স্থানীয় ডিলাররা এলপিজি গ্যাসের সংকট তৈরি করতে পারে স্থানীয় ক্রেতাদের অভিযোগ উঠেছে।
ফলে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার মতো ফুলবাড়ী উপজেলাতেও সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে সিলিন্ডার গ্যাস। অনেক সময় উচ্চ মুল্যেও মিলছে না উচ্চ, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের পরিবারে রান্নার কাজে ব্যবহৃত প্রতি প্রয়োজনীয় এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার।
এমনকি উপজেলা সদরসহ বিভিন্ন হাট-বাজারের হোটেলের মালিকরা গ্যাসের সংকটে চরম বিপাকে পড়েছেন।
অব্যাহত মূল্যস্ফীতির বাজারে খরচ মেটাতে গিয়ে নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম। তখন জ্বালানির চাহিদা মেটাতে নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষ খুঁজছেন বিকল্প সমাধান। এমতাবস্থায় এ উপজেলা জুড়ে জ্বালানি চাহিদা পূরণ করছে গোবরের তৈরি লাকড়ি।
গরুর গোবর সাধারণত জৈব সার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এতে জমির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি পাওয়ায় ফলন ভালো হয়। কিন্তু সম্প্রতিক সময়ে গ্যাসের সংকট থাকায় গোবরের তৈরি লাকড়ি রান্নার কাজে ব্যবহৃত হওয়ায় বানানো হচ্ছে লাকড়ি। এ উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে অনেকেই ঝুঁকছেন কাঠ-খড়-লাকড়ির দিকে।
গ্রামাঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, প্রত্যান্ত এলাকার গৃহবধূরা গৃহপালিত গরুর গোবর দিয়ে নাড়ু ও শলা তৈরি করছেন। বাড়ির উঠানে, বাইরে খোলা জায়গায় পিঁড়িতে বসে ঘোমটা টেনে খোশগল্পে মেতে তৈরি করছেন গোবরের নাড়ু। সামনে রয়েছে ডালিভর্তি গোবর, বালতি ভরা পানি, পাটখড়ি ও ধানের তুষ।
বেশ কিছু গৃহবধূর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠেই গোয়ালঘরে প্রবেশ করেন । ডালিভর্তি গোবর বের করেন। এরপর গোবরের সঙ্গে মেশানো হয় ধানের তুষ বা গুঁড়া। এরপর ২-৩ হাত লম্বা পাটকাটি দিয়ে তৈরি করেন নাড়ু। কাঁচা গোবরের তৈরি নাড়ু শুকানোর জন্য বাড়ির উঠানে ও রাস্তার পাশে রোদে আড় বেঁধে দাঁড় করে রাখা হয়।
রোদ ভাল পেলে এক সপ্তাহের মধ্যে শুকিয়ে যায় নাড়ুগুলো। এভাবেই প্রতিদিনের তৈরি শুকনো নাড়ু জ্বালানির কাজে ঘরে মজুদ করে রাখা হয়।
গোবরের তৈরি লাড়ু জ্বালানি হিসাবে সাশ্রয়ী হওয়ায় গ্রামগঞ্জে ইদানীং বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে গরুর গোবরের প্রলেপ দেওয়া এই বিশেষ এক খড়ি। স্থানীয়দের কাছে এটি পরিচিত গোবরের নাড়ু হিসেবে। সর্বত্রই এখন চোখে পড়ছে বিশেষ এই জ্বালানিটি। প্রতিটি গ্রামীণ জনপদে গোবরের নাড়ুর ব্যবহার অনেক আগে থেকেই লক্ষ করা গেলেও ইদানীং এর ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে।
গ্রামঅঞ্চলে দেশের চলমান উন্নয়নের ছোঁয়ায় রান্নাবান্নার প্রাচীন পদ্ধতি কিছুটা কমলেও গ্যাস ও জ্বালানি সংকটের নতুন এই পরিস্থিতি আবার তাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আগের ব্যবস্থায়। এই উদ্ভূত পরিস্থিতে উপজেলা জুড়ে কদর বাড়ছে গ্যাস-বিদ্যুতের বিকল্প হিসেবে এসব জ্বালানি।
কালের আবর্তনে বাড়ির পাশে গড়ে ওঠা প্রাকৃতিক বন-জঙ্গল কেটে ফেলার কারণে সেই জ্বালানিরও সংকট দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে ধনী ও বড় গৃহস্থ পরিবারের গৃহবধূরা গ্যাস দিয়ে বা খড়ি ক্রয় করে রান্না করলেও চরম বেকায়দায় পড়েছেন মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের পরিবারের গৃহবধূরা।
গ্যাস বা কাঠখড়ি ক্রয় করতে না পেরে গৃহপালিত গরুর গোবর দিয়ে নাড়ু ও লম্বা শলা তৈরি করেন। যাদের বাড়ীতে গরুর গোবর নেই। তারাও বিভিন্ন ভাবে গোবর সংগ্রহ করে এভাবেই প্রতিদিন লাড়ু তৈরি ও শুকিয়ে নাড়ু মজুদ করে রাখা হয় ঘরে।
এদিকে দিন দিন জ্বালানির চাহিদা হিসাবে গরুর গোবরের তৈরী লাকড়ি ব্যবহার করায় কৃষি খাতে কৃষকদের ফসল উৎপাদনের প্রধান জৈব সার হিসাবে গরুর গোবরের সংকট তৈরির আশঙ্কা করছেন আবার কেউ কেউ।
উপজেলার কুরুষাফেরুষা এলাকার গৃহবধু তন্য বালা ও জ্যোসনা রানী জানান, তাদের প্রত্যেকের দুটি করে গাভী আছে। চাষবাদ করার করার পর অবশিষ্ট গোবরগুলো দিয়ে জ্বালানি তৈরি করছি। আমরা প্রতিদিন সকালে গোয়ালঘর থেকে গোবরগুলো একত্রিত করে একটি পাট কাটি দিয়ে তিন থেকে চারটি শলা তৈরি করে রোদে শুকিতে দিই। এক সপ্তাহ ধরে শুকানোর পরে চুলায় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করি। জ্বলেও ভালো।
উপজেলার নেওয়াশী এলাকার গৃহবধু শিউলি বেগম, আনোয়ারা বেগম ও স্বপ্না রানী আক্তার জানান, গোবরের এই নাড়ু এমন এক প্রকার জ্বালানি, যা তৈরি করা খুবই সহজ। খরচ কম, জ্বলেও ভালো। তাই আমরা আমাদের এলাকায় প্রতিদিন এক থেকে দেড়শ গোবরের লাড়ু জ্বালানি হিসাবে তৈরি করি। বর্তমানে যে গ্যাসের দাম। তাও আবার পাওয়ায় না।
কুরুষাফেরুষা এলাকায় গৃহবধূ সুচিত্রা রানী রায় জানান, গরু নাই। তাই গোবরের তৈরি লাড়ুর বদলে কাঠ খড়ি ও গ্যাসে সিলিন্ডারের রান্না করি। গত এক সপ্তাহ আগে ১৫৫০ টাকা নিয়ে গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে এসেছে। এদিকে আবার শুকনো কাঠ খড়ির মনও ৩০০ টাকা। গ্যাসের দাম বাড়ায় আমরা মধ্য বিত্ত পরিবার চরম বিপাকে পড়েছি।
বালারহাট বাজারে চা বিক্রেতা মোন্নাফ হোসেন বলেন আগে ১২৫০ থেকে ১৩৫০ টাকায় গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে দোকানে চা বানিয়েছি। বাজার গ্যাস সরবরাহ কম থাকায় গত তিন আগে ১৫৫০ টাকায় অনেক কষ্ট সিলিন্ডার নেয়া হয়েছে। জানি না সামনে গ্যাস সিলিন্ডারের সংকট দুর হবে কি।
বালারহাট বাজারের ইলা ট্রের্ডাসের ব্যবসায়ী ফুয়াদ হাসান জানান, গত এক সপ্তাহ আগে
ফ্রেস কোম্পানির গ্যাস সিলিন্ডার ১৪৪০ ক্রয় করে বিক্রি ১৫০০ থেকে ১৫৫০ টাকা, জেএমআই কোম্পানি ১৪০০ ক্রয় করে ১৪৮০ টাকা বিক্রি, যমুনা কোম্পানি ১৪৫০ ক্রয় করে ১৫৫০ বিক্রি করছি। বসুন্ধরাসহ অন্যান্য কোম্পানি গ্যাস সিলিন্ডার বাজারে নেই। এখন আমার দোকানে
কোন প্রকারে গ্যাস সিলিন্ডার নেই। তবে কোম্পানি গুলোর ডিলারদের সাথে যোগাযোগ করা হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোছা. নিলুফা ইয়াছমিন জানান, গোবরের তৈরি লাকড়ি জ্বালানি হিসাবে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এ উপজেলায়। তবে এতে জৈব সারের সংকট তৈরী হবে না। তবে জৈব সার যে শুধু গরুর গোবর তা না। অন্যন্যা উপাদান দিয়েও জৈব সার তৈরি হয়। এক্ষেত্রে কৃষকদের কৃষি খাতে উৎপাদনে এর কোনো প্রভাব পড়বে না বলে জানান একর্মকতা ।