


মহান মুক্তিযুদ্ধে রংপুর বিভাগের লালমনিরহাট কালীগঞ্জের অন্যতম স্মৃতিচিহ্ন বধ্যভূমিগুলো বেহাল অবস্থায় রয়েছে। অযত্ন-অবহেলায় হারিয়ে যেতে বসেছে এই স্মৃতিচিহ্নগুলো। ৭১’র রক্তাক্ত ইতিহাসের মর্মন্তুদ স্মৃতি বিজড়িত এ উপজেলায় প্রাচীনতম। ৭১’এ মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে গোটা লালমনিরহাট জেলার ওপর পাক হানাদার ও দোসররা চালিয়েছিল নির্মম তাণ্ডব। বিভিন্ন স্থান থেকে মুক্তিযোদ্ধা, বুদ্ধিজীবীসহ নিরীহ শতাধিক মানুষকে ধরে এনে হত্যা করেছে বধ্যভূমিগুলোতে। জেলা শহরের অন্যতম কালীগঞ্জ উপজেলার ভোটমারী নামে পরিচিত বহুল আলোচিত বধ্যভূমি, শতশত বাঙালিকে বিভিন্ন স্থান থেকে ধরে এনে কালীগঞ্জ উপজেলার মদাতি বধ্যভূমিতে হত্যা করা হতো। এটি ছিল রংপুর অঞ্চলের সবচেয়ে বড় বধ্যভূমি। যদিও দিবসটি ঘিরে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নামমাত্র প্রতি বছরের ১৪ই ডিসেম্বরে স্বল্প পরিসরে কিছু প্রোগ্রামের আয়োজন করে থাকে। এই বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হলেও এটি অযত্ন অবহেলায় পড়ে থাকে সারাবছর।
প্রতিবছর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে এই স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন সকল শ্রেণি পেশার মানুষ। কিন্তু বছরের অন্য দিনগুলোতে আর এই বধ্যভূমির খোঁজ নেওয়ার অবকাশ থাকে না। লালমনিরহাটের কালীগঞ্জের ওই সময়ের প্রতক্ষ্যদর্শীদের বিবরণে জানা যায়। জেলা শহর ও বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন ধরে আনা ছাড়াও ট্রেনে করে অসংখ্য মানুষকে কালীগঞ্জ উপজেলার মদাতি ইউনিয়নের মুসরত মদাতি বধ্যপুকুর বধ্যভূমিতে নিয়ে আসা হতো। এরপর নির্মম নির্যাতন চালিয়ে তাদেরকে এই বধ্যভূমিতে হত্যা করা হতো। সেসময় ওই এলাকা বনজঙ্গল ঘেরা এবং নির্জন হওয়ায় অসংখ্য মানুষকে সেখানে হত্যা করা হয়েছে। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর দেশ স্বাধীন হলে এই বধ্যভূমি থেকে হাড়-কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। পরে মিত্র বাহিনী তা ভারতে নিয়ে যায়।
এই বধ্যভূমিতে বিহারিরা শত শত মানুষকে হত্যা করেছে। শহরের টপটেরর বিহারি রংবাজরা বিভিন্ন জায়গা থেকে বাঙালিদের ধরে এনে এখানে জবাই করতো। কালীগঞ্জ উপজেলা মদাতী বধ্যভূমি নিয়ে কথা হয়, বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল হকের সাথে কথা হলে তিনি জানায়, সারা বছর অবহেলা অযত্নে পড়ে থাকা এই বধ্যভূমিটি, আর এক দুই দিনের জন্য যখন ব্যবহার করে সেটাও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা তুলনামূলকভাবে কম। যেটি কে এই বিভাগের মধ্যে বড় বধ্যভূমি বলা হয়, সেটার জন্য যদি কেয়ারটেকার করার জন্য এক দুজন মানুষকে রাষ্ট্রীয় ভাবে দায়িত্ব দেওয়া হতো তাহলে এই বদ্ধ ভূমির সম্মান রক্ষা করা যেত। কেয়ারটেকার এর অভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম স্মৃতিচিহ্ন। যদিও এই স্মৃতিচিহ্ন রক্ষার্থে দাবি দীর্ঘদিনের। মুক্তিযোদ্ধা ছাড়াও নতুন প্রজন্ম এবং সাধারণ মানুষ বধ্যভূমিসহ মুক্তিযুদ্ধের সকল স্মৃতিচিহ্ন সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাসকে চিরঞ্জীব করে রাখার দাবি জানিয়েছেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা।
তিনি আরে বলেন, এগুলো বাঙালির সংগ্রামের চিহ্ন। আর পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার, আল বদর, আল শামস বাহিনীর নির্মমতার সাক্ষ্য বহন করে চলেছে বধ্যভূমিটি। এগুলো পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব না হলে আগামী প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে ভুলে যাবে। তাই তিনি বধ্যভূমি টিতে দুজন মানুষ নিয়োগ করে প্রশাসনের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল শক্তির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। উল্লেখ্য যে ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বরের এই দিনে মুক্তিযোদ্ধাদের ত্রিমুখী আক্রমণের মুখে লালমনিরহাট থেকে পালিয়েছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। মুক্ত হয় লালমনিরহাট। তবে পালানোর আগে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ ও লুটপাট চালিয়েছিল বর্বর ওই বাহিনী। যার সাক্ষী হয়ে রয়েছে জেলা শহরসহ অন্যান্য উপজেলায় একাধিক গণকবর।