
উত্তরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী জনপদ রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায় ইতিহাস, অলৌকিক লোককথা ও নান্দনিক স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে কলি ও দলি আমিন পাকা জামে মসজিদ। উপজেলার বড়বিল মন্থনা বাজার সংলগ্ন মিয়াপাড়া এলাকায় অবস্থিত এই প্রাচীন মসজিদটি কেবল ধর্মীয় উপাসনালয়ই নয়, বরং সময়ের অলৌকিক নির্মাণগল্পের সাক্ষ্য বহনকারী এক জীবন্ত ইতিহাস।
বাংলা ১২৪৮ সনে (১৮৪১ খ্রিস্টাব্দ) নির্মিত এই মসজিদটির বয়স বর্তমানে প্রায় ১৮৫ বছর। মসজিদের দেয়ালে খোদাই করা আরবি ফলক থেকেই এর নির্মাণকাল সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেছে। দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে অনেক কিছু বদলে গেলেও মসজিদটি এখনো তার স্বকীয়তা ধরে রেখেছে, যেখানে নিয়মিত নামাজ আদায় করেন স্থানীয় মুসল্লিরা।
জনশ্রুতি অনুযায়ী, মিয়াপাড়া গ্রামের আজগর মিয়ার বংশধর দুই ভাই—কলি আমিন ও দলি আমিন—এই মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। তাদের তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠা তিন গম্বুজবিশিষ্ট এই স্থাপনাটি ইট ও চুন-সুরকির মজবুত গাঁথুনিতে নির্মিত। মসজিদের ভেতরে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন কারুকাজ, যেখানে প্রতিটি নকশাই আলাদা বৈশিষ্ট্যে গড়া—যা এ স্থাপনাটিকে করেছে ব্যতিক্রমী।
মসজিদটির নির্মাণকে ঘিরে রয়েছে অলৌকিক নির্মাণ গল্প কাহিনি। স্থানীয়দের মতে, ১৩ জন অচেনা রাজমিস্ত্রি দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে এটি নির্মাণ করেন। তবে খাওয়ার সময় কিংবা হিসাবের সময় দেখা যেত একজন কম। একই ধরনের চেহারা ও গড়নের কারণে কাউকে আলাদা করে শনাক্ত করা সম্ভব হতো না। এ কারণে তাদের ‘বিশ্বকর্মা’ বলে আখ্যায়িত করা হয়।
আরও বিস্ময়কর তথ্য হলো, মসজিদের কারুকাজ তৈরির পর তা ঘি দিয়ে ভেজে নেওয়া হতো বলে প্রচলিত রয়েছে। সেই কাজে ব্যবহৃত একটি বড় কড়াই বহু বছর ধরে সংরক্ষণে ছিল, যা বর্তমানে মসজিদ প্রাঙ্গণেই রাখা আছে।
স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকেও মসজিদটি অত্যন্ত আকর্ষণীয়। প্রায় ৫২ ফুট দৈর্ঘ্য ও ২১ ফুট প্রস্থের এই মসজিদের ছাদে রয়েছে তিনটি প্রধান গম্বুজ। এছাড়া চার কোণায় চারটি এবং মাঝ বরাবর আরও চারটি ছোট গম্বুজ রয়েছে। প্রবেশমুখে রয়েছে নান্দনিক তোরণ এবং দক্ষিণ পাশে সুউচ্চ মিনার, যা পুরো স্থাপনাটিকে দিয়েছে মোগল স্থাপত্যের আবহ।
তবে সময়ের সাথে সাথে মসজিদটির অবকাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, ১৯৪৯ সালের একটি ভূমিকম্পে এটি কয়েক ফুট মাটির নিচে দেবে যায়। ফলে জানালাগুলো প্রায় মাটির সঙ্গে মিশে গেছে এবং দরজাগুলো নিচু হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দেওয়ায় মসজিদটি এখন ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এ কারণে অনেকেই একে ‘দাবা মসজিদ’ নামেও চেনে।
মুসল্লিদের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির কারণে পুরনো মসজিদ অক্ষুণ্ণ রেখে পাশেই নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনতলা ভিত্তির এই সম্প্রসারণ প্রকল্প বর্তমানে অর্থসংকটের কারণে ধীরগতিতে এগোচ্ছে।
মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি লাল মিয়া বলেন, “এই মসজিদ আমাদের এলাকার ঐতিহ্য ও গর্বের প্রতীক। আমরা চাই এর প্রাচীনত্ব অক্ষুণ্ণ রেখে সংরক্ষণ করতে, কিন্তু প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না থাকায় তা কঠিন হয়ে পড়ছে।”
সাধারণ সম্পাদক মোঃ বাদশা মিয়া বলেন, “মুসল্লিদের সুবিধার্থে সম্প্রসারণ কাজ শুরু করা হয়েছে। তবে অর্থের অভাবে কাজ শেষ করা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা পেলে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব।”
মুয়াজ্জিন মোঃ নূর আলম বলেন, “প্রতিদিন এখানে নিয়মিত নামাজ আদায় হয়। পাশাপাশি অনেক মানুষ এই ঐতিহাসিক মসজিদ দেখতে আসেন, যা আমাদের জন্য গর্বের বিষয়।”
স্থানীয় গবেষক ও লেখক রানা মাসুদ বলেন, “এই মসজিদ শুধু ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, এটি রংপুর অঞ্চলের ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর ইতিহাস ও লোককথা মানুষকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে।”
স্থানীয়দের দাবি, ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটির সংরক্ষণে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। নয়তো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে এ অঞ্চলের এক অনন্য অলৌকিক গল্পগাথা ঐতিহ্য।
Related