


প্রতি বছর শাবান মাসের মাঝামাঝি এলে মুসলিম সমাজে শবে বরাত নিয়ে নানা আলোচনা-বিতর্ক শুরু হয়। কেউ এর গুরুত্বকে পুরোপুরি অস্বীকার করেন, আবার কেউ বাড়াবাড়িতে লিপ্ত হয়ে বিভিন্ন কুসংস্কারে জড়িয়ে পড়েন। প্রকৃত সত্য কী, তা দালিলিক প্রমাণের ভিত্তিতে জানা প্রতিটি মুমিনের জন্য জরুরি। শবে বরাতের আমল নিয়ে সমাজে প্রচলিত প্রধান কিছু ভুল ও সেগুলোর সঠিক সমাধান নিচে তুলে ধরা হলো।
১. শবে বরাতের হাদিস কি সবই জাল?
অনেকের ধারণা, শবে বরাত নিয়ে বর্ণিত সব হাদিসই বানোয়াট বা জাল। এ ধারণা সঠিক নয়। নির্ভরযোগ্য কিতাবগুলোতে এই রাতের ফজিলত সংক্রান্ত সহিহ ও হাসান পর্যায়ের হাদিস বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘অর্ধ শাবানের রাতে আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টিপাত করেন এবং শিরককারী ও বিদ্বেষপোষণকারী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।’ (সহীহ ইবনে হিববান: ৫৬৬৫)। মূলত কেবল বিশেষ পদ্ধতির নামাজ ও মনগড়া কিছু ফজিলত সংক্রান্ত বর্ণনাগুলোই জাল বা মওজু।
২. বিশেষ পদ্ধতির নামাজ ও রাকাত সংখ্যা
সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি বিশ্বাস আছে যে, শবে বরাতে বিশেষ পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট রাকাত নামাজ পড়তে হয়। আসলে এই রাতের জন্য নির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতির নামাজ বা রাকাত সংখ্যা শরিয়তে নির্ধারিত নেই। নফল ইবাদত হিসেবে যে কেউ তার সামর্থ্য অনুযায়ী যত ইচ্ছা নামাজ পড়তে পারেন। তবে বিশেষ কোনো পদ্ধতির নামাজকে জরুরি মনে করা বা বিশেষ সওয়াব হবে বলে বিশ্বাস করা ভিত্তিহীন।
৩. ১৫ই শাবানের রোজি কি মাসনুন?
১৫ই শাবানের রোজা সংক্রান্ত ইবনে মাজাহর হাদিসটি সনদের দিক থেকে কিছুটা দুর্বল হলেও তা একেবারে বানোয়াট নয়। ফজিলতের ক্ষেত্রে এমন হাদিস গ্রহণযোগ্য বলে আলেমগণ মত দিয়েছেন। এছাড়া প্রতি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ (আইয়ামে বিজ) রোজা রাখা এমনিতেই মোস্তাহাব। তাই এই সওয়াবের নিয়তে রোজা রাখা যেতে পারে, তবে একে শবে বরাতের বিশেষ ‘সুন্নত’ রোজা মনে করা ভুল।
৪. কবর জিয়ারত ও মেলা কেন্দ্রিক বাড়াবাড়ি
অনেকে এ রাতে ঘটা করে কবরস্থানে যাওয়া বা সেখানে আলোকসজ্জা করাকে আবশ্যক মনে করেন। অথচ বর্তমান সময়ে কবরস্থানগুলোতে যেভাবে ভিড় ও মেলার পরিবেশ তৈরি হয়, তা শরিয়ত সমর্থন করে না। ফেতনার আশঙ্কায় বিশেষজ্ঞ আলেমগণ এখন এ রাতে ঘটা করে কবরস্থানে যাওয়া থেকে বিরত থাকাকেই অধিক সতর্কতামূলক ও উত্তম মনে করেন। ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত একাকী ও নিরিবিলি আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করা।
৫. ‘লায়লাতিন মুবারাকা’ আসলে কোনটি?
অনেকে মনে করেন কোরআন মজিদে বর্ণিত ‘লায়লাতিন মুবারাকা’ বা বরকতময় রাত বলতে শবে বরাতকে বোঝানো হয়েছে। এটি একটি ভুল ধারণা। কোরআনের তাফসির অনুযায়ী, এই বরকতময় রাত হলো ‘লাইলাতুল কদর’ বা শবে কদর, যে রাতে পবিত্র কোরআন নাজিল হয়েছে। শবে বরাতের মর্যাদা অবশ্যই আছে, তবে একে শবে কদরের সমান মনে করা ঠিক নয়। কী করবেন, কী বর্জন করবেন?
এই রজনীর আসল উদ্দেশ্য হলো- আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া। যারা মাগফিরাত পেতে চান, তাদের প্রধান করণীয়গুলো হলো-
তওবা ও ইস্তেগফার: বিগত জীবনের গুনাহের জন্য লজ্জিত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করা।
নফল নামাজ: ব্যক্তিগতভাবে সাধ্যমতো দীর্ঘ কেরাত ও সেজদায় নফল নামাজ পড়া। দোয়া ও জিকির: নিজের ও উম্মাহর কল্যাণে বেশি বেশি দোয়া ও জিকিরে মশগুল থাকা। বিদ্বেষ ত্যাগ: রহমত লাভের প্রধান শর্ত হলো নিজের অন্তরকে হিংসা-বিদ্বেষ থেকে মুক্ত করা। বর্জনীয়: আতশবাজি, আলোকসজ্জা, হালুয়া-রুটি নিয়ে বাড়াবাড়ি এবং মসজিদে ভিড় করে ইবাদতের পরিবেশ নষ্ট করা থেকে বিরত থাকা।
শবে বরাত আমাদের জন্য আত্মসমালোচনা, তওবা ও সম্পর্ক সংশোধনের একটি বিশেষ সুযোগ। বাহ্যিক আয়োজন বা লোকদেখানো কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং অন্তরের সত্যিকারের পরিবর্তনই হোক শবে বরাতের আসল প্রস্তুতি। হিংসা-বিদ্বেষমুক্ত হৃদয় নিয়ে আল্লাহর রহমত লাভ করাই হোক আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য।
তথ্যসূত্র: সহিহ ইবনে হিববান: ৫৬৬৫; শুয়াবুল ঈমান, বায়হাকি; লাতাইফুল মাআরিফ, ইবনে রজব হাম্বলি; ইমদাদুল ফতোয়া, আশরাফ আলি থানভি)