বাপোক ( পিতাকে) পাঁচ বার বাড়ি ভাঙ্গা দেখনুং (দেখলাম)। এই গেরামোত (গ্রামে)বাস করা অনেক মানুষ বাড়ি ভাঙ্গিয়া (ভেঙ্গে) কোনটে (কোথায়) গেইছে হদিস (খোঁজ)নাই। বাঁদটা হইলে খুব উপকার হইবে।
বিনবিনা এলাকার শিক্ষিত সত্তর বছর বয়সী আলতাফ হোসেন বলেন, নদীর ভাঙ্গা গড়া দেখতে দেখতে বয়স সত্তর হইল। চরে বসবাসকারী হিসেবে নিজেকে অভিশপ্ত মনে হয় । এমপি- মন্ত্রীদের আশ্বাস শুনতে শুনতে বিশ্বাস হারিয়ে গেছে। বর্তমান বৈষম্যহীন সরকারের নিকট আকুল আবেদন জানাই, আমাদের অন্য কোন চাওয়া নাই, মিনার বাজার থেকে মহিপুর ব্রিজ পর্যন্ত একটা নদী তীরবর্তী বাঁধ দেন। তাহলে এই চারটি চরে বসবাসকারী লক্ষ মানুষের প্রাণের দাবী পূরণের মাধ্যমে জীবনমানে আমূল পরিবর্তন আসবে।
ইচলি গ্রামের শিক্ষার্থী রিমা আক্তার জানায়,
“আমাদের স্কুল নদীতে চলে গেছে। এখন তিন কিলোমিটার দূরের স্কুলে হেঁটে যেতে হয়।প্রতিবছর বর্ষাকালে রাস্তা ভেঙ্গে গেলে স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়। অনেকেই আর স্কুলে যায় না।
সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন চেয়ারম্যানরা বলছেন ,প্রতিবছর গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন বরাদ্দ থেকে যে কাজগুলো হয়, বর্ষাকালে নদী ভাঙ্গন ও বন্যার পানিতে সব বিলিন হয়ে পূণরায় জন দূর্ভোগ তৈরী হয়। ফলে প্রতিবছরই সরকারের অনেক টাকা নষ্ট হয়। তাই বাঁধ নির্মাণ হলে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান যেমন হবে, তেমনি চরাঞ্চলের মানুষের জীবনমানে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহমুদ হাসান মৃধা বলেন, জেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, জেলা পরিষদ নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সকলেই চরের মানুষের একটি বাঁধের জন্য তাদের আকুতি শুনেছি। আমি উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে মিনার বাজার থেকে মহিপুর ব্রিজ পর্যন্ত বাঁধ নির্মাণের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।
স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ স্বীকার করছেন, নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণে সাময়িক জিও ব্যাগ ফেলাসহ কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয় বটে, কিন্তু তা কোনোভাবেই স্থায়ী সমাধান নয়। ফলে প্রতিবছর সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ চরাঞ্চলের উন্নয়নে ব্যবহৃত হলেও তার সুফল জনগণ পাচ্ছে না। তাই এলাকাবাসীর একমাত্র দাবি—নোহালী থেকে মহিপুর পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্থায়ী নদীতীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ সম্ভব হলে একদিকে সরকারের অর্থ ব্যয়ের সুফল জনগণ পাবে এবং চরের মানুষের আত্মসামজিক উন্নয়নে অগ্রগতি সাধনে সক্ষম হবে।
Related