1. [email protected] : Md Hozrot Ali : Md Hozrot Ali
  2. [email protected] : Sokaler Bani : Iqbal Sumon
  3. [email protected] : Md Hozrot Ali : Md Hozrot Ali
দেশের স্বার্থে জাতীয় ঐক্য জরুরি | দৈনিক সকালের বাণী
শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৩৬ অপরাহ্ন

দেশের স্বার্থে জাতীয় ঐক্য জরুরি

স্বপন চৌধুরী
  • আপলোডের সময় : মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১৪৩ জন দেখেছেন

শেষ পর্যন্ত দেশে একটা নির্বাচন হলো। শপথ নিয়েছেন নির্বাচনে জয়ী হওয়া সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রী পরিষদের সদস্যরাও। এতে অস্থিতিশীল অবস্থার মধ্য দিয়ে চলা দেশের মানুষও নানা সংকট উত্তরণের স্বপ্ন দেখছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। নির্বাচন-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমান সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘পথ ও মত ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু দেশের স্বার্থে আমরা সবাই এক। জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, বিভাজন আমাদের দুর্বলতা। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের চিন্তাভাবনাও আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আর কোনো অপশক্তি যাতে দেশে ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে না পারে এবং দেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে না পারে এজন্য আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। দেশকে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের বিকাশেও এটি জরুরি।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ার ক্ষেত্রে দেশ এক ধাপ এগিয়ে গেছে। বাকি দায়িত্ব পালন করতে হবে নতুন সরকার ও বিরোধী দলকে। তাদের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে দেশের গণতন্ত্র কতটা মজবুত ও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে। সরকার ও বিরোধী দল যদি একে অন্যকে ‘শত্রু’ হিসেবে বিবেচনা করে, তবে সংসদ অকার্যকর হয়ে পড়বে। সংসদের কার্যক্রম যদি রাজপথে নেমে আসে তবে তা দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলবে, যা অতীতেও দেখা গেছে। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে হলে নতুন সরকারকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। সেই সঙ্গে বিরোধী দলকেও দায়িত্বশীল হতে হবে। সরকার ও বিরোধী দলের আচরণ, পারস্পরিক সহনশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য রক্ষার চর্চা এক্ষেত্রে জরুরি।

রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকার কেন্দ্রীয় ভূমিকায় থাকে। তবে বিরোধী দলও সরকারকে জবাবদিহির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দেশবাসী আবারো কোনো স্বৈরশাসন প্রত্যক্ষ করতে চায় না। দমন-পীড়নের রাজনীতি চায় না। অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি ছাড়া জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা কঠিন হবে। এর বাইরে প্রয়োজন গণতন্ত্রের বিকাশ নির্ভর করে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর পেশাদার ও নিরপেক্ষ ভূমিকা। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচার বিভাগ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো স্বাধীনভাবে কাজ না করলে বৈষম্য ও নাগরিক বিভাজন রোধ করা যাবে না। দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দমন-পীড়ন, ভয়-ভীতি দেখানো, সহিংসতা ও সংঘর্ষ দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। যে কারণে দেশের গণতন্ত্রের ভিত ক্রমেই দুর্বল হয়েছে। সেই সঙ্গে প্রায় সব প্রতিষ্ঠান অকার্যকর হয়ে পড়েছে। প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করার সক্ষমতা হারিয়েছে। ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার রাজনীতি এর জন্য বিশেষভাবে দায়ী। আর এটি দেশকে এক প্রকার বিভাজন ও সহিংসতার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

সংসদকে হতে হবে রাজনৈতিক ঐক্যের প্রধান মঞ্চ। বিরোধী দলের প্রধান দায়িত্ব হবে সংসদে সক্রিয় ভূমিকা রাখা। সরকারের নীতি, বাজেট ও আইন প্রস্তাবের গঠনমূলক সমালোচনা করা এবং বিকল্প প্রস্তাব তুলে ধরা। সংসদ বর্জন কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক দায়িত্ব পালনের পথ হতে পারে না। বরং এতে সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনার পথ রুদ্ধ হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, সরকারের দায়িত্ব হবে বিরোধী দলকে নিজেদের ও গণতন্ত্রের অংশীজন হিসেবে বিবেচনা করা। বিরোধী দলের মতপ্রকাশ, সমালোচনা কিংবা আন্দোলনের অধিকার রুদ্ধ করা যাবে না, যেমনটা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের শাসনামলে করা হয়েছিল। তাহলে জাতীয় ঐক্য তৈরির পথ অনেকটাই মসৃণ হয়ে উঠবে।

পাশাপাশি জরুরি হলো জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়, যেমন সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি-এসব ক্ষেত্রে অধিকাংশের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে বিরোধী দলের সহযোগিতা সরকারের জন্য সহায়ক হতে পারে, আবার সরকারকেও বিরোধী দলের প্রস্তাব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। এতে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ আরো গ্রহণযোগ্য ও টেকসই হয়। এক্ষেত্রে বিরোধী দলের ভূমিকা শুধু না বলায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। একই সঙ্গে বিকল্প নীতি ও কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরতে হবে, যাতে জনগণ বুঝতে পারে-বিরোধী দল কেবল বিরোধিতা নয়, শাসনের জন্যও প্রস্তুত। অন্যদিকে সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন সংস্থা ও গণমাধ্যম যেন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে কাজ করতে পারে। এ প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হলেই প্রকৃত অর্থে চেক অ্যান্ড ব্যালান্স বজায় থাকে।

১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হলো ১৩তম জাতীয় সংসদীয় নির্বাচন, যা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা সর্বশেষ নির্বাচনের মধ্যে সবচেয়ে মুক্ত, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পূর্ববর্তী নির্বাচনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এটি এক ঐতিহাসিক মোড়। নারী, যুবসমাজ ও নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ-এ নির্বাচনের পরিসংখ্যানগত চিত্র একটি গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। প্রায় ১২৭ দশমিক ৭ মিলিয়ন নিবন্ধিত ভোটারের মধ্যে প্রায় ৫০ মিলিয়নই ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সি এবং মোট ভোটারের প্রায় ৬২ মিলিয়ন নারী। এ জনমিতিক মুহূর্ত বিশেষ করে নারী ও তরুণরা কেবল অংশগ্রহণই করেননি; তারা রাজনৈতিক বয়ান নির্মাণ করেছেন, ফলাফলে প্রভাব ফেলেছেন এবং রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার প্রত্যাশাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন।

ভোটগ্রহণের দিনে ঢাকা ও অন্যান্য জেলার কেন্দ্রে সকাল থেকেই নারীদের দীর্ঘ সারি ছিল চোখে পড়ার মতো, যা ইঙ্গিত করে যে আনুষ্ঠানিক রাজনীতিতে দীর্ঘদিন অবমূল্যায়িত নারীরা ব্যালটের মাধ্যমে তাদের উপস্থিতি দৃশ্যমান করেছেন। তবে এ সংখ্যাগত শক্তির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক ফলাফলের একটি তীব্র বৈপরীত্য রয়েছে: সারা দেশে মোট প্রার্থীর মাত্র প্রায় ৪ শতাংশ ছিলেন নারী এবং সরাসরি নির্বাচিত হয়েছেন মাত্র সাতজন, যা সংসদে ৫ শতাংশেরও কম প্রতিনিধিত্ব নির্দেশ করে। এ বৈপরীত্য উচ্চ নারী ভোটার উপস্থিতি, কিন্তু নিম্ন নারী আইনসভা প্রতিনিধিত্ব একটি গভীর কাঠামোগত ঘাটতি তুলে ধরে, যা জরুরি সংস্কার দাবি করে। শাসন ব্যবস্থায় নারী ও তরুণদের স্থায়ী প্রান্তিকীকরণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নারী ও তরুণ নেতৃত্বকে খুব কম ক্ষেত্রেই নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারণে সামঞ্জস্যপূর্ণ ভূমিকা দেওয়া হয়েছে। ধারাবাহিক সরকারগুলোতে এ-সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে তুলনামূলকভাবে কম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে পূর্ণ মন্ত্রীর পরিবর্তে প্রতিমন্ত্রীর অধীনে পরিচালিত হয়েছে। এ প্রাতিষ্ঠানিক উপেক্ষা একটি বার্তা জোরদার করে: নারী ও যুব উন্নয়ন এখনো জাতীয় শাসন অগ্রাধিকারে দ্বিতীয় সারির বিষয়। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল দেখাচ্ছে, এ ধরনের প্রান্তিকীকরণ আর টেকসই নয়। নারী ও তরুণদের রয়েছে নিজস্ব সক্ষমতা, নির্বাচনি প্রভাব এবং প্রতীকী প্রতিনিধিত্বের বাইরে বাস্তব প্রত্যাশা।

দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে একটি জনমুখী সরকার প্রতিষ্ঠা করা যতটা আনন্দের, সেই শাসনভার পরিচালনা করা ততটাই কঠিন। বিশেষ করে রাষ্ট্রকাঠামো যখন ভঙ্গুর অবস্থায় থাকে, তখন নতুন সরকারের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করে একটি সুশৃঙ্খল ও পেশাদার কর্মী বাহিনী বা আমলাতন্ত্রের ওপর। বর্তমান প্রেক্ষাপটে জনগণের বিপুল প্রত্যাশার বিপরীতে বিএনপির সামনে যে পর্বতসম সমস্যাগুলো দণ্ডায়মান, তা মোকাবেলা করতে প্রতিটি কাজে সতর্ক পদক্ষেপ এবং নিয়মিত পরিবীক্ষণ (মনিটরিং) অত্যন্ত জরুরি।

একটি সচল ও গতিশীল রাষ্ট্রের মেরদণ্ড হলো তার আমলাতন্ত্র। গত কয়েক দশকে প্রশাসনের যে রাজনৈতিকীকরণ হয়েছে, তা দূর করা বিএনপির প্রথম এবং প্রধান কাজ। মেধা, সততা, দক্ষতা ছাড়া দলীয় আনুগত্য বা ক্ষমতাবান ব্যক্তির স্তুতি গেয়ে পদোন্নতি পাওয়া প্রায় নিয়মে পরিণত হয়েছে। সময়ের সঙ্গে এ স্তাবক শ্রেণি তাদের রঙ পরিবর্তন করে; কিন্তু স্বভাব নয়। তাই রাজনৈতিক চিত্র পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাদের বিভিন্ন সুবিধা লাভের কৌশলী প্রচেষ্টা নবোদ্যমে শুরু হবে। দলীয় আনুগত্যের পরিবর্তে মেধা, জ্যেষ্ঠতা ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে পদায়ন নিশ্চিত করতে হবে। যারা গত ১৬-১৭ বছর জনগণের সেবার পরিবর্তে একটি দলের সেবা করেছে তাদের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। যে-কোনো নিয়োগের ক্ষেত্রে গত ১৭ বছরে কর্মকর্তার অবস্থান ও ভূমিকা নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি। এটা খুব কঠিন কাজ নয়। দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তাদের পুরস্কৃত করা এবং দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্তদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। জবাবদিহি নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে আমলাতন্ত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা অন্যতম কৌশল। সবাইকেই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

বিপুল বিজয়ের পর বিজয়ী দলের মধ্যে প্রতিহিংসার রাজনীতি আসার ঝুঁকি থাকে। যদিও ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর বিএনপি উদারতা ও ধৈর্যশীলতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছে তথাপি সরকার গঠনের পর তাদের কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে যে তারা সবার। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত বিভিন্ন কমিশনের রিপোর্টগুলো পর্যালোচনা করে বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। মোট কথা দেশের জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কাজ করতে হবে এবারের নতুন সরকারকে।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক সকালের বাণী
Theme Designed BY Kh Raad ( Frilix Group )