


রংপুরের বদরগঞ্জ সরকারি ডিগ্রি কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক শামীম আল মামুন। শিক্ষকতার আড়ালে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। চেক ডিজঅনার হওয়ার দায়ের করা মামলায় প্রভাষক শামীম আল মামুন এবার আটক হয়েছেন। গত সোমবার বদরগঞ্জ আমলী আদালত-২ এর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এর বিজ্ঞ বিচারক সোহেল রানা তার জামিন নামঞ্জুর করে জেলহাজতে পাঠান। শামীম আল মামুন বদরগঞ্জ সরকারি কলেজের অনার্স বাংলা বিভাগের প্রভাষক। তার বিরুদ্ধে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে চাকরী দেওয়ার কথা বলে অসহায় নিরীহ চাকরী প্রার্থীদের কাছ থেকে প্রায় দেড় কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এরমধ্যে বহু মামলা আদালতে চলমান রয়েছে। জালিয়াতি ও অর্থ আত্নসাতের ঘটনায় প্রভাষক শামীম আল মামুন গ্রেপ্তার হওয়ায় বদরগঞ্জ সরকারি কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। রংপুর জেলা কোর্ট ইন্সপেক্টর আমিনুল ইসলাম তাঁর আটক হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
এদিকে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) এর সনদসহ বিভিন্ন শিক্ষাগত যোগ্যতার জাল সনদ তৈরি করে দেওয়া অভিযোগ রয়েছে শামীম আল মামুনের বিরুদ্ধে। তিনি বিভিন্ন সময়ে জাল সনদ তৈরি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
অভিযোগ ও মামলা সুত্রে জানা যায়, গত তিন বছর আগে বদরগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ বাওচন্ডি এলাকার মো. ফয়সাল হকের কাছ থেকে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন ব্যাংকের চেকের মাধ্যমে ১৬ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন শামীম আল মামুন। টাকা নেওয়ার পর থেকে সে গা ঢাকা দিয়ে পালিয়ে বেড়ান। উপায় অন্ত না পেয়ে ফয়সাল হক রংপুর আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলা নম্বর সিআর ৩৮২/২৫। এর আগে ওই মামলায় সমুদয় টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে জামিনে ছিলেন মামুন। টাকা না দিয়ে গত সোমবার আদালতে হাজিরা দিতে যান মামুন। পরে বিজ্ঞ আদালতের বিজ্ঞ বিচারক সোহেল রানা প্রতারণার কারণে তার জামিন না মঞ্জুর করে জেল হাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এ ছাড়াও ঠাকুরগাঁও জেলার বালিয়াডাঙ্গি উপজেলার আবু হাসানের নামে এক ব্যক্তিকে চাকুরী দেওয়ার প্রলোভন দিয়ে ৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। একই কায়দায় মিঠাপুকুর উপজেলার ওয়ারেস মিয়াসহ অপর তিন ব্যক্তিকে সরকারের বিভিন্ন পদে চাকরী দেওয়ার কথা বলে প্রায় ৩০ লাখ টাকা নেন। চাকুরী দিতে না পারলে বিনিময়ে সবাইকে ব্যাংকের চেক প্রদান করেন। এভাবে প্রায় দেড় কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
একটি মামলার বাদী ফয়সাল হক বলেন, ‘শামীম আল আল মামুন একজন ভয়ংকর প্রতারক। শিক্ষকতার আড়ালে রয়েছেন তার বিশাল সিন্ডিকেট। বহুজনকে চাকরী দেওয়ার কথা বলে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। আমার মত অনেকেই টাকার জন্য তার পিছনে ধর্ণা দিয়ে ঘুরছেন। কিন্তু কোনভাবেই টাকা দিচ্ছেন না। এ কারণে উপায় না পেয়ে আদালতের আশ্রয় নিয়েছি। একজন সরকারি কলেজের প্রভাষক হওয়ার পরেও চরম অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে তার কঠিন শাস্তি দাবি করছি।’ উল্লেখ্য, ২০১১ সালে ১৩ জুলাই বদরগঞ্জ সরকারি কলেজের প্রভাষক নিয়োগ পরীক্ষায় অন্যান্য সনদের সঙ্গে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) সনদপত্র দাখিল করেন শামীম আল মামুন। যা পরবর্তিতে জাল সনদ হিসেবে প্রমাণিত হয়। ২০২০ সালের ২২ সেপ্টেম্বর এনটিআরসিএ’র সহকারি পরিচালক তাজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত পত্রে জানা যায় তৃতীয় শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় ভুয়া নাম রোল ও ঠিকানা ব্যবহার করে প্রভাষক পদে জাল সনদ তৈরি করেন শামীম আল মামুন নিয়োগ নেন।
এ ঘটনায় ২০২০ সালে তার বিরুদ্ধে বদরগঞ্জ থানায় মামলা হয়। শামীম আল মামুন প্রশাসনের সব গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া কথা বলে প্রায় দেড় কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। অনেক ভুক্তভোগি অসহায় গরিম মানুষ টাকা ফেরত চেয়ে তার দ্বারে দ্বরে ঘুরছেন। ছাত্র অবস্থায় ছাত্র শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও পরে জাতীয় পার্টি, আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে তিনি জিয়া পরিষদের সাধারণ সম্পাদক পরিচয় দিয়ে মানুষকে ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন বলে জোর অভিযোগ রয়েছে। বদরগঞ্জ সরকারি ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ভুপেন্দ্র নাথ সরকার বলেন, ‘বিষয়টি শুনেছি। আর আদালতের ওপরে কারো হাত নেই। সে যদি কোন অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকে এটা তার নিজস্ব ব্যাপার। বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অবগত করা হবে। কোন নির্দেশনা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’